Editorial

পতনের অমোঘ স্রোত

সম্পাদকীয় বিভাগ

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্র কি ক্রমশ ফিকে ও অস্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে? সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার এবং সর্বজনীন মানবাধিকারও কি ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে বৈষম্যের পাল্লা ভারী করছে। আর এসবের পেছনে শাসক দলের ভূমিকা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার অস্বীকার করার উপায় আছে কি? প্রশ্নগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে অবশ্যই কঠিন নয়। পারিপার্শ্বিক সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে নজর না রেখে যদি গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যদি এমনটা ভাবা হয় যে যা হচ্ছে হোক তাহলে ভবিষ্যতে ভারতের পক্ষে আজকে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। ভারতের চিরাচরিত ভাবধারা ও ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে পারে। ধর্মের ভিত্তি‍‌তে এমন আড়াআড়ি বিভাজন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সংখ্যাগুরুদের একাংশের ঘৃণা ও বিদ্বেষ সমাজে শুধু অশান্তি, অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে না দেশের আর্থ-সামাজিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের রাস্তাও অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে বহু প্রতিশ্রুত কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করা যায়নি। মুদ্রাস্ফীতিকে হিসাবে ধরলে কৃষকদের প্রকৃত আয় বাড়েনি বরং কমেছে। তেমনি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হবার সময়সীমা অনেক আগে পেরিয়ে গেছে। এখনও স্পষ্ট নয় ঠিক কত বছর পর ভারত সেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারবে। বেশ কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম হবার গর্বিত আস্ফালন শোনা যাচ্ছিল। ইদানীং সেটা আড়ালে চলে গেছে। কারণ প্রচারের হুল্লোড়ের মধ্যেই ভারত চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি থেকে দু’ধাপ নেমে ৬ষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে গেছে। এখন দেশজুড়ে চলছে বিকশিত ভারত তথা উন্নত ভারতের উন্মাদনা। কথায় কথায় উচ্চারিত হয় ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার কথা। বিকশিত ভারত মানে ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারত অর্থনীতি, মাথাপিছু আয়, জীবনযাত্রার মানে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলি সমকক্ষ। উচ্চাশা ভালো তবে সেটা যদি সামগ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তাহলে হতাশায় ডোবার আশঙ্কা থাকে।
গত এক-দেড় দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো এই সময়ে গড় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার আগের দেড় দশকের থেকে বা‍ড়েনি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির গতি উন্নত হবার পক্ষে নিতান্তই কম। স্বাধীন ভারতের যেকোনও সময়ের তুলনায় বর্তমানে দেশে আয় ও সম্পদ বৈষম্য অত্যধিক বেশি এবং এই বৈষম্য দ্রুত হারে বাড়ছে। এই বৈষম্য উন্নত ভারতের অন্যতম প্রতিবন্ধক। বেকারি এবং জিনিসের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ফলে পারিবারিক আয় কমছে, ক্রয় ক্ষমতা কমছে, সঞ্চয় কমছে এবং ঋণের বোঝা বাড়ছে। এগুলি কোনোটাই উন্নত ভারতের লক্ষণ নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি এবং শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় বরাদ্দ উদ্বেগজনকভাবে কম। ফলে বিকশিত অর্থনীতির জন্য যে পর্যাপ্ত শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী দরকার তা হচ্ছে না। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থা ও বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ক্রমবর্ধমান হারে পড়ুয়ার সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং হাজার হাজার স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এগুলিও উন্নত ভারতের অনুসারী নয়। দেশ যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে তাতে দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা বৃদ্ধি অনিবার্য। শত কোটিপতি সংখ্যা বাড়বে এবং তাদের সম্পদ বাড়বে উল্কা গতিতে। আমজনতা শ্রম দি‍‌য়ে যাবে কিন্তু ন্যায্য মজুরি কোনোদিন মিলবে না। একের পর এক তারা অধিকারহীন হবেন। স্বাধীন নাগরিক থেকে তারা অনুন্নত প্রজায় পরিণত হবেন।
 

Comments :0

Login to leave a comment