তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবার পৌঁছল বিধানসভার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়। দলবিরোধী কাজের অভিযোগে ১০ বিধায়কের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিধায়ক পদ খারিজের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের নোটিশ পাঠাল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সচিবালয়। মঙ্গলবার জারি হওয়া ওই নোটিসে সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
নোটিশ পাওয়া ১০ বিধায়কের মধ্যে রয়েছেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি, অরূপ রায়, ফিরহাদ হাকিম, সন্দীপন সাহা, আখরুজ্জামান আনসারি, শিউলি সাহা, সাবিনা ইয়াসমিন, বিপ্লব মিত্র, জাভেদ খান এবং রথীন ঘোষ।
মঙ্গলবার রাতে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। আখরুজ্জামান আনসারি নোটিশ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে জানান, বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জবাব দেওয়া হবে।
এই পদক্ষেপের এক দিন আগে তৃণমূলের মমতা ব্যানার্জিপন্থী শিবিরের তরফে বিরোধী দলনেতা পদের প্রার্থী শোভনদেব চ্যাটার্জি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। ঋতব্রত ব্যানার্জি-সহ ১০ বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
জানা গিয়েছে, গত ৭ জুলাই বিধানসভার স্পিকার রথীন বসুর কাছে চিঠি দিয়ে ওই ১০ বিধায়কের বিধায়ক পদ খারিজের দাবি জানিয়েছিলেন শোভনদেব। তাদের বিরুদ্ধে দলের স্বার্থবিরোধী কাজ করার অভিযোগ তোলা হয়।
অন্যদিকে, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বীকৃতি নিয়েও মামলা চলছে কলকাতা হাইকোর্টে। মমতা ব্যানার্জিপন্থী শিবিরের তরফে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন শোভনদেব।
ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জন তাদের সঙ্গে রয়েছেন। ওই শিবির পরবর্তীতে আখরুজ্জামান আনসারিকে মুখ্য সচেতক হিসেবে নির্বাচিত করে এবং পৃথক সাংগঠনিক তৎপরতাও শুরু করে।
মমতা ব্যানার্জিপন্থী শিবিরের অভিযোগ, বিদ্রোহী বিধায়কদের এই কর্মকাণ্ড দলত্যাগের আওতায় পড়ে এবং তাদের বিধায়ক পদ খারিজ করা উচিত। দলের আইনজীবী ও সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জিও জানিয়েছেন, বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে যে ধরনের আইনি ভিত্তিতে পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে, বিধায়কদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তবে ঋতব্রতপন্থী শিবির এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, বিধানসভা সচিবালয়ের নোটিশটি প্রক্রিয়ারই একটি স্বাভাবিক ধাপ। ঋতব্রত শিবিরের মুখপাত্র ঋজু দত্ত বলেন, ১০ বিধায়কের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে রুটিন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। এই ঘটনায় মমতা ব্যানার্জিপন্থী শিবিরের উচ্ছ্বাস দেখানোর মতো কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব পড়েছে সংসদেও। বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ২০ জন লোকসভা সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দলটি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র সঙ্গে জোটবদ্ধ। ওই সাংসদদের বিরুদ্ধেও দলত্যাগ বিরোধী আইনে পদ খারিজের দাবি উঠেছে এবং লোকসভা সচিবালয় তাদের নোটিশ দিয়েছে।
এদিকে তৃণমূলের নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে বিরোধ চলছে। দলের পরিচয়, প্রতীক ও সাংগঠনিক সম্পদের উপর উভয় পক্ষই দাবি জানিয়েছে। শনিবার নির্বাচন কমিশন দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও জানা যায়নি।
বিধানসভায় প্রথম দফায় ১০ বিধায়ককে নোটিশ দেওয়া নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। মমতা ব্যানার্জিপন্থী এক বিধায়কের দাবি, বাকি বিধায়কদের নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে শিবিরে ফিরে আসার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে। তার বক্তব্য, যারা অবস্থান পরিবর্তন করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর রাজনৈতিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে বিধায়কদের নোটিশ ঘিরে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন দলীয় সংগঠনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিধানসভার সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেও প্রবেশ করলো। সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের জবাবের পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, এখন সেদিকেই নজর।
TMC
বিদ্রোহী ১০ বিধায়ককে নোটিশ, এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব তলব বিধানসভা সচিবালয়ের
×
Comments :0