গীতশ্রী সরকার
বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতি নিয়ন্ত্রণে, অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের জবরদখলের ক্ষেত্রে যে দেশটির নাম সবসময় সবার আগে উচ্চারিত হয় তার নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পারমানবিক শক্তি সঞ্চয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তার, তাকে আমেরিকায় আটক করে রাখা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, কিউবার ওপর কয়েক দশকের অবরোধ জারি রাখা থেকে আলবেনিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র ধ্বংস করে ট্রাম্পের মেয়ে-জামাইয়ের বিলাসবহুল রিসোর্ট স্থাপন, আলবেনিয়ার সরকারকে পুতুল পরিণত করা এই সামগ্রিক চিত্র একটি রাষ্ট্রের আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতির ছবিটিকেই স্পষ্ট করে তোলে। আমেরিকা কেবল নিজেই নয় তার সহযোগী শক্তিগুলিও মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চল দখল, মানব সম্পদের ধ্বংসলীলায় যোগ্য সঙ্গত দান করে চলেছে। ট্রাম্প কখনো ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্থাপনের জন্য বন্ধু ‘বিবি’-কে খানিক সমালোচনা করলেও তা যে ছদ্ম অভিনয় তা বুঝতে আশা করি আমাদের খুব অসুবিধা হয় না। ইজরায়েল বিগত কয়েক বছর ধরে লাগাতার প্যালেস্তাইন, সিরিয়া, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, লেবাননে আক্রমণ জারি রেখেছে; যা মধ্যপ্রাচ্যের জনজীবনকে, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামগ্রিকভাবে ধ্বংসের মুখেই ঠেলে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য ইজরায়েলের এই ধ্বংস যজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রায় সকল রাষ্ট্র আওয়াজ তুলেছে, তখন কখনো মৌন থেকে কখনো বা পরোক্ষে সহায়তা করেছে ট্রাম্পের আমেরিকা। বিগত কয়েক মাসে আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধ, শান্তি চুক্তি স্থাপনের চেষ্টা-অপচেষ্টা, হরমুজ নিয়ন্ত্রণ, ইরানে বারবার আক্রমণ, জনজীবনকে কার্যত বিপর্যস্ত করার প্রচেষ্টা সাম্রাজ্যবাদের এক নয়া স্বরূপ বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। আমেরিকার মতো শক্তি জলাশয়ের বড় মাছের মতো অনবরত বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ-মানবসম্পদকে দখল করে, কখনো বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাদের গ্রাস করতে চাইছে। নয়া সাম্রাজ্যবাদের এই নীতি আসলে একমুখী বা একমেরু বিশ্ব তৈরির প্রক্রিয়া। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী পৃথিবীর ইতিহাস, মানবজাতির ইতিহাস বহুত্ববাদের, বহুমুখী চিন্তন-দর্শনের ফসল। এই একমেরু বিশ্বের বিপরীতে বিভিন্ন দেশের একত্রিত হওয়া, বিকল্প ব্যবস্থা, বিকল্প অর্থনীতির কাঠামো গঠন আমেরিকার প্রতিবন্ধকতাহীন জয়ের পথে মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্রে সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন বা SCO-র গুরুত্ব গত এক দশকে নিঃসন্দেহে বেড়েছে। ২০০১ সালে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান এই মোট ছয়টি দেশকে নিয়ে গঠিত হয় SCO। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রশ্নকে সামনে রেখে সংগঠনটির জন্ম হয়, আজ এই সংগঠনটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, সন্ত্রাস দমন, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা— বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
জন্মলগ্নে SCO-র মূল লক্ষ্য ছিল চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সীমান্ত-নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার পরিবেশ গঠন। ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে ইরান ও বেলারুশের অন্তর্ভুক্তি সংগঠনের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিসর বিস্তারে সহায়তা করেছে। পরবর্তীতে SCO-র সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশে—ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান ও বেলারুশ। ২০২৬-এ কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেক-এ আয়োজিত ২৬ তম সম্মেলনে নিরাপত্তার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পরিবহণ-যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে, নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী সহযোগিতা কেন্দ্র গঠনে জোর দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ, SCO-র পরবর্তী পর্যায়ের লক্ষ্য কেবল নিরাপত্তা সহযোগিতা নয়; ইউরেশিয়াকে ঘিরে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও যোগাযোগভিত্তিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা।
SCO-র নিজস্ব ঘোষণাপত্রে একথা স্পষ্ট বলে হয় যে এটি কোনও রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে না এবং ঐকমত্য, জাতীয় স্বার্থের প্রতি সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা চালাবে। অর্থাৎ, SCO-র আনুষ্ঠানিক অবস্থান সামরিক জোট গঠন বা কোনও নির্দিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে একটি পালটা-মঞ্চ তৈরি করা নয়। কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, SCO-র উত্থান কি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন একটি বিকল্প পরিসর তৈরি করছে, যা মার্কিন-প্রধান বিশ্বব্যবস্থার একচ্ছত্র প্রভাবকে কিছু ক্ষেত্রে সীমিত করতে পারে? এই পরিবর্তনকে বুঝতে গেলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দুটি প্রবণতাকে পাশাপাশি দেখতে হয়। প্রাথমিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাবৃদ্ধি ঘটে। রাষ্ট্রপুঞ্জ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাঙ্ক, পরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা— এই প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে মার্কিন অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি এবং মিত্রজোটের প্রভাব যুক্ত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ‘মার্কিন-প্রধান’ বা আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত একমেরুকরণের ঝোঁক তৈরি হয়। একথা স্বীকার করতেই হয় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলির প্রভাব অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায় বেশি থেকেছে এবং মার্কিন ডলার, নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করেছে।
মার্কিনী ব্যবস্থার একবিশ্বনীতির প্রেক্ষিতেSCO-র ধারণাটি কিছুটা আলাদা। এখানে জোর দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর; পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা, ঐকমত্য এবং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা বজায় রাখা এর অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য। সংগঠনটির এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে যেখানে কোনও একটি শক্তির সিদ্ধান্তই আন্তর্জাতিক রাজনীতির চূড়ান্ত নির্ধারক হবে না। ২০২৬-এর SCO সম্মেলনেও ‘আরও ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল বহুমেরু বিশ্ব’-এর কথা উঠে এসেছে। তবে এই দুই ধারণাকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত বলাও ঠিক নয়। কারণ এমন বহু দেশ রয়েছে যারা SCO-তে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, অন্যদিকে আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্কও বজায় রেখে চলেছে। ভারতই তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আর এই ক্ষেত্রেই SCO-র গুরুত্ব বা বহুমাত্রিক আঙ্গিক প্রকাশ পায়। সংগঠনটি যদি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে পারে, তবে তা সরাসরি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার একচ্ছত্রতা কিছু ক্ষেত্রে কমাতে পারে। প্রথমত, ইউরোপ-এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কাঠামোর মধ্যে আনার ফলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মধ্য এশিয়া, ইরান এবং দক্ষিণ এশিয়ার সম্পর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প পরিবহণ করিডর ও আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রসার হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অংশ পশ্চিমা সমুদ্রপথ ও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প-বৈচিত্র্যময় ব্যবস্থার হদিশ দিতে পারবে। তৃতীয়ত,পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানোর জন্য চীন-রাশিয়ার মধ্যে বিকল্প অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থার বিকাশ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ সম্পদ, খনিজ তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা, হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকেই এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এমত পরিস্থিতিতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) গুরুত্ব অবশ্য আলোচ্য; আমেরিকার দাদাগিরিকে উপেক্ষা করে ইউরোপ-এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অর্থনীতিক লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে এই সংস্থাটি আলোচনার শিরোনামে উঠে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটিরিভিউ কমিশন (USCC)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে যে BRICS ও SCO-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আংশিকভাবে কমিয়েছে এবং নির্ভরশীল একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা করছে। বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা ও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়লেও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ডলারের অবস্থান এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। এই সময়ে উল্লেখ্য BRICS ডলারের আধিপত্যের বিপরীতে একটি বিকল্প কারেন্সি তৈরির প্রচেষ্টা করছে; যে কেবল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন বা দক্ষিণ আফ্রিকাই নয় ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা সহ লাতিন আমেরিকার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক পরিবর্তন সূচিত করতে পারে। এই পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই বিকল্প সম্ভাবনাই মার্কিন নীতি নির্ধারকদের কাছে SCO-কে গুরুত্বপূর্ণ এবং মাথাব্যথার কারণ হিসাবে প্রতিপন্ন করছে। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি-রাজনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভবিষ্যৎ কাঠামো। বিশেষজ্ঞদের মতে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ইউরোপ, এশিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশে মার্কিনী আধিপত্য সঙ্কোচনের সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করবে। একযোগে চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরান ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটলে, বিকল্প আর্থিক ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো তৈরি হলে নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন প্রভাব বহুক্ষেত্রেই দুর্বল হতে পারে। USCC-র বিশ্লেষণেও চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে মার্কিন নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আমরা আগেই বলেছি যে, এই সংগঠনটি NATO-র মতো সামরিক জোট নয়। এর নিজস্ব যৌথ সামরিক কমান্ড নেই, কোনও সদস্যের উপর অন্য সদস্যের পক্ষে সামরিক প্রতিরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। বরং ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেখা যায় SCO-র সমস্ত সদস্যদের স্বার্থও এক নয়। যেমন— ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ, মধ্য এশিয়ার দেশগুলির নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার রয়েছে। এই সমস্ত বৈচিত্র, বিরোধকে সঙ্গে করেই এক বিকল্প কাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়াটি ক্রিয়াশীল। আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ‘আমেরিকা বনাম SCO’ এই সরল দ্বন্দ্বে নয়। বরং বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যবস্থার দিকে এগচ্ছে যেখানে একাধিক শক্তিকেন্দ্র একই সঙ্গে সক্রিয় থাকবে। একদিকে যেমন আমেরিকা তার মিত্রজোট, প্রযুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবেই থাকবে, তেমনি একই সঙ্গে চীন তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি বাড়াবে, রাশিয়া তার সামরিক ও জ্বালানি প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করবে এবং প্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। SCO সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ; যার মধ্যে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প কেন্দ্র হিসাবে উপস্থাপিত হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাই রয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি ছবি স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রগুলি ক্রমশ একক কোনও শক্তির উপর নির্ভর না করে একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চের অংশীদার হয়ে উঠতে চাইছে। SCO, BRICS, G20, ASEAN, ইউরোপীয় ইউনিয়ন— প্রতিটি কাঠামোরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। ফলে আগামী দিনের বিশ্ব সম্ভবত একক নেতৃত্বের বদলে বহু কেন্দ্রের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা ও সমঝোতার বিশ্ব হয়ে উঠবে।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে SCO-র পঁচিশ বছরকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের একটি লক্ষণ হিসাবে দেখা যুক্তিসঙ্গত। SCO কতটা কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে তার আগামীর পথচলার ওপর; SCO-র অন্তর্গত দেশগুলির পারস্পরিক অর্থনৈতিক সংযোগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং সদস্যদের পারস্পরিক আস্থার উপর। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হল, বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কি আর একটি মাত্র শক্তিকেন্দ্রের উপর নির্ভর করবে, নাকি একাধিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বকে এক নয়া বিকল্পের সন্ধান দেবে।
Multipolarity
একমেরুকরণের বিপরীতে এক বিকল্প ভাষ্য
×
Comments :0