মুক্তধারা
প্রবন্ধ
আই উইল গো টু দ্যা টপ, গো টু দ্যা টপ, গো টু দ্যা টপ
কৃশানু ভট্টাচার্য্য
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
জীবন সায়াহ্নে এক ঈর্ষণীয় উচ্চতায় উঠবার পরে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল দৃষ্টিদান, কামনা, সহযাত্রী , নষ্টনীড় কিম্বা সঞ্জীবনীর কথা। ১৯৪৮ সাল- সদ্য স্বাধীন হওয়া দেখে বিনোদনের গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র যখন মধ্য গগনে সে সময় কলকাতা বন্দরের এক কর্মী নাম লিখিয়েছিলেন রূপালি পর্দার জগতে। প্রথমদিকে একটার পর একটা ব্যর্থতা আর তারপর ঘুরে দাঁড়ানো। এরপর সেই অদম্যনীয় গতি- একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি কে অতিক্রম করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির মহানায়ক। কেউ বলতো গুরু, কেউ বলতেন নায়ক আর দিনের শেষে তিনি সেকালের এবং একালের বাংলা বিনোদন জগতের অন্যতম নক্ষত্র উত্তম কুমার। চিরন্তন হাসি আর তার সঙ্গে সঙ্গে মেলো ড্রামা থেকে ট্রাজেডি সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থেকে সাইকোলজিকাল পেইন সবেতেই তিনি স্বচ্ছন্দ। এক সময় তাকে দেখতে হাজার হাজার মানুষ ছুটেছেন সিনেমা হলে। একসময় তার অভিনীত ছবিতে কলাকুশলী হিসেবে কাজ করে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন হাজার হাজার চলচ্চিত্র কর্মী। সমৃদ্ধ হয়েছেন ছবির প্রযোজক এবং ডিস্ট্রিবিউটারা। হয়তো তিনি একা হয়ে গিয়েছিলেন। ওই গগনচুম্বি উচ্চতায় ওঠবার পর সেটাই তো স্বাভাবিক। একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি নিজের চরিত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পছন্দ করেছেন কিন্তু রোমান্টিক নায়কের তকমায় তার জনপ্রিয়তা বারে বারে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জগত থেকে তাকে সরিয়ে এনে পরিণত করেছিল ম্যাটিনি আইডলে। বাংলা ছবির জগতে একটার পর একটা সুপারহিট সিনেমা, একটার পর একটা সুপারহিট জুটি, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মান্না দের কন্ঠে কাল জয়ী সংগীতের ডালি। আর এরমধ্যেই উত্তম কুমার স্থায়ীত্ব পেয়েছেন বাংলা সংস্কৃতির জগতে।
বাংলা ছবির জগৎ সম্পর্কে তার একটা নিজস্ব ভাবনা ছিল যদিও তা বাস্তবায়িত করার সুযোগ তার জীবনে আসে নি। একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যদি পশ্চিমবাংলার সরকার তাকে চলচ্চিত্র উন্নয়নের দায়িত্ব দেন তবে তিনি যে কোন চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে তার গল্প নির্বাচন করবার ক্ষেত্রে একটি বোর্ড তৈরি করতেন। বাঙালি চলচ্চিত্র প্রেমী মানুষের কাছে সিনেমা এখনো একটা 'বই'। আর সে কারণেই সিনেমার ভালো-মন্দ নির্ভর করবে সিনেমার গল্পের উপর।
আর এই বোর্ড থেকেই তিনি পরিচালনা করেছিলেন 'বনপলাশীর পদাবলী'। সিনেমাটি তৈরি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র কর্মীদের দুর্দশা থেকে রক্ষা করবার জন্য। বিনা পারিশ্রমিকে সেই চলচ্চিত্রের পরিচালনা চিত্রনাট্য রচনা এবং অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার। সঙ্গে ছিলেন সেকালের বাংলা চলচ্চিত্র জগতের বেশ কয়েকজন দিকপাল শিল্পী সুপ্রিয়া দেবী, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, বাসবী নন্দী ,জহর রায়। সে ছবিও সেকালের দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে আশ্রয় দিয়েছে , বিপন্ন চলচ্চিত্র কর্মীদের।
সত্যিই তিনি নিজেকে এমন একটি উচ্চতায় নিয়ে গেছিলেন যেখানে হয়তো তিনি একা এবং প্রয়াণের এত বছর পরেও তাঁর সেই আসন অমলিন।
Comments :0