বনবাণী ভট্টাচার্য
সঙ্ঘ পরিবারের অন্দরে কিছুকাল ধরে একটা ক্ষোভ যেন ধুমায়িত হচ্ছিল। কুণ্ডলী পাকানো সেই ধোঁয়া অনুকূল সময়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—৬টি স্তবকের মধ্যে মাত্র দুটি স্তবক গ্রহণ করে কেন জাতীয় গান ‘বন্দেমাতরম’-এর অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে? নাগপুরের ডাঃ হেডগেওয়ার ভবনের কর্তাব্যক্তিরা জানেন ভালো করেই, কোন প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ গানটি গ্রহণ করা হয়নি। ‘বন্দেমাতরমের সৃষ্টি জাতীয় গান হিসাবে নয়। পাতা ভরাবার জন্যে বঙ্কিমচন্দ্রকে অনেক সময়, তাৎক্ষণিক কিছু লিখতেই হতো। কোনও এক অবসরে তিনি টুকরো কাগজে এই কবিতাটি লিখে রাখেন। অনেক পরে, টেবিলের উপর পড়ে থাকা লেখাটা মন্দ নয় বলে বঙ্গদর্শনের এক কর্মকর্তা, আনন্দমঠ উপন্যাসের পাতার ফাঁক পূরণের জন্যে ছাপিয়ে ফেলেন। ১৮৯৬ সালে এই গানে সুর দিয়ে কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ প্রথম গাইলে, গানটির জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথই এই গানের ব্যাপ্তিকে সীমাহীন করেন। গোল বাঁধে ১৯৩৭ সালে, আবারও ২৬ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনের প্রাক্কালে গানের চরিত্র ও আবেদন নিয়ে নানান ধর্ম-বর্ণ-জাত-সম্প্রদায় দেশ ভারতে, এ গান কি সকলেই নিজের বলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করতে পারবে? সংশয়াপন্ন জাতীয় নেতারা, রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হলেন—জওহরলাল নেহরু আনন্দমঠের ইংরেজি অনুবাদে মনোনিবেশ করার পরেও সুভাষচন্দ্রকে কবির পরামর্শের জন্যে যোগাযোগ করতে বললেন। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজীরও কথা হলো। কবি, নেহরুকে চিঠিতে লিখলেন, তার মূল কথা— ‘‘এ গানের প্রথম অংশ নিজস্ব মহিমায় স্বতন্ত্র এবং অনুপ্রেরণাদায়ী শক্তি আছে। কিন্তু অন্য অংশগুলির ক্ষেত্রে এমন কিছু ধর্মীয় অনুষঙ্গ ও দেবদেবীর উল্লেখ আছে যা বহুমাত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় আন্দোলনের পক্ষে উপযুক্ত নয়। তাই, আমার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ হলো— জাতীয় মহাসভা ও সর্বজনীন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে, এই গানের কেবল দু’টি স্তবকই গাওয়ার জন্যে গ্রহণ করা হোক।’’ রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছিলেন, রচনার কাব্যিক সৌন্দর্য্য ও মাতৃভূমির অনবদ্য রূপ-মাধুরীর বর্ণনায়। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্রকে এ গান শুনিয়েছেন এবং সাহিত্য সম্রাট প্রসন্ন মনে তাঁর তৃপ্তি প্রকাশ করেছেন। জাতীয় কংগ্রেসও দুটি স্তবকেরই সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৩০ সালে গণপরিষদ ও জাতীয় গানের জন্যে এই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করে।
এখন মোদী সরকারের সংস্কারের ধুমে, সরকারি সিদ্ধান্ত হলো ‘বন্দেমাতরম’-এর পুরো গানটিই জাতীয় গান এবং সে গান গাইতে হবে রবিঠাকুর রচিত সুরারোপিত জনগণমন-অধিনায়ক গাইবার আগে। এবং সংসদের বাদল অধিবেশন ১৯৭১ সালের জাতীয় গৌরব অসম্মান প্রতিরোধ আইন সংশোধনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা দাঁড়িয়েছে-বন্দে মাতরম গাইবার সময় বাধা বা গন্ডগোল হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার পরিণতি ৩ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা। তবে দু’টি স্তবক গাইলে নির্দেশিকা অমান্য হলেও, শাস্তির ব্যবস্থা নেই।
বন্দেমাতরম স্বদেশ মন্ত্রের বীজ বললে বেশি বলা হয় না। ১৯০৫ সালে ৭ আগস্ট বন্দেমাতরম ধ্বনিতে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের। বাঙালি প্রতিবাদ জানায় এবং ঐক্যের সেতু হয়ে দাঁড়ায় এ গান। গানের জাতীয়তাবাদী শক্তিতে ভীত ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা জানাবার পর ১৯০৬ সালে বরিশালে বন্দেমাতরম ধ্বনি প্রাদেশিক সম্মেলনে উঠলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। ১৯০৭ সালে স্টুটগার্টে সাদ্দাম ভিকাজিকামা দেবনাগরী অক্ষরে বন্দেমাতরম লেখা তেরঙ্গা পতাকা তুলেছিলেন। ১৯৪৩, মাদ্রাজে ফোর্থ কোস্টাল ডিফেন্স ব্যাটারির ২৪ জন তরুণ এই গান গাইতে গাইতে ফাঁসির দড়িতে নিজেদের প্রাণ দেয়। কারাগারে স্বদেশি বিপ্লবীরা গভীর রাতে এই গান গাইতেন। ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম সকালে অল ইন্ডিয়া রেডিও আসমুদ্র হিমাচলে শোনালো পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের গলায় স্বদেশ প্রেমের সুধামাখা এই বন্দেমাতরম।
এই যে গানের জনপ্রিয়তা, তা কি কোনও শাসকের নির্দেশ বা বেতের শাসনে সৃষ্টি হয়েছে। বন্দেমাতরম গান তো নাগপুরের ল্যাবরেটরিতে সৃষ্টি হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্র ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতোই তো বলেছিলেন টুকরো কাগজে লেখা বন্দেমাতরমের কথা যে এর মর্ম ভালো কি মন্দ এমন কেউ বুঝতে না পারলেও, ভবিষ্যৎকে এ গান মাতিয়ে দেবে। এই গানের বাণী, এর সুর, সব মিলিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক অদৃশ্য, কিন্তু অনিবার্য শক্তি হয়ে ওঠে। তবে হঠাৎ কেন তার সম্পূর্ণ কবিতা, তাকে প্রথমে এনে জাতীয় সঙ্গীতকে পিছনে ফেলা? যেন একটা অব্যক্ত অবিচারের ক্ষোভ, বন্দেমাতরম গান ও তার স্রষ্টা এ ভারতে অবহেলিত, তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে দিল্লি-নাগপুর? এই যে বন্দেমাতরম ধ্বনি তাকে অস্ত্র করে স্বাধীনতা সংগ্রামী মৃত্যুবরণ করেছেন, কারাবরণ করেছেন, অশেষ দুঃখ বরণ করেছেন, নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তা তো কোনও চাবুকের মারে নয়, তাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। প্রাণ উৎসর্গে উদ্বুদ্ধ করেছিল বঙ্কিমচন্দ্রের এই মাতৃ বন্দনা। এ কি অস্বীকারের।
যাই হোক, জাতীয় গানকে না হয় এক নম্বরে স্থিত করে সম্মানের চূড়ায় রাখা হলো? তাহলে জাতীয় সঙ্গীতেরও তো সম্মানহানি হলো, তাকে পিছিয়ে দিয়ে? এই পরিবর্তন কি স্বাভাবিক? এই সংস্কার কি ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করে? নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক এমন কি ব্রিটেন সহ অন্যান্য কয়েকটি দেশে দুটি গানের রীতি আছে কিন্তু তা পরপর গাইবার নয় এবং সরকারি অনুষ্ঠানে ১টি, অন্যটি অন্যান্য অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সঙ্গীতের ক্রম বিন্যাস নেই এমন করে। একদিকে জাতীয় গানের মর্যাদা বৃদ্ধি হলে ‘সি-স’ খেলার নিয়মে অন্যদিকে জাতীয় সঙ্গীতের তো অবমাননা হবেই। আবার জাতীয় গানের ৬টি স্তবকে ৩মিঃ ২০ সেকেন্ড বরাদ্দ হলে তার সাথে জনগণমন’র জন্যে আরও ৫২ সেকেন্ড পাওয়া যাবে অলিম্পিক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলোর আসরে? সিদ্ধান্ত প্রয়োগের দিকটা ভাবলে ভালো হতো। শুধু তো বিদেশি অনুষ্ঠান নয়, দৈনিক স্কুল-কলেজ ইত্যাদিতে এত সময়! এমনও তো হতে পারে সময় যখন হচ্ছে না, তাহলে দু’নম্বরেরটা আর গাইতে হবে না। অতএব একটাতেই চালিয়ে যাওয়া যাক। ওটা হতে পারে জাতীয় সঙ্গীতের এক স্বাভাবিক পরিণতি, যাতে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। শুধু দেশপ্রেমিক এই সরকারকে একটি প্রশ্ন, জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননাই কি এই সংস্কারের উদ্দেশ্য যে তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের অমর্যাদাপূর্ণ স্থানে দেওয়া? বন্দেমাতরমের ৬টির বদলে ২ স্তবকে যে অঙ্গচ্ছেদ, তার জন্য তো চোখের জলের বন্যা বয়েছে ক’বছর ধরে, সরকার বলুন, জাতীয় সঙ্গীতের ৫টির বদলে ১টি স্তবক গণপরিষদে গ্রাহ্য হও ‘জনগণমন’র অঙ্গচ্ছেদের ব্যাখ্যায় আরব সাগরে কি জলরাশিতে এক বিন্দুও কি বেড়েছে? বিশ্ব কবি রচিত, জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কেন কেউ বললেন না জনগণমন অধিনায়কের পাঁচটি স্তবক চাই চাই-ই। বলেননি, কারণ ঐ সঙ্ঘ পরিবার আপাদমস্তক রবীন্দ্র-বিদ্বেষী। বঙ্কিমচন্দ্রের নামে বিজেপি’রা যে একটু জল বেশি খায়, তা এই স্বদেশমন্ত্রের উদ্গাতা বলে না, বরং তাঁর হিন্দু আদর্শের জন্যে। তবে তিনি তো সাভারকরবাদী হিন্দু নন। তাঁর আন্তর্জাতিক-নাগরিকের দৃষ্টিতে তিনি সৃষ্টি করেছেন মোতিবিবি থেকে ঔরঙ্গজেব চরিত্র কিন্তু বন্দেমাতরম গানের প্রথম দুটি স্তবকের পরে, হিন্দু বাক্ প্রতিমা ও হিন্দু সুবাসের ছড়াছড়ি। সেদিন ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ-সুভাষচন্দ্র-গান্ধীজীর মতো অসামান্যরা যদি উদার দৃষ্টিতে জন্মভূমির স্নিগ্ন সজল রূপ বর্ণনা ও মাতৃ আরাধনার আবেগটুকু নিয়ে প্রথম স্তবকদুটির সার্বজনীনতাকে সম্বল করে বন্দেমাতরমকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত না নিতেন তবে খণ্ডিত ভারতের আজকের অখণ্ডতা ও ঐক্য সংহতি রক্ষা করা সম্ভব হতো না। ফলে, জাতীয় গান নিয়ে এই অশোভন বাড়াবাড়ি কোনও আবেগের প্রকাশ নয়— এ হিন্দুরাষ্ট্রের ছকে বাঁধা। আগাগোড়া দক্ষিণপন্থী আরএসএস’র এই উগ্র রাষ্ট্রবাদী শক্তি, জাতি-ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নিয়ে মানুষকে বিভাজিত না করতে পারলে পুঁজিবাদের চরমতম কদর্য ও হিংস্রতম রূপ যে ফ্যাসিবাদ সেই স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। নেহরু সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প গড়েছে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ব্যাঙ্ক-বিমা-কয়লাখনি জাতীয়করণ করেছে। আর হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকার হিন্দু ধর্মের রাষ্ট্রীয়করণের পথে। তাই, মানুষের উদ্গত প্রশ্ন, জাতীয় সঙ্গীতের বাকি স্তবকের জন্যে ওরা বায়না করেনি, এই কারণেই কি সেখানে ‘ত্বং হি দুর্গাদশ প্রহরণধারিণী বা বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামিত্বাং’’-এর মতো হিন্দু দেবদেবীর তুলনা সহ কোনও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মোটা দাগ বা উগ্রজাতীয়তাবাদের ইঙ্গিত নেই বলে? বিপরীতে, বাকি গানে হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টানীদের প্রতি ভারতের উদারবাদী উৎসারিত হয়েছে, তাই? উপাখ্যানের গোড়া হিন্দু, গোরা, যাঁর কলমে হয়ে ওঠে শুধুই ভারতবর্ষীয়, যে সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষা নেয়, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা, সেই ব্রাত্য মন্ত্রহীন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট জাতীয় সঙ্গীত কি করে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের খাঁড়া হাতে মোদী সরকারের মন-পসন্দ হতে পারে?
এই সরকার পরিচালিত হয় সেই আরএসএস দ্বারা, যার নেতা বিএস মুঞ্জে ফ্যাসিস্ত মুসোলিনীর কাছ থেকে (১৯৩১) ইতালি গিয়ে সরাসরি ফ্যাসিবাদের পাঠ নিয়ে ভীষণ ভারতীয় এবং জাতীয়তাবাদী বলে ভারতে ধুতি বদলে ব্রাউন শার্টের অনুকরণে খাকি প্যান্ট সংগঠনে আমদানি করেন, যুবশক্তির সামরিক প্রশিক্ষণে পারদর্শী করার লক্ষ্যে। ফ্যাসিস্তদের কাছে খ্রিস্টান, মুসলমান এবং কমিউনিস্টরা তো চিরকালই ঘৃণ্য শত্রু যেমন, তেমনিই যে জাতীয়তাবাদ নিজের অহমিকাকে প্রচণ্ড করে তুলে, বর্মে চর্মে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, ক্রমাগতই তলোয়ারে শান দিয়ে চলে, সেই সঙ্কীর্ণ হিংস্র আত্মঘাতী হিংস্র জাতীয়তাবাদকে যে বিশ্বপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ চিরকাল ধিক্কার দিয়েছেন, এই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে সেই মানবিকতার প্রতীক রবীন্দ্রনাথ পারমাণবিক বোমার থেকেও বেশি ভয়াবহ ও আতঙ্কের। আর তারই সৃষ্টি ঐ খ্রিস্টান-মুসলমানকে আদর করে ঘরে ডাকা গানকে জাতীয় সঙ্গীতের ভাবনা নৈব-নৈব-চ।
বাংলা ভাষা ও বাঙালি-বিদ্বেষী ওরা, বাংলার অস্মিতায় আঘাত করতে তাকে ছিন্নভিন্ন করার ক্লান্তিহীন। তাই জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত উপলক্ষে বঙ্কিম-রবীন্দ্রকে তর্জার মাধ্যমে বিভেদের বিন্দু করে বিষবৃক্ষের চাষ চলেছে। ফ্যাসিস্ত সংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে চিরপ্রামাণ্য বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ বাংলার গৌরব। কিন্তু কোনও দেশের জাতীয় সঙ্গীতের এই অবমাননা হয়েছে বলে ইতিহাস বলে না। শুধু শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রশক্তি ১৯৫১ সালে গৃহীত জাতীয় সঙ্গীতে দশ বছর বাদে, স্রষ্টাকে অন্ধকারে রেখে, কিছু পরিবর্তন করে, আবার ১৯৭৮ সালে পুরনোটিকেই জাতীয় সঙ্গীতের স্বীকৃতি দিয়েছিল। ততদিনে অবশ্য জাতীয় সঙ্গীতের জনক শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী কবি আনন্দ সম বকুল আত্মহনন করেছিলেন। ভারতের অবশ্য সেই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা নেই। তবে জনগণমন অধিনায়কের যে শক্তি, সঙ্গীতেরও ততটাই শক্তি। জাতীয় সঙ্গীত অবমাননার অসঙ্গত স্পর্ধা যাদের, তারা কখনও রেহাই পায় না। গণবিবেকের কাছে তাদের পরাস্ত হতেই হয়। জনগণমন গান জন্মলগ্নে নিম্ন রুচির কুৎসায় আক্রান্ত হলেও ১৯৫০ সালে মাত্র দুটি প্রদেশের বিরুদ্ধমত নিয়ে জাতীয় সঙ্গীতের শিরোপা পায়। জাতীয় সঙ্গীত জাতির পরিচয়বাহক। ভারতের ইতিহাস-ভূগোল-ঐতিহ্য আশা-আকাঙ্ক্ষা মেজাজ সব নিয়ে জনগণমন জাতির দর্পণ। এই গান এককথায়, ভারত বিচিত্রা। শব্দ চয়নের সহজ ধ্বনিময়তা, উচ্চারণের সহজতা, সরল সুরের সাবলীলতায় এই গান হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত সর্বজনীন ও সর্বত্রগামী। এ গান পারে বিশ্বশান্তির মঙ্গল শঙ্খ হয়ে উঠতে, প্রয়োজনে শান্তির জন্যে ঐ যুদ্ধের রণভেরীও হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় সঙ্গীতের উপেক্ষা অবহেলায় রাষ্ট্রের যে কর্তৃত্ববাদিতা স্পষ্ট হয় তার কুঠারাঘাত, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সারা শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করে।
সেদিন ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ-সুভাষচন্দ্র-গান্ধীজীর মতো অসামান্যরা যদি উদার দৃষ্টিতে জন্মভূমির স্নিগ্ন সজল রূপ বর্ণনা ও মাতৃ আরাধনার আবেগটুকু নিয়ে প্রথম স্তবকদুটির সার্বজনীনতাকে সম্বল করে বন্দেমাতরমকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত না নিতেন তবে খণ্ডিত ভারতের আজকের অখণ্ডতা ও ঐক্য সংহতি রক্ষা করা সম্ভব হতো না। ফলে, জাতীয় গান নিয়ে এই অশোভন বাড়াবাড়ি কোনও আবেগের প্রকাশ নয়—এ হিন্দুরাষ্ট্রের ছকে বাঁধা।
Comments :0