বায়োমেট্রিকের যন্ত্রণায় নিয়মে কড়াকড়ি ও কাজ করেও মজুরি অনিশ্চিতের কারণে ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পে আগ্রহ নেই জবকার্ড হোল্ডারদের! মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন বাতিল করে নরেন্দ্র মোদী সরকারের গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক সংসদে পাশ করিয়েছে ‘ভিবি-জি রাম জি’ আইন। বিরোধীরা বারবারই বলেছিলেন যে নতুন আইনে কাজ কমবে। আগের আইনে গোটা দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রের সরকারের ওপর। নতুন আইনটি কেন্দ্র পাশ করালেও তার বাস্তবায়নের বড় অংশ রাজ্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। মজুরি এবং বায়োমেট্রিকের কড়াকড়িতে ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন জবকার্ড হোল্ডাররা! নাম মাত্র মজুরি আর বায়োমেট্রিকের যন্ত্রণায় কাজ করার লোক খুঁজে পাচ্ছে না গ্রাম পঞ্চায়েত গুলি! ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পে অর্থাৎ গ্রাম পঞ্চায়েতে ১০০ দিনের কাজে জব কার্ড থাকা সত্বেও প্রকল্পে কাজ করতে চাইছেন না গ্রামের গরীব মানুষ! এমনই তথ্য উঠে আসছে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্দর থেকে!
এর প্রধান কারণ যদি হয় নাম মাত্র মজুরি তবে দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই বায়োমেট্রিকের কড়াকড়ি! সারাদিনে একজন শ্রমিকের তিনবার বায়োমেট্রিক পরিচয় পত্র আপলোড করতে হচ্ছে। সকালে বায়োমেট্রিক স্ক্যান করিয়ে কাজে যোগ দিয়ে কিছুটা কাজ করার পর দুপুরে বায়োমেট্রিক স্ক্যানে যদি উপস্থিতি টেকনিকাল কারণে দেখানো না যায় তবে সেই শ্রমিক আর মজুরি পাবে না! ফলে শ্রমিকরা আর ভীড় জমাচ্ছে না গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে।
তুফানগঞ্জের ছোট শালবাড়ি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের কথাই ধরা যাক। এখানে মোট চারটি স্কীমের কাজ শুরু হয়েছিল। এরমধ্যে একটি গাছের চারা লাগানোর প্রকল্প, একটি কংক্রিট রাস্তা এবং দুটি কাঁচা ড্রেনের প্রকল্প। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি প্রকল্পেরও কাজ শেষ হয়নি। এরমধ্যে একটি প্রকল্প অবশ্য জল জমে থাকায় শুরুই করা যায় নি।
তুফানগঞ্জ শহর থেকে শালবাড়ি -১ গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস পৌঁছোতে যত গ্রাম পেরিয়ে যেতে হয় সেসব গ্রাম এমনিতেই এখন প্রায় পুরুষশূন্য। কাজের জন্য প্রতিবাড়ির কেউ না কেউ এখন ভিন রাজ্যে কাজ করেন। কাজের খোঁজে বাইরে পাড়ি দেওয়ার ঘটনা তো এখন আর নতুন কোন খবর নয়। কিন্তু নতুন সরকারের ১০০ দিনের কাজে গ্রামের অবশিষ্ট পুরুষ ও মহিলারাও ভীড় করছেন না!
এর কারণ খুঁজতে তুফানগঞ্জেরই আরেক গ্রাম পঞ্চায়েত মহিষকুচি-১ যেতেই স্পষ্ট হল। বায়োমেট্রিকের ঝক্কি সামলে কাজ করলেও মিলছে মাত্র ৩০০ টাকা। তাও আবার সব দিন কাজ মেলে না। অথচ গ্রামে জমিতে কাজ করলে পুরুষ শ্রমিকেরা পায় ৫০০ টাকা আর মহিলারা ৪০০ টাকা! শিবাণী রায় একদিন কাজে গিয়ে ফিরে এসেছেন। আর গ্রাম পঞ্চায়েত মুখো হন নি। তাঁর কথায়, ‘‘এত অল্প মজুরিতে কাজ করে কোন লাভ নেই। তাই আর যাই নি।’’
মহিষকুচি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের শালডাঙা নদীর পাড়বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে ভিবি-জি রাম জি প্রকল্পে। এলাকার বাসিন্দা সোনারাম মোদক গত সপ্তাহে তিনদিন কাজ করেছেন। সোমবারও কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাজে গিয়ে বায়োমেট্রিক পরিচয় পর্ব আপলোড করতে গিয়ে শুরু হল বিপত্তি। প্রত্যন্ত গ্রামে নেটওয়ার্কের সমস্যা। অনেক চেষ্টা করেও গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মীরা আপলোড করতে পারে নি সোনারাম মোদকের পরিচয় পর্ব। অতএব কাজ না পেয়ে নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে বেলা ১১ টায়। সোনারাম মোদক মঙ্গলবার আর কাজে যান নি। পাশের বাড়ির জমিতে আমন চাষের জমিতে কাজ করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে শুধু বায়োমেট্রিকের হার্ডল ডিঙিয়ে কাজ করলেই হবে না। কাজের গুনগত মান কম হলে মিলছে কম পারিশ্রমিক! ফলে ১০০ দিনের কাজে উৎসাহ হারিয়েছেন শ্রমিকেরা। কাজের গতি শ্লথ হয়েছে। এটাই কোচবিহার জেলার সব গ্রাম পঞ্চায়েতের ছবি। মহিলা শ্রমিক সুনীতি সাহা বলেন, ‘‘এমনিতেই মজুরি কম, সব সময় কাজ মেলে না, তার ওপর যদি হাজিরা কেটে নেওয়া হয় সেকাজ করে কি লাভ?’’
মাথাভাঙা-১ ব্লকের একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রকল্পের কাজের সুপারভাইজারদের বক্তব্য, কাজের শুরুতে উপস্থিতি নিয়ে বায়োমেট্রিক স্ক্যানিং, তারপর কাজের ছবি আপলোড করা, কাজ শুরুর চার ঘন্টা পর ফের ছবি আপলোড করতে হচ্ছে। প্রকল্পে স্পষ্ট বলা আছে কাজের জায়গা থেকেই সব আপলোড করতে হবে। নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে একটু এদিক ওদিক হলে পোর্টাল আপলোড হচ্ছে না। আবার কাজ শুরু হবার পর পোর্টাল কাজ না করলেও শ্রমিকেরা মজুরি পাবে না। আর এসব কারণেই গ্রাম পঞ্চায়েত স্কীম নিলেও কাজে গতি আসছে না। আসলে নাম বদলে নতুন সরকারের আনা ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প থেকে মুখ ফেরাচ্ছে গ্রামের জবকার্ড হোল্ডারেরা।
Job Card Holders
বায়োমেট্রিকের যন্ত্রণা, মজুরি অনিশ্চয়তার কারণে কাজ করতে পারছেন না জবকার্ড হোল্ডাররা
×
Comments :0