১১ সদস্য দেশের ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীর অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলন শেষ পর্যন্ত সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতিতে অনেকটাই ইতিবাচক বোঝাপড়ার পথ প্রশস্ত করেছে। প্রত্যাশা আরও বেশি থাকলেও সদস্যদের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের পরস্পর বিরোধিতার কারণে জরুরি বিষয়গুলিতে নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করা সম্ভব হলেও নির্দিষ্টভাবে কোনও পক্ষকে চিহ্নিত করা যায়নি। তাই গাজায়, লেবাননে মার্কিন সহায়তায় ইজরায়েলি গণহত্যা ও ধ্বংসের অভিযানের কড়া বিরোধিতা হলেও ইজরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তেমনি কোনও রাখঢাক না রেখে স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে একবাক্যে সব দেশ সহমত হয়েছে। এবং নব গঠিত রাষ্ট্রের সীমানা হবে ১৯৬৭ সালে চিহ্নিত সীমা। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধেরও বিরোধিতা হয়েছে যৌথ ঘোষণাপত্রে। তবে এক্ষেত্রেও আমেরিকা ও ইজরায়েল নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেই ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে গোটা পশ্চিম এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও অচলাবস্থা। হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগর কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজের চলাচল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। তাতে সব দেশের অর্থনীতি প্রবল চাপে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ধাক্কা খেয়েছে আর একটা কারণেও। প্রধানত ট্রাম্পের আমেরিকার একতরফা খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের ফলে যখন তখন উচ্চ হারে শুল্ক চাপছে এবং বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে কড়া নিষেধাক্কা জারি হয়েছে। এতে সদস্য দেশগুলি প্রবল ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে এমন আচরণ বন্ধ করার পক্ষে সকলে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র বিশ্বজুড়ে শান্তি, স্থিতি ও অগ্রগতির বাতাবরণ তৈরি করতে আহ্বান জানিয়েছে এবং সেই লক্ষ্যে সকলে একজোট হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
তবে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী যে মনোভাব আগের থেকেও অনেক বেশি দানা বেঁধেছে সেটা হলো ১১ দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সহযোগিতার ভিত আরও মজবুত করা এবং পরিসর বাড়ানো। এক্ষেত্রে স্পষ্ট ইঙ্গিত পশ্চিমী উন্নত বিশ্বের উপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করা। ঘোষণাপত্রে সরাসরি বলা না হলেও আলোচনায় ও বোঝাপড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে ডলারের বিকল্প মুদ্রা এবং আর্থিক লেনদেনে পশ্চিমী নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিকল্প খোঁজা। এক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যে দেশীয় বা স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা। ইতিমধ্যেই আন্ড ব্রিকস আর্থিক লেনদেনে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে। ডলার বর্জনের কোনও চেষ্টা হলে কড়া ব্যবসার আগাম হুমকি ট্রাম্পের তরফ থেকে থাকলেও ব্রিকস থমকে যায়নি। বরং উন্নত বিশ্ব প্রভাবিত বিভিন্ন জোটের বিপরীতে দক্ষিণ গোলার্ধে বিকাশমান দেশ সমূহের ব্রিকস সম্ভাবনাময় জোট হয়ে ওঠার বার্তা দিচ্ছে। এটা এক মেরু বিশ্ব ব্যবস্থার বিপরীতে বহু মেরু বিশ্বের বাস্তবতাকে নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
Editorial
১১ দেশের বার্তা
×
Comments :0