আবারও প্রমাণ হলো সর্বভারতীয় স্তরে বড় আকারের চাকরি বা ভর্তির পরীক্ষা গ্রহণে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ শুধু অযোগ্য নয়, অপদার্থও। এই কিছুদিন আগে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘিরে যন্তর মন্তরে টানা অনশন-বিক্ষোভ-অবস্থান এবং দেশজুড়ে তোলপাড় কাণ্ডের পর মোদী সরকারকে মাথা নত করে শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তার রেশ কাটতে না কাটতেই ইউজিসি-নেট পরীক্ষা গ্রহণের দু’মাস পর তিনটি বিষয়ে নতুন করে পরীক্ষা নেবার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কিনা জানা না গেলেও প্রশ্নপত্র যে ভুলে ভরা তা ধরা পড়েছে। পরীক্ষা গ্রহণের পরেই এসএফআই এই গুরুতর অভিযোগ তুললেও গুরুত্ব দেয়নি সরকার বা এনটিএ। সবটা ধামাচাপা দেবার জন্য ঘাপটি মেরে বসেছিল। দীর্ঘদিন কেটে গেলে পরীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। অবশেষে ৪৫ দিন পর তিনটি বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের কথা ঘোষণা করা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টে প্রশ্নপত্রে নানা ধরনের ভুল ও গরমিল ধরা পড়ে। ফলে তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়।
যন্তর মন্তরের ছাত্র বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল অযোগ্য শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ বা অপসারণ, এনটিএ তুলে দেওয়া, শিক্ষানীতি ২০০০ বাতিল ও দেশের শিক্ষা কাঠামো নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং শিক্ষার বেসরকারিকরণ বা বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা। ঠেলায় পড়ে মোদী-শাহ’রা শিক্ষা মন্ত্রীকে সরিয়েছেন। কিন্তু বাকি দাবি পূরণ হয়নি। তাই দেশজুড়ে ছাত্র-যুবদের সেই আন্দোলন জারি আছে।
অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও হিন্দুত্ববাদী সরকার চায় পূর্ণ কর্তৃত্ব ও আধিপত্য। কলেজ-বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি, পিএইচডি’র পরীক্ষা ইত্যাদি উচ্চ শিক্ষার যাবতীয় পরীক্ষা এক্রিয়ার রাজ্য ও বিশ্ব বিদ্যালয়গুলির হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রীভূত করতে চেয়েছিল মোদী সরকার। তার জন্য গড়ে তোলা হয় এনটিএ। সব পরীক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় এনটিএ’র হাতে। শিক্ষা যুগ্ম তালিকাভুক্ত হলেও রাজ্যগুলির অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ঠুঁটো জগন্নাথ করা হয় স্বয়ংশাসিত বিশ্ব বিদ্যালয়গুলিকেও। সমস্ত উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মাথায় বসানো হয় আরএসএস ঘনিষ্ট লোকজনদের। অর্থাৎ দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটাকেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে গেরুয়া পরিসরে বন্দি করার চেষ্টা হয়। পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক দায় যথাসম্ভব ঝেড়ে ফেলে বেসরকারি পুঁজির মুনাফার হাতে তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষা পরিণত হয় কর্পোরেট পণ্যে। যার যত অর্থ আছে সে তত নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়বে এবং বড় বড় ডিগ্রি পাবে। গরিব-মধ্যবিত্তের কাছে শিক্ষা ক্রমশ ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।
হিন্দুত্ববাদী অনুগত অযোগ্যদের প্রতিষ্ঠানের মাথায় বসিয়ে শিক্ষায় গেরুয়াকরণের ফলে শিক্ষার সর্বস্তরে অধঃপতন শুরু হয়েছে। গুণগত মান তলানিতে চলে গেছে। দেশের বিরাট সংখ্যক ছেলে-মেয়ের শিক্ষায় উৎসাহ কমছে, হতাশা বাড়ছে। ৯০ শতাংশ ছেলে-মেয়েই ধাপে ধাপে শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এনটিএ-ও অনুগত অযোগ্যের শিকার। মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড় ও দিল্লিতে অযোগ্যতা ও অপদার্থতা প্রমাণ করে কেবলমাত্র বিশ্বস্ততার আনুগত্যে এনটিএ’র মাথায় স্থায়ী আসন পেয়েছেন পিকে যোশী। এত কাণ্ডের পরও তার আসন এখনো অটুট আছে। প্রসঙ্গগত দশ বছরে ৮০টিরও বেশি প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় এনটিএ তার অযোগ্যতা প্রমাণ করলেও তাকে বহাল তবিয়তে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
editorial
অপদার্থ এনটিএ
×
Comments :0