মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি দিয়েছিল মৎস্য অধিদপ্তর। গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাড়ে তিন লক্ষ কেজির বেশি ইলিশ আমদানি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রকে।
মন্ত্রকের সূত্র বলছে, আমদানির বিষয়টি জানার পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মহম্মদ আমিন উর রশিদ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা নিয়ে তিনি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এরপর ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মহম্মদ খালেদ কনক মন্ত্রকের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠির ভিত্তিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রক ইলিশ আমদানি বন্ধের সুপারিশ জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণাককে চিঠি দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ইলিশ সমুদ্রের মাছ এবং প্রজননের জন্য নদীতে আসে। অন্যদিকে ভারতের মৎস্যজীবীরা সমুদ্র থেকেই বেশি ইলিশ ধরে ফেলছেন। এসব কারণেও দেশের ইলিশের মজুত কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এবার বাজারে ইলিশ কম দেখা যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের চাপে সীমিত পরিসরে কিছু আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। তবে নতুন করে কোনও ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ২২টি প্রতিষ্ঠান তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। এসব ইলিশের আমদানিমূল্য প্রায় ছয় কোটি ৯২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এসব ইলিশের পুরোটাই ভারতের গুজরাটের ভারুচ এলাকা থেকে আসছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই প্রথম বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। অথচ এ বিষয়টি ঘটাচ্ছেন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। তারা দেশের মানুষের ইলিশ খাওয়ার সমস্যা মেটানোর চেয়ে নিজেদের ব্যবসা ও মুনাফার দিকটিই বেশি বিবেচনায় রেখেছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তারা একসময় দেশের ইলিশ বিদেশে রপ্তানির জন্য তোড়জোড় করেন, অন্য সময় আহরণের ঘাটতির কথা বলে আমদানি করার জন্য মরিয়া হয়ে যান। এটা শুভ লক্ষণ নয়। ইলিশের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাছের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানি উভয়ের ক্ষেত্রেই জাতীয় নীতি মেনে চলতে হবে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মহম্মদ আমিন উর রশিদ এই প্রতিনিধিকে বলেন যে, মাছ আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর অনুমতি দিয়ে থাকে। ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আমারও জানা ছিল না। জানার পর আমি মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছি, কীভাবে এ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের চাপে সামান্য পরিমাণ ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর আমি নির্দেশ দিয়েছি, আর কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে আর একটি ইলিশও আসবে না।
বাজার ঘুরে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতীয় ইলিশের প্রতি অনাগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে তারা স্বাদ ও ঘ্রাণের পার্থক্যের কথা বলছেন। কয়েকজন ক্রেতার দাবি, ভারতীয় ইলিশ রান্না করার পর বাংলাদেশের ইলিশের মতো স্বাদ, ঘ্রাণ ও তেলতেলে ভাব পাওয়া যায়নি।
এক ক্রেতার ভাষায়, “ইলিশ দেখতে ইলিশের মতো হলেই তো হবে না, আসল বিষয় স্বাদ। বাংলাদেশের ইলিশের যে স্বাদ ও ঘ্রাণ, আমদানি করা এই মাছের মধ্যে সেটা পাচ্ছি না।”
আরেক ক্রেতা বলেন, “একবার খেয়ে দেখেছি। আমার কাছে দেশি ইলিশের সঙ্গে তুলনা চলে না। সুযোগ থাকলে বাংলাদেশের ইলিশই কিনব।”
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে ভারতীয় ইলিশ আসার পর অনেকে কৌতূহলবশত মাছটি দেখতে ও দাম জানতে আসছেন। কিন্তু কেনার সময় অনেকেই দেশি ইলিশের দিকে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে আমদানি করা মাছের বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না।
রাজবাড়ীর মাছ বাজারের এক বিক্রেতা শুক্রবার সন্ধ্যায় এই প্রতিনিধিকে বলেন, “ক্রেতারা মাছ দেখছেন, দামও জিজ্ঞেস করছেন। কিন্তু স্বাদের কথা উঠলেই অনেকেই দেশি ইলিশ চান। যারা আগে ভারতীয় ইলিশ খেয়েছেন, তাদের অনেকে এবারও কিনতে চাইছেন না।”
বাংলাদেশের ইলিশের ক্ষেত্রে পদ্মা, মেঘনা ও অন্যান্য নদী-মোহনা অঞ্চলের মাছের প্রতি দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। ইলিশ বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাজারে ভারতীয় ইলিশের উপস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে কৌতূহল থাকলেও খাবারের টেবিলে পছন্দের প্রশ্নে বাংলাদেশের ইলিশই প্রাধান্য পাচ্ছে এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট বাজারের কয়েকজন বিক্রেতা।
Comments :0