sfi tripura

যা বলেছিল, তার উলটো করছে বিজেপি, বলছেন ত্রিপুরার এসএফআই সম্পাদক

জাতীয় রাজ্য স্পটলাইট

ছবি : প্রীতম ঘোষ।

পূজা বোস

ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে বলেছিল ছাত্রদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। এখন তার ঠিক উলটো কাজ হচ্ছে। 'বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্প'-র মাধ্যমে বিজেপি সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে তুলে দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত বেতন দিয়ে পড়তে হচ্ছে।
ত্রিপুরায় বিজেপি শাসনে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এমনই একাধিক নমুনা তুলে ধরলেন রাজ্যের এসএফআই সম্পাদক সৃজন দেব। 
ত্রিপুরায় আট বছর আগে সরকার গড়েছে বিজেপি। সরকারে আসীন হওয়ার পর থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে তারা, তার বিরুদ্ধে হয়েছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধও। কেমনভাবে বিজেপি আক্রমণ প্রতিরোধ করেছে এসএফআই ত্রিপুরা? সেই অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন এসএফআই ত্রিপুরার রাজ্য সম্পাদক। 
কলকাতায় এসএফআই রাজ্য দপ্তর দীনেশ মজুমদার ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে যোগ দেন সৃজন দেব।
এক প্রশ্নে তিনি বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে। একে সরলীকরণ করে বলা যায়, ফুটন্ত জল থেকে জ্বলন্ত উনুনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ঝাঁপ দিয়েছেন। যেটা ত্রিপুরার মানুষ বিগত আট বছর ধরে সহ্য করছে। 
সৃজন জানাচ্ছেন, ২০১৮ সালে ত্রিপুরায় বিজেপি শাসকের দায়িত্ব পায়। শাসনে আসার আগে তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা পূরণ করেনি। তারা বলেছিলো বছরে ৫০ হাজার বেকারের চাকরি হবে। কিন্তু বর্তমানে ত্রিপুরায় দেখা যাচ্ছে ৫০ হাজার সরকারি শূন্য পদ রয়েছে। যুবকদের প্রত্যেকদিন চাকরির জন্য কোনও না কোনও দপ্তরে গিয়ে ধর্না দিতে হচ্ছে। চাকরির জন্য যুবক যুবতীরা অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। 
সৃজনের অভিজ্ঞতা, ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে বলেছিল ছাত্রদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। বর্তমানে তার বদলে 'বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্প' - এর মাধ্যমে বিজেপি সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে তুলে দেওয়ার এক নতুন প্রচেষ্টায় নেমেছে। বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বদলে বেসরকারি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বেতন দিয়ে এখন শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে। শিক্ষাকে বেসরকারিকরণের মধ্যে দিয়ে সাধারণ গরিব খেটে খাওয়া মানুষের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার সুযোগকে কেড়ে নিচ্ছে। 
বিজেপি ত্রিপুরার পাহাড়ি অর্থাৎ এডিসি এলাকায় মেডিক্যাল কলেজ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সরকারে আসীন হয়ে তা করেনি। ত্রিপুরায় বামপন্থী সরকারের আমলে যে মেডিক্যাল কলেজ ছিল সেখানে আগে মাত্র ৭ লক্ষ টাকা খরচ করেই ডাক্তারি পড়া সম্ভব ছিল কিন্তু এখন সেটা ৭০ লক্ষ্য টাকা দাঁড়িয়েছে। ত্রিপুরা একটি প্রান্তিক ছোট রাজ্য, ক্ষুদ্র শ্রমিক মানুষজন বেশি, সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর শ্রমিক, কৃষক, গরিব মানুষদের থেকে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। 
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির দুদিনের মিটিংয়ে এরাজ্যের নেতৃবৃন্দরা বলছিলেন যে ২০১৫ সালের পর থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। সেই সঙ্গে ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নাকি পশ্চিমবঙ্গে প্রচার করছে তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করবে। কিন্তু ত্রিপুরা রাজ্যে ২০১৮ সালের পর থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ। ত্রিপুরায় শেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৭ সালে। 
ত্রিপুরায় এসএফআই দাবি করেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তারা সেই ব্যবস্থা করতে পারছে না। এই অবস্থায় আমরা ছাত্রদের নিয়ে ত্রিপুরায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছি। প্রত্যেকদিন শুধুমাত্র পেশীবলের প্রতিরোধ নয়, মানসিক প্রতিরোধ আমাদের করতে হচ্ছে। বিজেপি-আরএসএস যেভাবে ছাত্রদের মধ্যে হিন্দুত্বের রাজনীতি ঢোকানোর চেষ্টা করছে। ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ত্রিপুরা রাজ্যে শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিম নয়, পাহাড়ি বাঙালি থেকে শুরু করে বিজেপির যে নকশা তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সেই বাইনারি বিরুদ্ধে ত্রিপুরার এসএফআই লড়ছে। 
তিনি বলছেন, বিজেপি আরএসএসের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই আমাদের। বহু বছর ধরে এই লড়াই আমরা লড়ছি এবং এই লড়াই জারি থাকবে। পশ্চিমবঙ্গে ত্রিপুরার মতো একই কায়দায় বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি এবং ত্রিপুরার বিজেপি কখনওই আলাদা হতে পারে না। একই রকম কালচার এবং রীতি নীতি তাদের মধ্যে পরিস্ফুট হবে। তা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ধীরে ধীরে স্পষ্ট ভাবেই বুঝতে পারবেন। তার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ছাত্রদের সংগঠিত করলে চলবে না। সাধারণ মানুষকেও সংঘটিত করতে হবে। সব ধরনের মানুষকে একত্রিত করে আমরা ত্রিপুরায় যেভাবে লড়াই সংগ্রাম করছি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষকেও একইভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হবে। 
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাকে বাঁচাতে স্কুল বাঁচাও, মুল বাঁচাও আন্দোলন এসএফআই পশ্চিমবঙ্গে করেছে। ত্রিপুরায় সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচানোর জন্য কী ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলছে এসএফআই? 
ত্রিপুরা একটি ছোট রাজ্য। ছোট রাজ্যের মধ্যে ও ত্রিপুরায় প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে ২৫৯৪ টা স্কুল  রয়েছে। এরমধ্যে ৩৫০টি এমন স্কুল রয়েছে যেখানে একজন মাত্র শিক্ষক রয়েছেন। এই সংখ্যা শুনে পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই ছোট সংখ্যা মনে করতে পারে। তবে ত্রিপুরার জন্য এই সংখ্যা বিরাট। ৩৫০ টি স্কুল যেখানে একজন মাত্র শিক্ষক দিয়ে গোটা স্কুলকে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এমন অবস্থা হলে স্কুলে ছাত্ররা যাবে কেন? বেসরকারি স্কুলের দিকেই তো ঝুঁকবে তারা। এসএফআই ছাত্রদের সংগঠিত করছে অভিভাবকদের সংগঠিত করছে, আমাদের রাজ্যের মধ্যে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচাতে হবে। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচাতে গেলে স্কুল থেকেই শুরু করতে হবে। এসএফআই স্কুল স্তরে ইউনিট কমিটি গুলোকে নতুন ভাবে তৈরি করছে, বিজেপি যেভাবে আক্রমণ নামিয়ে আনছে তার বিপরীতে গিয়ে ছাত্রদের সংগঠিত করে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছি।
সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে না বাঁচানো গেলে আমাদের রাজ্যের পরবর্তী প্রজন্মকে আর রক্ষা যাবে না। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য এসএফআই মাঠে রয়েছে। এ কারণে আমাদের বহু সময় মার খেতে হয়, গুলি খেতে হয়। বিজেপি যে সন্ত্রাস কায়েম করেছে সেই একই সন্ত্রাস পশ্চিমবঙ্গেও আগামী কিছুদিনের মধ্যেই তারা শুরু করবে। এই সন্ত্রাস থেকে কেউ রক্ষা পাবে না তাই পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে আমার আহ্বান ঝান্ডা, দল, মত নির্বিশেষে সকলকে একত্রিত হতে হবে।

Comments :0

Login to leave a comment