অযোধ্যার রামমন্দির দেখভালের জন্য শেষ পর্যন্ত সিইও পদে বসানো হলো এক প্রাক্তন বায়ুসেনা কর্তা গোবিন্দদেব গিরিকে। কারগিল যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং অপারেশন সিঁদুরের সময় ওয়েস্টার্ন কমান্ডের দায়িত্বে থাকা এই বায়ুসেনা কর্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তাঁর হাতে মন্দিরের মূল দায়িত্ব তুলে দিয়ে রাম মন্দিরের উপর প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে নানা মহল থেকে অনুমান করা হচ্ছে। এটা ঠিক সঙ্ঘ পরিবারের নানা শাখার সমন্বয়ের মাধ্যমে সর্বাত্মক উদ্যোগে রামমন্দির তৈরি হয়েছে। ধর্মে অগাধ বিশ্বাসী হিন্দুরা অকাতরে দান করেছেন মন্দির নির্মাণের জন্য। কত সহস্র কোটি টাকা মন্দির তহবিলে এসেছে, তার উৎস কি, কত টাকা কোন খাতে কীভাবে খরচ হয়েছে তার স্বচ্ছ হিসাব রামভক্তদাতারা কোনোদিন জানতে পারবেন কিনা বলা মুশকিল। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রথা মেনে হিসাব পরীক্ষা হয় কিনা সেটাও স্পষ্ট নয়।
আমজনতার মনে এমন হাজারো প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বেঁধেছে মূলত রাম মন্দিরে প্রতিদিন পুণ্যার্থীদের দেওয়া কোটি কোটি টাকা চুরি হয়ে যাবার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে। ভক্তদের টাকায় শুধু রামমন্দির নির্মাণ হয়েছে তা নয়। জনগণের করের হাজার হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকার এবং উত্তর প্রদেশ সরকার খরচ করেছে মন্দিরকে ঘিরে গোটা অযোধ্যাকে সাজানোর জন্য। হয়েছে বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল সহ হাজারো পরিকাঠামো।
যে মন্দিরকে ঘিরে ভক্তদের এত আবেগ এত উচ্ছ্বাস সেই মন্দির কিনা শেষ পর্যন্ত চোরেদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অথচ হিন্দুদের তথাকথিত ঠিকাদার সঙ্ঘ পরিবারের গুরুত্ব পদাধিকারী ও প্রভাবশালীরাই ছিলেন প্রধানত মন্দির পরিচালনার দায়িত্বে। হিন্দুত্ববাদীদের হাতেই যদি হিন্দু মন্দির নিরাপদ না হয়, ভক্তদের দানের টাকা যদি বেমালুম চুরি হয়ে যায়, তাহলে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা কাদের উপর ভরসা করবেন। এটা বিশ্বাস করা কঠিন তথাকথিত সর্বত্যাগী সাধু-সন্ন্যাসীদের অধীনে থাকা রামমন্দিরের দানের টাকা লুট হয়ে যায়। তবে তো সাধুদের সাধুত্ব ও সন্ন্যাসীদের সন্ন্যাসিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়। তাহলে কি হিন্দত্ববাদী নেতা এবং সাধুদের হাতে হিন্দু মন্দিরের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার আগে দশবার ভাবা উচিত? এমন ভাবনা থেকেই কি শেষে অবসর প্রাত্র বায়ুসেনা কর্তাকে এনে মন্দির ট্রাস্টের মাথায় বসানো হয়েছে।
এদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় হলো অযোধ্যার রামমন্দির। নামে হিন্দুদের রাম মন্দির হলেও নিরঙ্কুশ ধর্মীয় ঘেরাটোপে এই মন্দির গড়ে ওঠেনি এবং পরিচালিতও হচ্ছে না। এই মন্দির পুরোপুরি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কবজায়। তাই রাজনৈতিক হিন্দুত্বের বিশ্বস্ত প্রতিনিধিদেরই দায়িত্বে আনা হয় মন্দির পরিচালনায়। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। ভক্তদের দান চুরির ইকোসিস্টেম তৈরি হয়ে যায় আড়ালে আবডালে। বাইরের মানুষের সন্দেহ না হলে এই চুরির খবর হয়তো গোপনই থেকে যেত। রক্ষকরাই ভক্ষক থেকে যেতেন। ধরা পড়ার পর যোগী-মোদীদের বেইজ্জতির আর সীমা নেই। নির্বাচনের আগে রামমন্দিরের গাড্ডা থেকে পরিত্রাণ পেতে একেবারে মিলিটারি কর্তাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতেও চিঁড়ে ভেজার আশা নেই। কারণ চোররা, চোরের শাগরেদরা সব চিহ্নিত হয়নি। তাদের কঠোরতম সাজার ব্যবস্থা হয়নি। হিন্দুত্ববাদী নেতা, সাধুসন্তরা এর দায় নেননি। অর্থাৎ রামমন্দিরে ভক্তদের দান চুরি করেও রেহাই পাওয়া যায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসকে খুন করে রাম মন্দিরকে অপবিত্র করেও বহাল তবিয়তে থাকা যায়। চোরদের বিরুদ্ধে কঠোর হবার সাহস মোদীদের নেই। তাই সেনা কর্তা বসিয়ে সবটা ধামাচাপা দিতে চাইছেন।
editorial
সাধু হিন্দুত্বে ভরসা নেই
×
Comments :0