প্রবীর দাস: বসিরহাট
নেপালে হড়পা বানে বাংলার নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার ভবানী ভবন থেকে ভার্চুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বলেছেন, রাজ্য সরকারের তরফে নেপাল প্রশাসন ও কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রের অনুমতি নিয়ে রাজ্যের প্রতিনিধিদল নেপালে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এই আতঙ্কের মধ্যেই বসিরহাটের পোদ্দার পরিবারে ফিরল স্বস্তি। নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর থেকে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না, সেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অনুকূল পোদ্দার এবং তার স্ত্রী রেবা পোদ্দারের সঙ্গে অবশেষে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে তাদের বিষয়ে খোঁজ পাওয়ার পরই কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। রাজ্য থেকে নিখোঁজ ৩৯ জনের মধ্যে এই দু’জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন।
বসিরহাট পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাছারিপাড়া এলাকার বাসিন্দা অনুকূল পোদ্দার পেশায় প্রাক্তন শিক্ষক। স্ত্রী রেবা পোদ্দারকে সঙ্গে নিয়ে নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে পর্যন্ত তাদের সফর স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু বুধবারের ভয়াবহ হড়পা বান ও আকস্মিক বন্যার পর থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাড়িতে থাকা আত্মীয়-পরিজনরা বারবার ফোন করেও কোনও সাড়া পাচ্ছিলেন না। সময় যত গড়াচ্ছিল, ততই বাড়ছিল উৎকণ্ঠা। পরিবারের সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল নেপালের পরিস্থিতির ভয়াবহতা। হড়পা বান ও পাহাড়ি ঢলের জেরে বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বহু রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আটকে পড়েন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা। এর মধ্যেই একের পর এক ভারতীয় পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর সামনে আসতে থাকে। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে ছিল বাংলার একাধিক পরিবার। রাজ্য প্রশাসনও পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে নিখোঁজদের সন্ধানে নেপাল প্রশাসন ও ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। ভবানী ভবন থেকে ভার্চুয়াল বৈঠকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরিস্থিতির কথা শোনেন তিনি। শুধু আশ্বাস দেওয়াই নয়, নিখোঁজদের সন্ধানে রাজ্য সরকারের তরফে কী কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে, সেই বিষয়েও পরিবারগুলিকে অবহিত করেন মুখ্যমন্ত্রী। বিদেশ মন্ত্রকের অনুমতি পাওয়া গেলে রাজ্যের পক্ষ থেকে একজন মন্ত্রী, বিধায়ক, আইজি পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিক এবং একজন আইএএস আধিকারিককে নিয়ে প্রতিনিধিদল নেপালে পাঠানোর ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পোদ্দার পরিবারের ক্ষেত্রেও সেই প্রশাসনিক তৎপরতার মধ্যেই এল স্বস্তির খবর। অবশেষে অনুকূল পোদ্দার ও রেবা পোদ্দারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছে। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হন পরিবারের লোকজন।য়ফোনে অনুকূল পোদ্দার জানান, তাদের উপর দিয়ে বড় বিপদ কেটে গিয়েছে। তারা নিরাপদেই রয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে থাকা অন্যরাও ভালো আছেন। বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। রবিবার তাদের বাড়ি ফেরার কথা রয়েছে। ফোনে অনুকূলবাবু বলেন, “আমরা ভালো আছি। বিপদ কেটে গিয়েছে। বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করছি।”
তবে কীভাবে এমন ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে তারা বেঁচে গেলেন, সেই ঘটনাও রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। পরিবারের প্রতিবেশী দিলীপ কুমার দত্ত জানিয়েছেন, ইমিগ্রেশনের কাজে সামান্য দেরি হওয়াই কার্যত তাদের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। নির্ধারিত গাড়িতে তাদের যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশনের কাজে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট বেশি সময় লেগে যায়। ফলে তারা নির্দিষ্ট গাড়িটি ধরতে পারেননি। পরে অন্য একটি গাড়িতে তাদের গন্তব্যের দিকে যাওয়ার কথা হয়।
আর ঠিক সেই সময়েই সামনে আসে নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর। যে গাড়িটি তারা ধরতে পারেননি, সেটি সময়মতো বেরিয়ে গিয়েছিল। ফলে ওই গাড়িতে থাকা যাত্রীদের সঙ্গে কী ঘটেছে, সেই আশঙ্কাও তৈরি হয়। কিন্তু কয়েক মিনিটের সেই দেরিই পোদ্দার দম্পতিকে বিপদের মূল এলাকা থেকে দূরে রাখে। পরে তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং নিরাপদে থাকার চেষ্টা করেন। মাত্র ১০-১৫ মিনিটের ব্যবধান যে কখনও কখনও মানুষের জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারে, পোদ্দার দম্পতির ঘটনায় যেন তারই নজির মিলল। দিলীপ কুমার দত্ত জানান, পোদ্দার পরিবারের সঙ্গে তারাও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। অনুকূলবাবু ও তার স্ত্রী নিরাপদে রয়েছেন জানতে পেরে তারাও স্বস্তি পেয়েছেন। এখন তাদের দ্রুত বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বসিরহাটের পোদ্দার পরিবারের কাছে অনুকূলবাবুর ফোন যেন এক টুকরো স্বস্তির আলো। একদিকে যখন বাংলার বহু পরিবার এখনও প্রিয়জনের ফোনের অপেক্ষায় দিন গুনছে, তখন মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভয়াবহ বিপদ এড়িয়ে নিরাপদে থাকা পোদ্দার দম্পতির খবর কিছুটা হলেও আশার বার্তা দিচ্ছে। পরিবারের প্রত্যাশা, দ্রুত সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রবিবারই বাড়ি ফিরবেন অনুকূল পোদ্দার ও রেবা পোদ্দার। আর তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় এখন বসিরহাটের কাছারিপাড়ার গোটা পরিবার ও প্রতিবেশীরা।
Comments :0