editorial

আসল লড়াই মতাদর্শের

সম্পাদকীয় বিভাগ

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দশ হাজার লোক জড়ো করে বন্দে মাতরম গাইবার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন প্রাক্তন মাওবাদী ঘনিষ্ট তৃণমূলী, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শেষ পর্যন্ত কত শত বা কত হাজার মানুষ যোগ দিয়েছিলেন সে প্রশ্ন সরিয়ে রেখে বলা যায় তাতে মুখ্যমন্ত্রী একটি সুদূরপ্রসারি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। রীতিমতো হুমকি দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন যাদবপুরে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) হয় তারা থাকবেন অথবা ওরা (এসএফআই তথা বামপন্থীরা) থাকবে। মাঝখানে অন্য কিছু থাকবে না। এর আগেও এধরনের কথা তিনি বার কয়েক বলেছেন।
রাজ্যে প্রায় তিন ডজন শ্বিবিদ্যালয়ের মধ্যে যাদবপুর একটি। আর কোনও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বর্তমান হিন্দুত্ববাদী শাসকের ততটা মাথাব্যথা নেই যতটা আছে যাদবপুরকে নিয়ে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান টার্গেট হয়ে উঠেছে যাদবপুর। মুখ্যমন্ত্রী তো বটেই, অন্যান্য মন্ত্রী, দলের নেতা, বিধায়ক, সাংসদরাও প্রতিনিয়ত যাদবপুরকে আক্রমণ করে চলেছেন। লক্ষ্য একটাই যেভাবেই হোক যাদবপুরকে ধর্মান্ধ সনাতনী হিন্দুত্ববাদীদের আখড়ায় পরিণত করা। তাদের দুর্ভাগ্য রাজ্যের ক্ষমতা দখলের পরেও যাদবপুরে দাঁত ফোটানো সম্ভব হচ্ছে না। দলের বিধায়ক, নেতা, মন্ত্রী, এবিভিপি-আরএসএস সশস্ত্র দুষ্কৃতী সহযোগে বারবার হামলা চালিয়েও বামপন্থী চেতনায় উজ্জীবিত ছাত্রসমাজকে দমাতে বা দুর্বল করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে না।
প্রশ্নটা অবশ্য নিছক ক্যাম্পাস দখল নয়। সেই অর্থে, রাজ্যের কোনও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েই আরএসএস-এবিভিপি-র নিরঙ্কুশ আধিপত্য নেই। তাহলে শুভেন্দুরা কেন যাদবপুর দখল করতে এতটা মরিয়া এবং বেপরোয়া? কেনই বা যাদবপুর দখল করা নিয়ে গত প্রায় একমাস ধরে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কারের মধ্যেই। হয় আমরা নয় ওরা। মাঝখানে কেউ থাকবে না। আমরা মানে বর্তমান ভারতের সবচেয়ে কট্টর, উগ্র, প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদের উপর ভর করে এই রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্রুত শক্তিশালী হয়ে কেন্দ্রে ও অধিকাংশ রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে। এই শক্তি অর্থনীতির প্রশ্নে একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি। তাই ভারতের বৃহৎ বুর্জোয়ারা তাদের নিজেদের স্বার্থে সর্বশক্তি নিয়ে এই শক্তির পেছনে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান শ্রম শোষণ, বঞ্চনা, উৎপীড়নের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও ক্ষমতাহীন-অধিকারহীন করে বৃহৎ পুঁজি তাদের সম্পদ বাড়িয়ে চলেছে।
এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান বামপন্থীদের। বামপন্থী তথা কমিউনিস্টরা সমাজে বৃহৎ পুঁজি শ্রমশোষণ বন্ধ করে শ্রমের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করতে চায়। অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় মানুষের শ্রমে যে সম্পদ তৈরি হয় তার ন্যায্য বণ্টন করে সমাজে আয় ও সম্পদ বৈষম্য কমাতে চায়। সম্পদের অতি কেন্দ্রীভবনের কাঠামো ভেঙে ফেলতে চায়। শ্রেণি শোষণহীন, বৈষম্যহীন, সামাজিক ও ধর্মীয় ভেদাভেদহীন উন্নত আধুনিক সম্প্রীতির মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যাদবপুরের ছাত্র সমাজ এসএফআই সহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায় এমন সমাজেরই স্বপ্ন দেখে। আরএসএস জানে বাম মতাদর্শ মানেই তাদের হিন্দুত্ববাদী বুর্জোয়া মতাদর্শের প্রধান প্রতিবন্ধক। বাকিদের সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক লড়াই চলতে থাকবে। কিন্তু মতাদর্শগত লড়াই একমাত্র বামপন্থীদের বিরুদ্ধে। বামপন্থীরা কত ভোট পাচ্ছে সেটা বড় কথা নয়। ভয় বাম মতাদর্শকে। কারণ একে পদানত করা সহজ নয়। সেজন্যই মতাদর্শগত লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে যাদবপুর। বামপন্থীরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।

Comments :0

Login to leave a comment