Baruipur Case Chargeshéet

এখনও অধরা বিজেপি নেতা: বারুইপুর ধর্ষণ-খুনে চার্জশিট পুলিশের

রাজ্য জেলা

 বিজেপি নেতার দায়ের করা মিথ্যা মামলায় ইতোমধ্যেই সিপিআই(এম) নেতা লাহেক আলি অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন। এবার ৫৭ দিনের মাথায় বারুইপুরের সূর্যপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় চার্জশিট পেশ করল পুলিশ। বারুইপুর বিশেষ পকসো আদালতে ৭০২ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দিয়েছে জেলা পুলিশের গঠিত সিট।
৪ জন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)’র ১৩৭(২), ১৪০(৩), ৬৫(১), ৭০(২), ১০৩(১), ২৩৮ ও ৬১ ধারা, পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশি এনকাউন্টারে মৃতু হয়েছে ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত ও সাক্ষী প্রভাস মণ্ডলের। চার্জশিটে অভিযুক্ত বাকি তিনজন হলো, আনন্দ সরদার, দিবাকর সরদার ও কবীর মোল্লা। ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় এই চারজনকেই গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। 
যদিও ঘটনার পরেরদিন নাবালিকার বাবার দায়ের করা এফআইআরে আনন্দ সর্দার, প্রভাস মণ্ডল, দিবাকর মণ্ডল ছাড়াও আরেকজনের নাম ছিল। নিহত নাবালিকার বাবা বারুইপুর থানায় ৫ তারিখে যে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন, তাতে অভিযুক্তের তালিকার তিন নম্বরে ছিল ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের নাম। ঘটনার পরে বিক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভের মুখে দলবদ্ধ পিটুনিতে মৃত্যু হয় তার। অথচ তদন্ত শেষের আগেই দল বেঁধে পিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে মুখ্যমন্ত্রী নিরাপরাধ বলে দিয়েছিলেন। বারুইপুর কাণ্ডে এনকাউন্টার বারেবারে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিহত প্রভাস মণ্ডল অন্যতম অভিযুক্ত। তাকে ১৪ দিনের হেপাজতেও নিয়েছিল পুলিশ। তাহলে মুখ্যমন্ত্রীর বারুইপুর এসপি অফিসে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কেন এনকাউন্টারের পথে হাঁটতে হয়েছিল? বিচারবহির্ভূত পথে কেন গেল সরকার? প্রভাস মণ্ডলের বয়ান কী অস্বস্তি বাড়াতো প্রশাসনের? নিছক ধর্ষণ-খুনের আড়ালে আরও কোনও বৃহত্তর সামাজিক অপরাধ চক্রকে আড়ালর চেষ্টা নয় তো! প্রভাস মণ্ডল কী ঐ নাবালিকাকে অপহরণ করে আসলে কোনও পাচার চক্রের হাতে টাকার বিনিময়ে তুলে দিতে চেয়েছিল? এই কোনও প্রশ্নের উত্তর স্বাভাবিকভাবেই চার্জশিটে নেই। 
সূর্যপুরের নাবালিকা ধর্ষণ-খুনের ঘটনার চার্জশিট দিলেও এখনও অধরা বিজেপি’র স্থানীয় নেতা শান্তনু মণ্ডল। অথচ ঘটনার পর থেকেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে তাঁকে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে জনরোষের হাত থেকে সরিয়ে পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল অভিযুক্ত আনন্দ মণ্ডলকে পুলিশ ক্যাম্প থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ঘটনার দিন বারুইপুর-জয়নগর রোড অবরোধ চলাকালীন পুলিশ মাইকে ঘোষণা করেছিল, শান্তনু মণ্ডলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজন হলে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হবে।  যদিও শেষ পর্যন্ত সে পথে হাঁটেনি পুলিশ। বারুইপুর জেলা পুলিশের তরফে এদিন জানানো হয়েছে, চার্জশিট পেশের পরে চার্জ ফ্রেম করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে আদালতে। 
৪ জুলাই বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ সূর্যপুর বাজারের সামনে নতুন হওয়া তাঁদের বাড়ি থেকে মা ও দিদিকে জানিয়ে বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কিনতে বেরিয়েছিল ১২বছরের ওই স্কুলপড়ুয়া। সন্ধ্যার পরেও না ফেরায় গ্রামের বাসিন্দারাও  খোঁজ করতে নামেন। রাত পৌনে আটটা নাগাদ বারুইপুর থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়। যদিও নাবালিকার বাবার অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের অভিযোগ তখন ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি, কোনও গুরুত্বই দেয়নি। এরপর গ্রামের যুবকরাই দল বেঁধে বেরোন। সুর্যপুর বাজারে থাকা সিসিটিভি’র ফুটেজ দেখা হয়। এরপরে গ্রামবাসীরাই রাত দু’টো নাগাদ প্রভাস মণ্ডলের বাড়ি যায়। জনগণের প্রবল ক্ষোভ, রাগের মুখে তখন ভয়ে সে স্বীকার করে, মেয়েটিকে নিয়ে গেছে কয়েকজন। মূল পান্ডা আনন্দ সরদার, দিবাকর সরদার সহ আরও দু’-তিনজন। সকালে বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে নাছোনগাছায় একটি ক্লাব সংলগ্ন পুকুরে পাওয়া গিয়েছিল বস্তাবন্দি দেহ। ধর্ষণের পরে ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে নৃশংসভাবে খুন করে মুখে কাপড় গুঁজে ২৫ কেজির বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তখনও প্রাণ ছিল। কারণ ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, নাবালিকার ফুসফুসে ঢুকেছিল জল মৃত অবস্থায় জলে ফেললে তা সম্ভব নয়।
নৃশংস এই ঘটনায় রাজ্য জুড়ে তোলাপাড় হয়। রাজ্য সরকার সিট গঠন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। গ্রামের মানুষজন রাস্তায় নামে, প্রতিবাদ বিক্ষোভে শামিল হয়। যদিও সরকারের তরফে দমন পীড়ন, মিথ্যা মামলায় একের পর এক গ্রেপ্তারি অভিযান চালিয়ে সেই প্রতিবাদকে আটকানোর চেষ্টা হয়। ন্যয় বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামা গ্রামবাসীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই প্রতিবাদে শামিল হওয়ার অপরাধে লাহেক আলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।ঘটনাস্থল থেকে আট-নয় কিলোমটার দূরে বারুইপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা, বিজেপি’র মণ্ডল সভাপতি গৌতম চক্রবর্তীর করা এফআইআর-র ভিত্তিতে এক সপ্তাহ পরে ১২ জুলাই রাতে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল লাহেক আলিকে।

Comments :0

Login to leave a comment