মানুষের প্রতিদিনের অত্যাবশ্যকীয় ভোজ্য পণ্যগুলির মধ্যে অন্যতম চিনি। ভারত এখন চিনি উৎপাদনে স্বনির্ভর। দেশের চাহিদা মিটিয়ে মাঝে মধ্যে খানিকটা রপ্তানিও করে। চলতি বছরেও পর্যাপ্ত চিনি উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছে সরকার। এখন দেশে বার্ষিক চিনির চাহিদা ২.৮০ কোটি টন। সরকারের অনুমান উৎপাদন হবে ৩.১১ কোটি টন। মহানন্দে সরকার প্রথমে ১৫ লক্ষ টন এবং পরে বাড়িয়ে ২০ লক্ষ টন রপ্তানির ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। ইরান যুদ্ধ এবং মার্কিন শুল্ক নীতির জেরে ভারতের বিদেশি মুদ্রা আয় অপেক্ষা ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার দ্রুত ছোট হতে থাকে। তাছাড়া বিদেশি লগ্নিকারীরাও ভারতে লগ্নিতে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। উলটে তারা বিনিয়োগ তুলে নিতে ব্যস্ত।
এই অবস্থায় চিনি উৎপাদন বেশি হচ্ছে শুনে মহানন্দে চটজলদি সিদ্ধান্ত হয় চিনি রপ্তানি করে বিদেশি মুদ্রা অর্জনের। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তির ফলে বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিক বেশি হওয়ায় তেল আমদানি খাতে বিদেশি মুদ্রার খরচ অনেকটাই গেছে। সঙ্গত কারণেই বাণিজ্য ক্ষেত্রে বেশ চাপে আছে সরকার। এই অবস্থা থেকে খানিকটা রেহাই পেতে সরকার অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই তড়িঘড়ি ইথানল ব্যবহারে অত্যুৎসাহী হয়ে পড়ে। বিশুদ্ধ পেট্রোলের বদলে তাতে ২০ শতাংশ ইথানল মিশিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করে। পেট্রল গাড়ির মালিকদের বাধ্যতামূলকভাবে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহারের সরকারি নির্দেশ দেয়। সরকারের মোটা যুক্তি এতে তেল আমদানি অনেকটা কমবে এবং বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
যেমন সরকার তেমন তার নীতি ও সিদ্ধান্ত। একদিকে চিনি রপ্তানি করে মহারাষ্ট্রের চিনি লবি মোটা মুনাফা কামিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি ভরতুকির সুযোগ নিয়ে ইথানল উৎপাদকরা বিরাট পরিমাণ চিনি নিজেদের কবজায় নিয়ে নিয়েছে। মাঝখান থেকে বাজারে চিনির ঘাটতি তীব্র আকার নিয়েছে। উৎপাদন বেশি হলেও দেশের চাহিদার জোগান নিশ্চিত না করে যথেচ্ছ রপ্তানি ও ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন মজুত ভাণ্ডারে চিনি নেই। এ মাসেই চিনির দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ২০ টাকা। অর্থাৎ দিনে একটাকা করে বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গুড়ের দামও।
এখন উপায়ন্তর না দেখে ১০লক্ষ টন চিনি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরজন্য আমদানি শুল্ক পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়েছে। একটা সরকার কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন, অবিবেচক হলে এমন উদ্ভট কাণ্ড ঘটাতে পারে মোদী সরকারকে না দেখলে বোঝা যাবে না। প্রসঙ্গত গত দশ বছরে ভারতকে চিনি আমদানি করতে হয়নি।
শুধু চিনি, গুড় নয়, বাড়ছে ভোজ্য তেল, ডাল, সবজি, মাছ-মাংস-ডিম, দুধ সহ যাবতীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের। এসব নিয়ে ভাববার সময় নেই। সরকার মেতে আছে ধর্মেকর্মে, দেশপ্রেমে, সাম্প্রদায়িকতায়, জাত-ধর্মের বিভাজনে। মানুষের নিত্য যন্ত্রণাকে আড়াল করতে অনাবশ্যক ও ফালতু ইস্যু তুলে লম্ফঝম্ফ করে যাচ্ছে।
Editorial
চিনি ভীষণ নোনতা
×
Comments :0