BRICS

ব্রিকস ২০২৬: যৌথ ঘোষণা ও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

সম্পাদকীয় বিভাগ

জাদ মাহমুদ

গত ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন সব দেশের সম্মতিতে একটি যৌথ ঘোষণার (কমিউনিকে) মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। দেশগুলির ‘নমনীয়তা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ’ শীর্ষক এই ঘোষণাটি সত্যিই বিবেচনাযোগ্য। গত দুই দশকে ব্রিকস অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে; পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতি (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) নিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে এটি ১১টি সদস্য দেশের একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে, যার চারপাশে রয়েছে সহযোগী দেশগুলোর আরও বড় একটি বলয়। 
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে তিনটি স্তম্ভ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান। এই ধরনের একটি সমঝোতার মূল প্রেরণা এসেছে—যেমনটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উল্লেখ করেছেন—বিশ্ব যখন একের পর এক সঙ্কটে নিমজ্জিত হচ্ছে, তখন ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর নিয়ম মেনে চলা’র ভূমিকা থেকে বেরিয়ে ‘নিয়ম তৈরি করা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। 
ব্রিকসের নিজস্ব ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর নিরিখে বিচার করলে, দিল্লি ঘোষণাপত্র কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, এই ঘোষণাটি রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফ) পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সার্বভৌম সমতা এবং বহুপাক্ষিক সংস্কারের প্রতি পুনরায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ব্যবস্থায় ভারত ও ব্রাজিলের বৃহত্তর ভূমিকার পুরনো দাবিটিকেই এটি পুনর্ব্যক্ত করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘোষণাপত্রটিতে ১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, এটি এক অর্থে তার একটি আধুনিক সংস্করণ হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, শীর্ষ সম্মেলনে একটি ‘ব্রিকস পেমেন্টস টাস্ক ফোর্স’ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়, যা সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় সরাসরি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সাশ্রয়ী, দ্রুত ও আন্তঃব্যবহারযোগ্য আন্তঃসীমান্ত লেনদেন নিশ্চিত করবে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক (এনডিবি) তহবিলের উৎস বহুমুখী করা, স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ প্রদান বৃদ্ধি এবং গ্লোবাল সাউথের অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নে আরও বেশি পুঁজি বিনিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও এই ধরনের উন্নয়ন বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে না, তবুও এটি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে একটি অতিরিক্ত বিকল্প পথ দেয়, যা বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো ব্যয়বহুল, নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত বা নির্ভরযোগ্য না হলে ব্যবহার করা যাবে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই ঘোষণাপত্রে একদিকে যেমন একতরফা শুল্ক এবং জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি নিয়ম-ভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেশন) স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
সত্যি বলতে, এই শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার চেয়ে কূটনৈতিক মঞ্চায়নে বেশি ছিল। বর্তমান ব্রিকসের মধ্যে এমন সব রাষ্ট্র রয়েছে যাদের নিজেদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ও ভিন্নতা বিদ্যমান। ভারত বিগত বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে, অথচ চীন ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে রয়ে গেছে। রাশিয়ার সাথে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক প্রকাশ্যেই শত্রুতামূলক, বিশেষ করে ইউক্রেন ইস্যুতে; আবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহী পাশ্চাত্যের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী—উভয় দেশই স্বাক্ষর করতে পারে এমন একটি ভাষায়, একটি অত্যন্ত জটিল সামরিক সংঘাতের মধ্যে ব্রিকস যে পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) বিষয়ে সংযম, সংলাপ এবং কূটনীতির আহ্বান জানিয়ে একটি যৌথ পাঠ্য তৈরি করতে পেরেছে, তা সত্যিই খসড়া প্রণয়ন ও কূটনৈতিক সাফল্যের একটি বাস্তব নিদর্শন। সাপ্লাই চেইন (সরবরাহ শৃঙ্খল) এবং দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমন নিয়ে শি জিনপিংয়ের সাথে মোদীর পার্শ্ববৈঠকটিও বহুপাক্ষিকতার একটি বড় প্রমাণ ছিল। ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য কাউকে তাদের অন্যান্য সম্পর্ক ত্যাগ করতে হয় না।
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্য আগামী কয়েক বছর দৃশ্যমান হবে না; বিশেষ করে পেমেন্টস টাস্ক ফোর্স এমন কোনও ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে কিনা যা ব্যাঙ্কগুলো প্রকৃতপক্ষে ব্যবহার করবে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে পৌঁছায় কিনা এবং সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় কিনা—তা সময়ের ওপর নির্ভরশীল। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের বিষয়টি এখনও তারল্য সঙ্কট (লিকুইডিটি শর্টেজেস), অসঙ্গতিপূর্ণ নিয়মকানুন এবং গভীর আর্থিক বাজারের অনুপস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।
ব্রিকসের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো অভ্যন্তরীণ বিবেচনা থেকেও তৈরি হয়। ভারত এমন একটি কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে যার মধ্যে ওয়াশিংটন এবং বেজিঙ-উভয় পক্ষের সাথেই বৈঠক অন্তর্ভুক্ত। একে বহু-মেরুকরণ (মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট) এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলা হলেও, ভারতের ক্ষেত্রে ভারতীয় রাষ্ট্র মার্কিন বলয়ের দিকে একটু বেশিই ঝুঁকে পড়েছে। ভারত-মার্কিন ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, কোয়াড, আইটুইউটু এবং ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আসলে একটি কাঠামোগত পক্ষাবলম্বন, যা বহুমেরুকরণকে দুর্বল করে। প্যালেস্তাইনের এর একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র, যেখানে প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার প্রতি ভারতের ঘোষিত সমর্থন এখন ইজরায়েলের প্রতি একটি পরোক্ষ সমর্থনে রূপান্তরিত হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ব্রিকস ঘোষণার তৃতীয় স্তম্ভটির কথাই ধরা যাক। এই ঘোষিত অবস্থানটি ভারত সরকারের অভ্যন্তরীণ চরিত্রের সাথে স্পষ্টভাবে পরস্পরবিরোধী, দেশে এই সরকার সক্রিয়ভাবে হিন্দুত্ববাদ, কর্পোরেট একচেটিয়াকরণ এবং নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতিকে প্রয়োগ করছে। পররাষ্ট্র নীতি কোনও রুদ্ধদ্বার কক্ষ নয়; অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে এবং এর উল্টোটাও ঘটে। যদি সংস্কৃতির বহুত্ববাদ এবং সমন্বয়বাদ সঙ্কটের মুখে পড়ে, খাদ্যাভ্যাস ও উৎসবগুলোকে যদি একটিমাত্র ব্যবস্থার অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়, তবে এর তাৎক্ষণিক শিকার হবে ভারতের সেই বহুত্ববাদ—যা বিশ্বের কাছে পরিচিত এবং আকর্ষণীয়।
পরিশেষে, একটি বহুত্ববাদী এবং আত্মবিশ্বাসী গ্লোবাল সাউথের পক্ষে কথা বলার ভারতের দাবিটি কেবল কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে ভারত আসলে নিজের দেশে কী করছে এবং তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো তার দাবিকৃত স্বায়ত্তশাসনের সাথে মেলে কিনা তার ওপর। বর্তমান ভারত সরকার এই প্রশ্নগুলোর কোনোটিরই সুনির্দিষ্ট বা সন্তোষজনক উত্তর দেয় না। ভারতের এই বহু-মেরুকরণ কি বাস্তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, নাকি কেবলই একটি ফাঁপা অবস্থান? এবং যে দেশ, দেশের অভ্যন্তরে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় একরূপতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তারা কি বিদেশে শক্তির উৎস হিসাবে বহুত্ববাদকে ব্যবহার করে যেতে পারবে?-এই দুটি পরীক্ষার মাধ্যমেই ভারতের দিল্লি-পরবর্তী কূটনীতি বিচার্য হওয়ার যোগ্য।

Comments :0

Login to leave a comment