editorial

গাছে তুলে মই কাড়া

সম্পাদকীয় বিভাগ

একেই বলে সম্ভবত গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া। ৫৬ ইঞ্চির বিশ্বগুরু একাজটা ভালোই পারেন। এর আগেও যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে তিনি একাজটি করেছেন এখন আবার করলেন। অনলাইন অর্থ হস্তান্তর ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস অর্থাৎ ইউপিআই-র উপর কৌশলে কর চাপিয়ে দিলেন। অর্থাৎ চালু হবার পর থেকে নগদ টাকার বদলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ‍‌নিখরচায় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি গ্রহীতার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে কেনাকাটির যে অবাধ সুযোগ ছিল এখন থেকে সেটা আর নিখরচায় হবে না। তার জন্য যে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার হচ্ছে তাকে ফি দিতে হবে।
২০১৬ সালে আগাম কোনও বার্তা না দিয়ে আচমকা বাতিল করা হয়েছিল তৎকালীন ৫০০ টাকার ও ১০০০ টাকার সমস্ত নোট। মুহূর্তের মধ্যে গোটা দেশ কার্যত নগদ শূণ্য হয়ে পড়ে। লেনদেনের ক্ষেত্রে দেখা দেয় চরম সঙ্কট এবং সমোহীন নৈরাজ্য। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তাঁর এই মাস্টার স্ট্রোকের ফলে দেশ থেকে কালো টাকা ও জাল নোট নির্মূল হয়ে যাবে। তাতে সন্ত্রাসবাদীরা কপর্দকশূণ্য হয়ে যাবে। আর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাতে পারবে না। বাস্তবে মোদী ঘোষিত কোনও উদ্দেশ্যই পূরণ হয়নি। কালো টাকার রমরমা যেমন ছিল এখনও আছে। বরং বেড়েছে। জাল নোটের কারবারও বন্ধ হয়নি। সন্ত্রাসবাদীদের অর্থের জোগানও শূণ্য হয়নি।
কিছুদিন পরই এই ব্যর্থতা আড়াল করতে গোলপোস্ট সরিয়ে আগের ঘোষিত উদ্দেশ্য বদলে জানালেন নোট বাতিলের তার আসল উদ্দেশ্য ছিল নগদে লেনদেন কমিয়ে অন লাইন বা ডিজিটাল ব্যবস্থায় লেনদেনে মানুষকে বাধ্য করা। রাতারাতি বাজার থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ নগদ টাকা বাতিল বা তুলে নেবার ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন অচল হবার মুখে পড়ে। ব্যবসায়ী দোকানদার, বিক্রতাদের ব্যবসাও কার্যত অচল হয়ে পড়ে এই অবস্থায় মানুষ বাধ্য হয়ে অন লাইন পেমেন্টের নতুন ব্যবস্থা ইউপিআই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। এই ব্যবস্থায় পরিষেবা দিতে রাতারাতি তৈরি হয় একাধিক পেমেন্ট সংস্থা। পেটিএম, ফোন পে, আমাজন পে ইত্যাদি তাদের অন্যতম। সবগুলিই বেসরকারি সংস্থা। প্রধানমন্ত্রী নিজে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে এই বেসরকারি সংস্থাগুলিকে জনপ্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেন। এই সংস্থাগুলি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো বিনামূল্যে পরিষেবা দিত না। সরকার লেনদেনের সংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণ হিসেব বির্দিষ্ট হারে চার্জ দিত ভরতুকি হিসেবে। নিশ্চিত আয়ের গ্যারান্টি পেয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো এমন ডজন ডজন বেসরকারি পেমেন্ট সংস্থা গজিয়ে ওঠে। এতদিন সরকারি তহবিল থেকে তাদের মুনাফার জোগান দেওয়া হতো। এখন মোদী সরকার জানিয়ে দিয়েছে আর সরকার টাকা দেবে না। সেই টাকা ফি হিসেবে কাটা হবে লেনদেনকারীদের কাছ থেকে। ২০০০ টাকা পর্যন্ত যে কোনও লেনদেন নিখরচায় হলেও তার বেশি হলেই চার্জ দিতে হবে। সরকার বড়গলা করে বলছে চার্জ যা দেবার ব্যবসায়ীরা দেবে। ক্রেতা বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া হবে না। কিন্তু এটা শিশুরাও জানে কোনও ব্যবসায়ী ঘর থেকে টাকা এনে ক্রেতাদের দান করেন না। তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে যে খাতে যে টাকাই ব্যয় করুক না কেন সেটা ঘুরপথে পণ্য-পরিষেবার দাম বাড়িয়ে ক্রেতার কাছ থেকেই আদায় করে। তারা যা লাভ করে সেটা ক্রেতার পকেট থেকেই আসে। তেমনি পণ্য উৎপাদকের মুনাফা আসে শ্রমিকের পকেট থেকে শ্রম শোষণের মধ্য দিয়ে।

Comments :0

Login to leave a comment