Editorial

আর এক গুজরাট মডেল

সম্পাদকীয় বিভাগ

এর আগে এডিআর (অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোগ্রাফিক রিফর্মস) তাদের রিপোর্টে যথেষ্ট অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। অবৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহ করেছিল সিবিডিটি (কেন্দ্রীয় প্রত্যক্ষ কর পর্ষদ)ও। এবার বিবিসি হিন্দির তদন্তমূলক সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হাড়ির খবর। জলের মতো স্পষ্ট দৃশ্যগোচর হয়ে গেছে আর এক গুজরাট মডেলের ছবি।
এদেশের মানুষকে দেখানোর জন্য গুজরাট মডেলের অন্ত নেই। আদতে গুজরাটের বাসিন্দা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই একটা গুজরাট মডেল। সঙ্গে দোসর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। বস্তুত ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি-র প্রচারের অন্যতম ইস্যুই ছিল গুজরাট মডেল। রাজ্যে রাজ্যে গিয়ে বড় বড় সভা করে মোদী দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় এলে গোটা দেশকে গুজরাট বানাবেন। অর্থাৎ মোদী সে সময় মানুষের কাছে এটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন যে সারা দেশের মধ্যে উন্নয়নের বিচারে গুজরাটই শ্রেষ্ঠ। শিল্পে, বিনিয়োগে, অর্থনীতিতে, বাণিজ্যে গুজরাটই দেশের মধ্যে সেরার সেরা। আর এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোদীর মুখ্যমন্ত্রীত্বের দৌলতে। অর্থাৎ গুজরাট মডেলের কারিগর মোদী যা মোদী মডেল হিসাবেও প্রচারিত। মোদী প্রধানমন্ত্রী হলে দেশে গুজরাট মডেল তৈরি হবে।
অবশ্য গুজরাট মডেল কখনোই একমাত্রিক নয়। মনে রাখতে হবে সরকারি প্রশ্রয়ে গুজরাট দাঙ্গার সময় যে মুসলিম গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল সেটাই স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সেই অর্থে গুজরাট দাঙ্গাও এক অনন্য গুজরাট মডেল যা মোদীর রাজত্বেই সংগঠিত হয়েছিল। মোদী জমানায় যে সব বড় বড় শিল্প-ব্যবসায়ীরা ব্যাঙ্কের থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ না নিয়ে সব টাকা হাতিয়ে বিদেশে পালিয়ে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন তাদের ৯০ ভাগই মোদীর রাজ্য গুজরাটের মানুষ। সরকারের পরোক্ষ ও প্রচ্ছন্ন মদত না থাকলে এটা কখনই সম্ভব হতো না। সেই অর্থে এটাও একটা গুজরাট মডেল।
সদ্য উন্মোচিত গুজরাট মডেলে দেখা যাচ্ছে অখ্যাত, অস্বীকৃত এবং কার্যত অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক দলের এভারেস্টচুম্বী তহবিল। শুধুমাত্র ২০২৩-২৪ সালে এমন ৬টি দলের তহবিলে জমা পড়েছে ১৭০০ কোটি টাকার অনুদান। ভাবা যায় ঐ বছর দেশের পাঁচটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দল (বিজেপি বাদে) মোট যা অনুদান পেয়েছিল তার থেকে অনেক বেশি অনুদান পায় মোদীর রাজ্য গুজরাটের ৬টি নাম-গোত্রহীন কেবলমাত্র সাইনবোর্ডধারী দল। মোদী ম্যাজিক ছাড়া এমন হওয়া এক কথায় অসম্ভব। যে দলগুলির কোনও কর্মসূচি হয় না, আন্দোলন নেই, প্রচার নেই, অফিস খোলা হয় না, ভোটে একজন বা দু’জন প্রার্থী দেওয়া হয়, কোনও স্তরেই কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। এমন দলকে কারা ঠিক কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এত বিপুল অনুদান দিয়ে থাকে? আর সেই টাকা কোন খাতে কীভাবে খরচ করা হয়? এর কোনও সদুত্তর সংশ্লিষ্ট দলগুলি থেকে যেমন মেলেনি তেমনি মেলেনি রাজ্য সরকার বা নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকেও।
প্রসঙ্গত দেশে এমন নথিভুক্ত স্বীকৃত দলের সংখ্যা ২৮০০। এদের ৭৩ শতাংশের কাছ থেকে আয়-ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায় না। পর্দার আড়ালে কত শত কোটি টাকা লেনদেন হয় দেশের ডাবল ইঞ্জিনের সরকার খবর রাখে না বা রাখলেও জনগণকে জানায় না। মোদীর গুজরাটেই ১০টি অজ্ঞাত দল ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ সালে ৪৩০০ কোটি টাকা অনুদান সংগ্রহ করেছিল বলে সংবাদে ফাঁস হয়েছিল। না সরকার, না নির্বাচন কমিশন, না আদালত কোনও জায়গা থেকেই সত্য প্রকাশের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে নানা ঘটনায় এটা উঠে এসেছে শাসক দলের ছায়া দল হিসাবেই এদের তৈরি করা হয়। অবৈধ পথে টাকা চালান হয় মূল দলে। মূল দলের বাফার হিসাবে এরা কাজ করে। তাই সত্য প্রকাশের দায় মোদীদের ওপরই বর্তায়।
 

Comments :0

Login to leave a comment