উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে ড্রোন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে আসা ৭ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে এনআইএ। গত মার্চ মাসে কলকাতা, দিল্লি ও লক্ষ্ণৌ বিমানবন্দর থেকে তাদের আটক করা হয়। এই ৭ জনের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র যোগসাজস রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। তবুও তাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ দায়ের না করে পাসপোর্ট ছাড়া ভ্রমণের মতো হালকা ধারায় মামলা রুজু করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
বিরোধী মত দমনে যে মোদী সরকার গণআন্দোলনের কর্মীদের ইউএপিএ-এনএসএ আইনে ফাঁসাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না, সরাসরি সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত এই বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করতে তাদের হাত কাঁপছে কেন? ঠিক কী কারণে এই মামলা এড়িয়ে যেতে চাইছে এনআইএ? দেশের মাটিতে উগ্রপন্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা কেন লঘু করে ধামাচাপা দিতে চাইছে মোদী সরকার? এর পিছনে কী কোনও কূটনৈতিক চাপ কাজ করছে? যদি তাই হয়ে থাকে এমন চাপের কাছে মোদী সরকার মাথা নত করছে কেন? প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে।
মার্চ মাসে গ্রেপ্তার হওয়া ৭ বিদেশির বিরুদ্ধে মঙ্গলবার দিল্লির বিশেষ এনআইএ আদালতে চার্জশিট পেশ করেছে এনআইএ। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, এই ৭ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ’র কোনও ধারা প্রয়োগ করা হয়নি। পরিবর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইনের ৩ এবং ৭ নম্বর ধারায় মামলা করা হয়েছে। এই ধারাগুলির আওতায় ভারতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ নথিপত্র না থাকার বিষয়টি বিচার্য।
চার্জশিটে এনআইএ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা মিজোরাম হয়ে বেআইনিভাবে বার্মায় প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে বার্মার জুন্টা শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই রত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের ড্রোন যুদ্ধ, ড্রোন পরিচালনা, ড্রোন সংযোজন এবং জ্যামিং প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এই কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা। চার্জশিটে দায় পুরোপুরি বার্মার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলেও গ্রেপ্তারির সময় উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকেই তারা প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে দাবি করা হয়। চার্জশিটে বয়ান পালটে গেল কেন, এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
ইউএপিএ’র অধীনে অভিযোগের তদন্ত আপাতত অসম্পূর্ণ রেখেছে এনআইএ। আদালতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বিশেষ সরকারি আইনজীবী রাহুল ত্যাগী জানান, ইউএপিএ’র আওতায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন। বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও তার আনুসাঙ্গিক সরঞ্জাম ভারতে আনা ও উদ্ধারের বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত চার্জশিট পেশ করা হতে পারে। আগামী ১ অক্টোবর মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা।
এনআইএ’র তদন্ত অনুযায়ী, অভিযুক্তরা প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিলেন। মিজোরামে প্রবেশের ক্ষেত্রেও তাঁরা বাধ্যতামূলক ‘প্রোটেক্টেড এরিয়া পারমিট’ নেননি বলে অভিযোগ। তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, ইউরোপ থেকে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোনের চালান অভিযুক্তদের মাধ্যমে মিজোরামের বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছিল।
এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ৭ জনের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক এবং ৬ জন ইউক্রেনের নাগরিক। ৪৬ বছরের মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ ভ্যান ডাইককে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর নিজের ওয়েবসাইটে তিনি ২০১১ সালের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে মুয়াম্মর গদ্দাফিকে উৎখাতের জন্য লড়াই করার দাবি করেছিলেন। এই ব্যক্তির মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং ইজরায়েলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের সঙ্গেও কাজ করার কথা বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
গত ১৩ মার্চ লক্ষ্ণৌ বিমানবন্দর থেকে ইউক্রেনের পেত্রো হুরবা, তারাস স্লিভিয়াক এবং ইভান সুখমানভস্কিকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ইউক্রেনের আরও তিন নাগরিক—মারিয়ান স্টেফানকিভ, ম্যাক্সিম গনচারুক এবং ভিক্টর কামিনস্কিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এনআইএ সূত্রে দাবি, ইউক্রেনের থেকে আসা এই দল গত বছরের ডিসেম্বরে মুম্বইয়ের কয়েকটি হোটেলে ছিল। সেখান থেকে তারা গুয়াহাটি যায় এবং পরে মিজোরাম হয়ে বেআইনিভাবে বার্মায় প্রবেশ করে বলে অভিযোগ। অন্য একটি দল দিল্লির পাহাড়গঞ্জের এক হোটেলে থাকার পর গুয়াহাটি যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এনআইএ আরও জানিয়েছে, জেরায় অভিযুক্তদের কয়েকজন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন, যারা উত্তর-পূর্ব ভারতের বেশ কয়েকটি উগ্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত এবং সন্ত্রাসমূলক বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত।
তবে এত গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পরেও মূল চার্জশিটে ইউএপিএ না থাকা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। এনআইএ নিজেই যখন ড্রোনের বিপুল চালান, বিদেশি নাগরিকদের মিজোরাম হয়ে মায়ানমারে যাতায়াত এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তের আওতায় এনেছে, তখন সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ইউএপিএ প্রয়োগ করা হল না কেন? শুধুমাত্র সন্দেহ আর গুজবের ভিত্তিতে গণআন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে যে মোদী সরকারের মুহুর্মুহু ইউএপিএ-এনএসএ চাপাতে বিন্দুমাত্র হাত কাঁপে না, একেবারে বামান সমেত গ্রেপ্তার এই ইউক্রেন ও মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন চাপাতে এত দ্বিধা কেন? কঠিন ধারায় মামলা দায়ের না করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কী ওয়াশিংটন বা অন্য কোন জায়গা থেকে নয়াদিল্লির ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে? রাজনৈতিক মহলে এমনই প্রশ্ন উঠছে।
CIA North East
উগ্রপন্থীদের ড্রোন প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে ধৃত ৭ সিআইএ ঘনিষ্ঠের বিরুদ্ধে ইউএপিএ নয়
×
Comments :0