মুক্তধারা
প্রবন্ধ
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : যে কলম মানুষের হৃদয়ের ভাষা লিখেছিল
অরিজিৎ মিত্র
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
বাংলা সাহিত্যের বিশাল অরণ্যে কত লেখক এসেছেন, কত শব্দের ফুল ফুটেছে, কত কাব্যের পাখি গান গেয়ে উড়ে গেছে। কিন্তু সেই অরণ্যের এক কোণে আজও যেন একটি কুয়াশামাখা পথ, একটি নিঃসঙ্গ নদী, একটি মাটির বাড়ির বারান্দা এবং সেখানে বসে থাকা কিছু চেনা অথচ বিস্মৃত মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে প্রশ্ন, ঠোঁটে অভিমান, হৃদয়ে ভালোবাসা—আর তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে আছেন একজন মানুষ—
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
তিনি শুধু উপন্যাস লেখেননি; তিনি মানুষের হৃদয়ের গোপন দরজাগুলি খুলে দিয়েছিলেন। যে কান্না সমাজের ভিড়ে শব্দ পায় না, যে ভালোবাসা মুখে উচ্চারিত হয় না, যে অপমান চোখের জলের ভিতর নীরবে জমে থাকে—শরৎচন্দ্র তাঁর কলমে সেই সমস্ত অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য যেন আয়না নয়, আয়নারও অন্তরাল—যেখানে মানুষ নিজের মুখের চেয়ে নিজের মনটাকেই বেশি স্পষ্ট দেখতে পায়।
শরৎচন্দ্রকে পড়ার সবচেয়ে আশ্চর্য অভিজ্ঞতা এই যে, তাঁর চরিত্রেরা বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না। দেবদাস বন্ধ করার পরও দেবদাসের দ্বিধা আমাদের মনে থেকে যায়; পরিণীতা পড়ার পর ললিতার নীরবতা যেন কানে বাজে; শ্রীকান্ত শেষ করার পর মনে হয় আমরাও বুঝি সেই অনন্ত পথের এক অচেনা পথিক; আর চরিত্রহীন পড়লে সমাজের বিচার করার অভ্যাসটাকেই নতুন করে প্রশ্ন করতে হয়।
মানুষের মন—শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় উপন্যাস
শ্রীকান্ত-এ শরৎচন্দ্র লিখেছেন—
«“এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্তটাই পরিপূর্ণ সত্য। মিথ্যার অস্তিত্ব যদি কোথাও থাকে, তবে সে মানুষের মন ছাড়া আর কোথাও নয়।”»
এই একটি পঙ্ক্তিই যেন শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে বোঝার একটি চাবিকাঠি।
প্রকৃতি নিজের নিয়মে চলে—নদী নদীর মতো, আকাশ আকাশের মতো, বৃক্ষ তার শিকড়ে স্থির। কিন্তু মানুষ? মানুষ নিজের কাছেই কখনও সত্য, কখনও মিথ্যা। সে ভালোবেসেও ভালোবাসাকে অস্বীকার করে, কাঁদতে কাঁদতেও হাসে, অপরাধ করেও নিজের কাছে নির্দোষ থাকতে চায়। মানুষের মন তাই শরৎচন্দ্রের কাছে ছিল এক অনন্ত নদী—যার উপরিভাগে শান্ত জল, অথচ তলদেশে কত অদৃশ্য স্রোত।
এই মনকেই তিনি বারবার অনুসরণ করেছেন।
তাঁর চরিত্রেরা তাই সাদা-কালো নয়; তারা সন্ধ্যার আকাশের মতো—যেখানে আলো আর অন্ধকার পাশাপাশি থাকে।
চরিত্রহীন : নামের মধ্যেই যে প্রশ্ন
শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন আমার কাছে শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি যেন সমাজের হাতে ধরা একটি আয়না। যে সমাজ মানুষকে তার কাজ দিয়ে নয়, তার পরিচয় দিয়ে বিচার করতে অভ্যস্ত, সেই সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন শরৎচন্দ্র।
উপন্যাসে সাবিত্রীকে ঘিরে যে সামাজিক বিচার, তার ভিতর দিয়ে তিনি আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে এনে দাঁড় করান। সমাজ যখন কাউকে সম্মানের আসন থেকে সরিয়ে দেয়, তখন তার ব্যক্তিগত জীবনও কীভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়—শরৎচন্দ্র সেই ক্ষতকে দূর থেকে দেখেননি; কলম দিয়ে যেন তার উপর হাত রেখেছেন।
সেই প্রসঙ্গেই তাঁর অমোঘ উচ্চারণ—
«“শ্রদ্ধা ছাড়া ভালোবাসা দাঁড়াতে পারে না।”»
কী আশ্চর্য সরল বাক্য! অথচ তার গভীরতা যেন সমুদ্রের মতো।
ভালোবাসা যদি কেবল অধিকার হয়, তবে সেখানে ভালোবাসার চেয়ে মালিকানাই বড় হয়ে ওঠে। ভালোবাসার ভিত যদি শ্রদ্ধাহীন হয়, তবে সম্পর্কের প্রাসাদ বাইরে থেকে যতই সুন্দর হোক, ভিতরে তার ভিত্তি বালির মতো। শরৎচন্দ্র তাই প্রেমকে শুধু আবেগের বিষয় করেননি; তিনি তাকে মানুষের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
আর চরিত্রহীন-এর আরেকটি পঙ্ক্তি মানুষের মন সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ উপলব্ধিকে যেন বজ্রপাতের মতো আলোকিত করে—
«“হায় রে মানুষের মন! এ যে কিসে ভাঙ্গে, কিসে গড়ে, তাহার কোন তত্ত্বই খুঁজিয়া পাওয়া যায় না!”»
সত্যিই তো—কোনো কোনো কথা পাহাড়ের মতো ভারী হয়েও মানুষকে ভাঙতে পারে না, আবার কোনো কোনো সামান্য শব্দ শিশিরবিন্দুর মতো নরম হয়েও হৃদয়ের উপর পড়ে গভীর ক্ষত রেখে যায়।
এই রহস্যময় মানুষই শরৎচন্দ্রের প্রকৃত বিষয়।
দেবদাস : প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে ওঠা অসম্পূর্ণতা
দেবদাস-এর কথা উঠলেই আমাদের মনে আসে দেবদাস ও পার্বতীর অসম্পূর্ণ প্রেম। কিন্তু এই উপন্যাসকে শুধু প্রেমের ট্র্যাজেডি বললে শরৎচন্দ্রের শিল্পকে ছোট করা হয়।
দেবদাসের মধ্যে প্রেম ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল দ্বিধা; অনুভূতি ছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা ছিল না। অন্যদিকে পার্বতীর ভালোবাসায় ছিল সাহস। সেই পার্থক্যই কাহিনিকে ধীরে ধীরে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
একটি দৃশ্যে পার্বতীর মুখে যে কথা শরৎচন্দ্র বসিয়েছেন, তা চরিত্রটির ভালোবাসার গভীরতাকে অসাধারণভাবে প্রকাশ করে—
«“মাথা কাটাই যেতো—যদি না আমি নিশ্চয় জানতুম, আমার সমস্ত লজ্জা তুমি ঢেকে দেবে।”»
এখানে প্রেম শুধু আকর্ষণ নয়—এখানে আছে বিশ্বাস। একজন মানুষের কাছে নিজের সমস্ত দুর্বলতা সমর্পণ করার বিশ্বাস।
এই কারণেই দেবদাস কেবল একটি প্রেমকাহিনি নয়; এটি মানুষের অসময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের মূল্য এবং হৃদয়ের সঙ্গে নিজের ভয়ের সংঘর্ষের এক করুণ দলিল।
দেবদাসের ট্র্যাজেডি আমাদের কাঁদায়, কিন্তু তার থেকেও বেশি ভাবায়—জীবনের কিছু দরজা একবার বন্ধ হয়ে গেলে অনুতাপের হাতুড়ি দিয়ে সারাজীবন কড়া নাড়লেও সেগুলি আর খোলে না।
শ্রীকান্ত : জীবনের পথে মানুষের সন্ধান
যদি দেবদাস হয় এক হৃদয়ের পতনের কাহিনি, তবে শ্রীকান্ত যেন এক হৃদয়ের যাত্রা।
শ্রীকান্তের পথ কোনো সরল রাস্তা নয়। সেখানে নদী আছে, নৌকা আছে, গ্রাম আছে, মানুষ আছে, সম্পর্ক আছে, বিচ্ছেদ আছে—আর আছে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।
রাজলক্ষ্মী, অভয়া, কমললতা—এই চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র নারীকে কেবল ‘কারও স্ত্রী’ বা ‘কারও প্রেমিকা’ হিসেবে দেখেননি; তিনি তাঁদের দিয়েছেন স্বতন্ত্র অনুভব, ইচ্ছা, আত্মমর্যাদা ও প্রশ্ন করার অধিকার।
রাজলক্ষ্মীকে তাই শুধু প্রেমের চরিত্র হিসেবে দেখলে তাকে বোঝা হয় না। তার মধ্যে যে আত্মসম্মান, অধিকারবোধ এবং গভীর স্নেহ পাশাপাশি প্রবাহিত—তা শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্র নির্মাণের অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
শ্রীকান্ত যেন সেই পথিক, যে একেকটি মানুষকে দেখে একেকটি নতুন জীবন পড়ে। তার যাত্রা তাই ভৌগোলিকের চেয়ে বেশি মানসিক।
আর তখনই আসে পথের দাবী
শরৎচন্দ্রকে কেবল প্রেম ও বিরহের লেখক ভাবা তাঁর সাহিত্যকে অর্ধেক পড়া।
পথের দাবী-তে তাঁর কলমে প্রেমের কোমলতা বদলে যায় প্রতিবাদের আগুনে। সব্যসাচী শুধু একটি চরিত্র নন; তিনি প্রশ্ন করার সাহসের প্রতীক।
সেখানে ভারতীর মুখে আসে—
“তোমার কাজ মানুষকে মানুষের মত করে বাঁচানো।”
এই বাক্যটির ভিতরেও শরৎচন্দ্রের মূল সুরটি ফিরে আসে—মানুষ।
স্বাধীনতা তাঁর কাছে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; মানুষের মানুষের মতো বাঁচার অধিকারও স্বাধীনতার অংশ। সেই কারণেই পথের দাবী পড়লে বোঝা যায়, শরৎচন্দ্রের কলম কখনও শুধু প্রেমের প্রদীপ জ্বালায়নি; প্রয়োজনে সেই কলমই অন্যায়ের অন্ধকারে মশালের মতো জ্বলে উঠেছে।
শরৎচন্দ্রের নারী : করুণার পাত্র নয়, জীবনের কেন্দ্র
শরৎচন্দ্রের সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁর নারীচরিত্রের কথা আলাদা করে বলতেই হয়।
ললিতা, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, সাবিত্রী, কিরণময়ী, অচলা, রাজলক্ষ্মী, অভয়া, বিজয়া—তাঁদের প্রত্যেকের জীবন যেন আলাদা আলাদা নদী। কেউ শান্ত, কেউ প্রবল; কেউ সমাজের বাঁধ মেনে চলে, কেউ বাঁধ ভেঙে নিজের পথ তৈরি করে।
তাঁদের চোখে জল আছে, কিন্তু শুধু জল নেই। আছে প্রশ্ন।
তাঁদের ভালোবাসা আছে, কিন্তু শুধু ভালোবাসা নেই। আছে আত্মমর্যাদা।
তাঁদের ত্যাগ আছে, কিন্তু সেই ত্যাগের ভিতরেও আছে নিজস্ব সত্তার দাবি।
এইখানেই শরৎচন্দ্র তাঁর সময়ের অনেক সীমাকে অতিক্রম করেছিলেন।
সহজ ভাষার ভিতরে অসীম গভীরতা
শরৎচন্দ্রের ভাষা যেন গ্রামের পুকুরের জল—দেখতে শান্ত, স্বচ্ছ, সহজ; কিন্তু তার গভীরতা মাপতে গেলে হাতের মাপ শেষ হয়ে যায়।
তিনি অলংকারের ভারে বাক্যকে ক্লান্ত করেননি। অথচ তাঁর সহজ বাক্য কখনও কখনও এমনভাবে হৃদয়ে প্রবেশ করে, যেন নিঃশব্দে বন্ধ ঘরে এসে পড়া এক ফালি চাঁদের আলো।
তাঁর সাহিত্যিক শক্তি তাই শব্দের দুর্লভতায় নয়—অনুভূতির সত্যতায়।
তিনি জানতেন, মানুষের দুঃখকে সুন্দর করে তুলতে হয় না; তাকে সত্য করে তুললেই তার সৌন্দর্য জন্ম নেয়।
শেষ কথা : শরৎচন্দ্র আসলে কে?
তাঁকে কি শুধু ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ বলব?
নাকি প্রেমের ঔপন্যাসিক?
নাকি সমাজসংস্কারক?
নাকি নারীমনের অসাধারণ পাঠক?
সম্ভবত কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়।
শরৎচন্দ্র ছিলেন এমন একজন কথাশিল্পী, যাঁর কলম সমাজের দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—মানুষকে দূর থেকে দেখলে বিচার করা যায়, কাছে গেলে বোঝা যায়।
তাই আজও তাঁর বইয়ের পাতা খুললে মনে হয়, বহু বছর আগে চলে যাওয়া একজন লেখক যেন পাশে এসে বসেছেন। তাঁর হাতে কলম, সামনে সাদা কাগজ; আর সেই কাগজে তিনি লিখে চলেছেন আমাদেরই কথা—আমাদের প্রেম, আমাদের ভয়, আমাদের ভুল, আমাদের অভিমান, আমাদের সামাজিক মুখোশ এবং তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে।
শরৎচন্দ্রের সাহিত্য তাই অতীতের কোনো জাদুঘরে রাখা পুরোনো প্রদর্শনী নয়; তা আজও জীবন্ত।
কারণ সমাজ বদলেছে, পোশাক বদলেছে, সময় বদলেছে—কিন্তু মানুষের মন?
সে এখনও ভালোবাসায় কাঁদে, অপমানে ভাঙে, আশায় বাঁচে, ভুল করে, ক্ষমা চায়, আবার ভালোবাসে।
আর যতদিন মানুষের এই হৃদয় থাকবে,
ততদিন শরৎচন্দ্রের কলমের কালিও শুকোবে না।
তিনি চলে গেছেন—কিন্তু তাঁর মানুষগুলো যায়নি।
তারা আজও আমাদের চারপাশে হাঁটে—
কখনও দেবদাসের দ্বিধায়,
কখনও পার্বতীর সাহসে,
কখনও রাজলক্ষ্মীর আত্মমর্যাদায়,
কখনও সাবিত্রীর নিঃশব্দ যন্ত্রণায়,
কখনও সব্যসাচীর প্রতিবাদে।
আর দূরে কোথাও, এক পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টালে যেন শোনা যায় সেই চিরপরিচিত আহ্বান—
মানুষকে শুধু দেখো না—
মানুষকে বোঝো।
এই মানবিক বোধের জন্যই শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে শুধু একজন লেখক নন;
তিনি মানুষের হৃদয়ের সেই চিরন্তন কথক, যাঁর গল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না।
দশম শ্রেণী
কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগণা
কল্যাণ নগর খড়দহ
Comments :0