কৌশিক দাম: ধূপগুড়ি
উত্তরবঙ্গে প্রথম দফার ভোট মিটতেই ফের প্রকট হয়ে উঠল রাজ্যের কর্মসংস্থানের কঙ্কালসার চেহারা। একদিকে পেটের টানে ভিনরাজ্যে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া, অন্যদিকে দ্বিতীয় দফার ভোটে শামিল হতে দক্ষিণবঙ্গের শ্রমিকদের ঘরে ফেরা— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। ট্রেনের কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই, আর এই চরম অব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বাস মালিকরা মেতেছেন ভাড়ার নজিরবিহীন কালোবাজারিতে।
ভোট মিটতেই উত্তরবঙ্গের স্টেশনগুলোতে ফিরতি শ্রমিকের ঢল নেমেছে। ধূপগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে দক্ষিণবঙ্গ বা ভিনরাজ্যগামী ট্রেনগুলোতে সাধারণ কামরার অবস্থা ভয়াবহ। টিকিট তো দূরস্থান, ট্রেনের মেঝেতে বসার জায়গাটুকুও অমিল। শৌচাগারের সামনে থেকে শুরু করে দুই কামরার সংযোগস্থলে জীবন হাতে নিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা।
রেলের এই সংকটের সুযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বেসরকারি বাস সিন্ডিকেট। অভিযোগ, উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতা যাওয়ার যে বাস ভাড়া সাধারণত ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকা থাকে, অনলাইন বুকিং পোর্টালে তা এখন আকাশছোঁয়া— ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। সশরীরে কাউন্টারে গেলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে 'টিকিট নেই', অথচ চড়া দামে পর্দার আড়ালে মিলছে আসন। বিধানসভা ভোটের সময় প্রশাসনের নাকের ডগায় এই প্রকাশ্য লুঠতরাজ চললেও রাজ্য পরিবহন দপ্তর ও নির্বাচন কমিশন কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে।
ধূপগুড়ি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আলতাফ আনসারী আক্ষেপের সুরে বলেন, “ইচ্ছে করে কি আর ঘরবাড়ি ছেড়ে অত দূরে পড়ে থাকি? বাড়ির কাছে কাজ নেই, মজুরিও অত্যন্ত কম। ছেলেমেয়েদের মুখে অন্ন তুলে দিতে ভিনরাজ্যই আমাদের শেষ ভরসা।”
শুধু আলতাফ নন, মতিশ রায়, নূর আলম বা দীপঙ্কর মন্ডলের মতো শত শত যুবক আজ দিশেহারা। একশো দিনের কাজ বন্ধ, এলাকায় কোনো শিল্প নেই— ফলে উত্তরবঙ্গের হিমঘর বা কেরালা ও হায়দ্রাবাদের নির্মাণ সাইটই তাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।
পরিযায়ী শ্রমিকদের এই অন্তহীন ঢল ফের একবার তৃণমূল সরকারের গত এক দশকের ‘উন্নয়ন’-এর ভাঁওতাবাজিকে সামনে এনে দিয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলার ডিওয়াইএফআই নেতা নির্মাল্য ভট্টাচার্য কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “গত এক দশকে রাজ্যে নতুন কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি। ১০০ দিনের কাজ থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরে আয়ের সব পথ বন্ধ। শাসক দল উন্নয়নের গালভরা প্রচার করলেও ধূপগুড়ির তালাবন্ধ ঘরগুলোই আসল সত্যিটা বলে দিচ্ছে। বাংলার যুবসমাজকে পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত করেছে এই সরকার।”
রাজ্যে গত কয়েক বছরে জেঁকে বসা এই ‘পরিযায়ী মডেল’ কবে বন্ধ হবে? কবে বাংলার যুবসমাজ নিজের এলাকায় কাজ পাবে? দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে উত্তরবঙ্গের জনপদে এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Comments :0