কোনও গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্র প্রধানের জন্মদিন সরকারি উদ্যোগে এমন অভাবনীয় ও অকল্পনীয় চোখ ধাঁধানো উদ্যাপন বিশ্বের আর কোনও দেশে কোনও দিন হয়েছে বলে কারও জানা নেই। তেমনি সরকারি তহবিল থেকে বাজেট বহির্ভূতভাবে শতকোটি টাকা খরচ করার নজিরও এই প্রথম। যেসব রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার আছে সেখানে যাবতীয় সরকারি ও আধা সরকারি ক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্য সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই জন্মদিন উদ্যাপন এবং সকলের অংশগ্রহণ কার্যত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যক্তি জন্মদিন উদ্যাপন সরকারি অনুষ্ঠানরূপে অবশ্য পালনীয় হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। পাশাপাশি দলের তরফ থেকে আলাদাভাবে এবং সরকার ও শাসকদলের যৌথ উদ্যোগেও হয়েছে অসংখ্য কর্মসূচি। একদিকে যখন চারদিকে আলোর রোশনাই তখন বিহারে ৫০ লক্ষ মানুষ বানভাসি হয়ে অবর্ণনীয় জীবনযাপন করছেন। কলকাতা ও অন্যত্র যখন মুখ্যমন্ত্রী সহ গোটা সরকার জন্মদিনে মাতোয়ারা তখন মালদহের ভূতনিতে কয়েক হাজার মানুষ জলের তলায় অভুক্ত আছেন দিনের পর দিন। গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রে এমন বৈপরীত্য মানবতার বিবেককে বারবার দংশন করলেও সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করা যায় না শাসকের কাছ থেকে।
গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিকেরই সমান অধিকার, সমান মর্যাদা। তা তিনি রাষ্ট্রপতি হোন বা পথের ভিখারি। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রতিনিধি। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আত্মোৎসর্গীকৃত। নিজেকে ঘিরে এমন উচ্ছ্বাস, এমন দৃষ্টিকটু বাড়াবাড়িতে তার সঙ্কোচ বা অস্বস্তি হবার কথা। কিন্তু তেমন কিছু হচ্ছে বলে জানা যায়নি। বরং নিজেকে ঘিরে এমন দুনিয়াকে চমকে দেওয়া আয়োজন তিনি তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন। একবার অন্তত প্রকাশ্যে বলতে পারতেন এভাবে সরকারি অর্থ অপব্যবহার করে, তাঁর জন্মদিন পালন করা উচিত নয়। দলের তরফে বা অন্ধ ভক্তরা নিজেদের অর্থে যা খুশি করুন। তাই বলে জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকা এভাবে ওড়ানো হবে কেন? কেনই বা সেটা বাধ্যতামূলক হবে?
ভারতে রাজতন্ত্র নেই যে রাজার জন্মদিন রাষ্টীয় উৎসবে পালিত হবে। হিন্দু রাষ্ট্রও হয়নি যে ‘হিন্দুর হৃদয় সম্রাটের’ জন্মদিনে যা ইচ্ছে তাই করা হবে। যিনি নিজেকে ফকির বলেন, প্রধান সেবক তিনি আমীররূপে, সেবা প্রাপকরূপে এসব মেনে নিচ্ছেন কীভাবে?
আসলে আমেরিকায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যেমন দ্রুত হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে তেমনি ভারতেও মোদীর জনপ্রিয়তায় ভাটার টান। গত লোকসভা নির্বাচনে জনসমর্থনের ভিত এতটাই নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো মেলেইনি, এনডিএ জোটগতভাবেও ক্ষমতা দখলের সংখ্যা মেলেনি। পরে নীতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবুর কাঁধে ভর করে সরকার গঠন সম্ভব হয়েছে। এই অবস্থায় ২০২৯ সালে আগামী লোকসভায় জেতা যে কার্যত অসম্ভব তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন মোদী-শাহরা। ইতিমধ্যে যন্তর মন্তরে জেন-জি’র বিক্ষোভ অশনি সংকেত দিয়ে গেছে। বিজেপি ভাবছে ফের ক্ষমতায় আসতে গেলে মোদীকেই সামনে রাখতে হবে। আবার মোদীর ভাবমূর্তি ফিকে হয়ে যাবার ফলে হিতে বিপরীত হবারও আশঙ্কা রয়েছে। তাই জন্মিদিন ঘিরে সরকারি অর্থে মোচ্ছব করে মোদীর ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনেতার জন্মদিন এভাবে ঘটা করে পালনের বিরল প্রয়াস আগাম ফেয়ারওয়েল হয়ে যাবে না তো!
Celebrating King's Birthday in Democracy!
গণতন্ত্রে রাজার জন্মদিন
×
Comments :0