Editorial

জনগণনার অনাবশ্যক ভার

সম্পাদকীয় বিভাগ

২০২১ সালে যে জনগণনা করার কথা ছিল কোভিড অতিমারীর দোহাই দিয়ে তা করা হয়নি। কোভিড পর্বে রাজ্যে নির্বাচন, প্রাক পর্বে ‘নমস্তে ট্রাম্প’ ধামাকায় কোনও অসুবিধা না হলেও জনগণনায় কোনও উৎসাহ ছিল না সরকারের। অন্য অনেক দেশের জনগণনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ যথারীতি হলেও ভারতের জনগণনা হয়নি।
যে কোনও দেশের, বি‍‌শেষ করে বিকাশশীল দেশের অর্থনীতি তথা সামগ্রিক বিকাশের জন্য স্বল্প মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি যথাযথ পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর জনগণনা শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্যও। জনগণনা মানে শুধু মাথা গুনে মোট জনসংখ্যা বার করা নয়। দেশের ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত ও গোষ্ঠীগত বৈচিত্রের ছবি যেমন ধরা পড়ে তেমনি আর্থ-সামাজিক অবস্থানও জানা যায় প্রতিটি নাগরিকের। দেশবাসী, শিক্ষা, সামজিক সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি অনেক কিছু জানা যায়। অর্থাৎ দেশের জনগণের কোন অং‍‌শের অবস্থা কেমন, কারা কোন ক্ষেত্রে এগিয়ে বা পিছিয়ে, কারা সুবিধাভোগী, কারা বঞ্চিত ইত্যাদি পরিসংখ্যানগত একটা ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ছবিটাই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। কোথায়, কোন খাতে অগ্রাধিকার দিতে হবে বা বেশি অর্থ বরাদ্দ করতে হবে জনগণনার তথ্য থেকেই তা ঠিক করা হয়।
যথা সময়ে যদি গণনা না হয় তাহলে এক দশকের মধ্যে পরিবর্তনের তথ্য অজানা থাকে। পুরানো তথ্যের ভিত্তিতে রূপায়িত প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা যায় না। নতুন প্রকল্প তৈরি হয় অনুমানের ভিত্তিতে। তাতে উদ্দেশ্য সফল অনিশ্চিত। ২০২১ সালে গণনা না হবার ফলে গত পাঁচ-ছ’বছর ধরে সরকার তাদের যাবতীয় নীতি নির্ধারণ ও প্রকল্প রূপায়ণ করেছে ২০১১ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে বা অনুমানের ভিত্তিতে। এটা চূড়ান্তভাবে অবৈজ্ঞানিক এবং বাস্তবতাবর্জিত। তেমনি সমাজ বিজ্ঞান, অর্থনীতি সহ বহু ক্ষেত্রে গবেষণার কাজও থমকে যায় সমসাময়িক তথ্য না থাকায়।
কোভিড অজুহাত সঙ্গত ধরে নিলেও তারপর আরও পাঁচ বছর কাজটা ফেলে রাখার কোনও গ্রহণযোগ্য কারণ নেই। তবে হিন্দুত্ববাদী শাসক রাজনীতির আশঙ্কা ছিল মুসলিম, তফসিলি জাতি, উপজাতি, ওবিসি-র প্রকৃত সংখ্যা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রকৃত চেহারা প্রকাশ হওয়া নিয়ে। মুসলিম জনসংখ্যার কল্পিত ভাষ্য নিয়ে তারা যে রাজনীতি করে সেটা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তেমনি দলিত, আদিবাসী, অন্যান্য পশ্চাৎপদ অংশের বঞ্চনা ও পিছিয়ে পড়া ধরা পড়ে যেতে পারে। এর সবটাই রাজনৈতিকভাবে সরকারের কাছে পীড়াদায়ক হতে পারে।
এই বিষয়গুলি এড়িয়ে নতুন বিতর্ক, বিভাজনের জমি তৈরি করতে সরকার তাই আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামছে। জনগণনার মৌলিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নমালার বাইরে অনেক অপ্রয়োজনীয়, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এটা সন্দেহজনক। এইসব তথ্যের নিরাপত্তা যেমন অনিশ্চিত তেমনি অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। ভোটার তালিকা তৈরি, নাগরিকত্বের প্রশ্নকে ঘিরে যে উৎকণ্ঠা তৈরি করা হয়েছে তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে জনগণনাতেও। এই তথ্য অন্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলা হবে না তো? আর যাই হোক এসব প্রশ্নে মোদী সরকারকে কেউ বিশ্বাস করেন না।

Comments :0

Login to leave a comment