মালিনী ভট্টাচার্য
‘অষ্টমীর ইলিশ’, ‘নবমীর পাঁঠা’—এই দুটি বর্তমানে বাঙালির সংস্কৃতির দুটি প্রধান শীর্ষক হয়ে উঠেছে মনে হয়। জনৈক ছিঁচকে বিরিঞ্চিবাবা সরকারি আমন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গে এসে এইসব ‘গন্ধে গন্ধে’ খাদ্য পুজোর দিন খাওয়ার জন্য গোটা বাঙালি জাতটাকেই ‘পাখণ্ডি’ বা পাষণ্ড বলে গাল দেওয়াতে সঙ্গত কারণেই আমরা ক্ষেপে উঠেছি, আমাদের খাদ্যাভ্যাস বদলানোর চেষ্টা করার জন্য ফেসবুকে বাবাজির অশেষ দুর্গতি করা গেছে; আশা করি দু’-চারটে এফআইআর-ও হবে, যাতে তিনি আর এদিকপানে পা বাড়ানোর সাহস না করেন। এটা প্রয়োজন এই কারণে যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী গাল বাজিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, বাবাজির বিখ্যাত অলৌকিক কথোপকথন এবং বুজরুকি চিকিৎসা তথা ‘জনসেবা’র ব্যবসা এ রাজ্যে এসে ফলাও করার জন্য। এখন মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রাণপণে ব্যাপারটা সামলানোর চেষ্টা করছেন বটে, কিন্তু আমরাও যেন ইলিশ-পাঁঠার বৃত্তে ফেঁসে ভুলে না যাই যে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর আক্রমণের পাশাপাশি তাঁকে বাংলায় ঘাঁটি-গাড়ার আমন্ত্রণটি বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তির ওপরেও আক্রমণ ছিল। তার বিরুদ্ধেও আমরা যেন একইভাবে সোচ্চার হই। আমরা যদি মনে করি সরকার পুজোর সময়ে আমিষ খাবারে নারাজ না হলেই প্রস্তাবিত বুজরুকির ব্যবসাটুকু নীরবে মেনে নেওয়া যায়, তবে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিকেই ধিক্।
একথা বলছি বিশেষ কারণ আছে বলেই। দুর্গাপুজোতে যেমন আমিষ খাবার চল আছে, তেমনই অনেক বাঙালি ঈদের সময়ে গোরু কোরবানি করে মাংস খান। এ বছর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই সেই প্রচলিত প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে; এমনকী গোরু বিক্রির ব্যাপারও। অথচ যারা তা বন্ধ করেছে বিদেশে গোমাংসের ব্যাবসা করে তাদেরই অনেকে ফুলেফেঁপে উঠছে। উঁচুপাড়ার রেস্তোরাঁয় যাঁরা বিফস্টেক খেয়ে থাকেন তাঁরা ছাড়াও এ রাজ্যের অনেক গরিব মানুষের খাদ্যে প্রাণীজ প্রোটিনের এই উৎসটি নগণ্য নয়। ভারতে এবং এ রাজ্যে বর্তমানে পুষ্টির খতিয়ান কোথায় নেমেছে আমরা সবাই জানি। পেট ভরে ভাত পাওয়াটাই যাদের সমস্যা তারা প্রাণীজ প্রোটিন আর কী পায়? ‘কবজি ডুবিয়ে’(এক মন্ত্রীর ভাষায়) ইলিশ-পাঁঠা দুইই খাওয়াতো তাদের সাধ্যের বাইরে। গ্রামাঞ্চলের খালে-বিলে হয়তো সময়ে কিছু ল্যাটাপুঁটি চুনো মাছ এখনো ওঠে; পুকুর ছেঁচে গেঁড়িগুগলিও পাওয়া যায়। কিন্তু তার যে অংশ শহরের বাজারে অনেক দামে বিক্রি হয়, তারপরে কতটুকু স্থানীয় মানুষের জন্য থাকে? আর সেই উৎসগুলিও তো ক্রমে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। তবু যখন এবার ঈদে গোমাংস কার্যত নিষিদ্ধ হলো বাঙালি কি তাই নিয়ে আজকের মতো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল? আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে ভাবনা হয় সেই কারণেই।
কিন্তু এর আরও মারাত্মক উদাহরণ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। ইলিশ-পাঁঠা খাওয়া বাঙালির সঙ্গে কি আজ এতটাই অর্থনৈতিক-সামাজিক ফারাক তৈরি হয়ে গেছে স্কুলের মিড-ডে মিল-এ সপ্তাহে দুটিমাত্র ডিম খাওয়া বাঙালির যে, কোনও আলোচনা বা প্রস্তুতিছাড়াই নতুন সরকার আচমকা সেই খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব তুলে দিল ‘শুদ্ধাচারী’ ইসকনের হাতে, অথচ তখনও খুব একটা বেশি প্রতিবাদ শোনা গেল না? বরং ইসকনের রেস্তোরাঁয় ডবল দামে ভেজ থালি খেয়ে অভ্যস্ত কিছু বাবু এমনও বললেন যে, স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর নোংরা রান্নাঘরে অভাব-অনটনে যে খাদ্য রাঁধুনিরা তৈরি করেন, কেন্দ্রীয় রান্নাঘর থেকে পাঠানো নিরামিষ খাদ্য তো তার তুলনায় অমৃত। এক ধাক্কায় কোথাও কোনও নালিশ জানানোর পথও আর রাখা হলো না। এখানে তো দায়িত্ব দেওয়া হলো বাগেশ্বর বাবার চাইতেও বড় ব্যাবসায়িক চক্রকে। তাদের হাতে খাদ্য-অধিকারের এবং খাদ্য-অভ্যাসের সরকারি আশ্বাসটুকু যখন বিলীয়মান হলো, তখনও কিন্তু আমরা এতটা ক্ষেপে উঠিনি। বরং বলেছি, দেখাই যাক না, নতুন সরকার কী করে!
খাদ্যাভ্যাস মানে তো শুধু আমি কী খাই তার বিবরণ নয়। অনেক হিন্দু বাঙালি ধর্মীয় বিশ্বাসবশত গোমাংস খান না। সেটা তাঁর অধিকার। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায় একই কারণে শূকরমাংসে নারাজ। সেটাও তাঁদের অধিকার। অথচ গোরুর বিরুদ্ধে শুয়োরকে লড়িয়ে দিয়ে মুসলিমদের সংস্কারকে আক্রমণ করে যখন অতি জঘন্য ভাষায় তাঁদের প্রতি বিদ্রূপ বর্ষণ করা হয়, তখন বাঙালি হিসাবে আমরা সেই বিভাজনের বিরুদ্ধে কি এভাবেই রুখে দাঁড়াই? বাঙালির সংস্কৃতি তো কোনও একটা উৎস থেকে আসেনি। তা এসেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-মুসলমান-খ্রিস্টানের ঐতিহাসিক সংমিশ্রণ থেকে। আর এতেও সন্দেহ নেই যে বাংলার আদি বাসিন্দাদের পাশাপাশি পাঠান-মোগল-সিন্ধি-পার্সি-বিহারি-ওড়িয়া-মারোয়াড়ি যারাই দীর্ঘদিন এখানে বসবাস করেছেন, তাঁদের ভাষা-সংস্কৃতির নানা উপাদান একত্রে মিশে তা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। কোনও বিশেষ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সরকারি চাটুকারিতা শুরু হবার অনেক আগে থেকেই তা সত্য। সেখানে খাদ্যে স্বাদের ও উপকরণের যেমন বৈচিত্র থাকতে পারে, তেমন ধর্মীয় সংস্কারেরও তফাৎ থাকতে পারে। এবিষয়ে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তি সেই বিভিন্নতা সম্বন্ধে সহনশীল থাকছে কি?
আর ভোজনে বৈচিত্রের মতোই বাঙালির ভজনের বৈচিত্র। একটির সঙ্গে আরেকটির যে সম্পর্কের কথা ওপরে বলেছি, তার প্রেক্ষিতেই নিজে ধর্মবিশ্বাসী না হয়েও দু’-এক কথা বলার অধিকার আছে বলে মনে করি। অনেকের মতে আজ পশ্চিমবাংলায় যেসব নতুন পুজোর চলন হচ্ছে, যেমন হনুমান বা গণেশের পুজো, সেগুলো ঠিক বাঙালির পুজো নয়। এমনকী এখানে দু’-এক জায়গায় রামের পুজো চালু থাকলেও উত্তরভারতের রামের সঙ্গে আমাদের রামের সাদৃশ্য ও তফাৎ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অবশ্য আমাদের বর্তমান শাসকেরা তা মানতে চাইবেন বলে মনে হয় না।
আমার মতে বাঙালি হিন্দু যখন তেত্রিশ কোটিকেই মানে তখন হনুমান বা গণেশের পুজো করলেই বা ক্ষতি কি? বিবাহ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে শহুরে বাঙালি তো মেনেই নিয়েছে ‘সঙ্গীত’ ও ‘হলদি’ জাতীয় উত্তরভারতীয় সংস্কার। আবার অনেক আগে থেকেই আমাদের তেত্রিশ কোটির মধ্যে কি ঢুকে যাননি অর্বাচীন মনসা, শীতলারা? এমনকী, আল্লাহ্তালা নিরাকার হলেও আমাদের গ্রামে গ্রামে কি ছড়িয়ে নেই শত শত পীরের মাজার? মুসলমানরাও কি ভজনা করেন না সত্যপীর ও বনবিবির? নেহাৎ শরৎকালে দেবীপূজা এমন বিশেষভাবে বাংলাতেই আছে বলেই শাসকদলের কাছে অন্য মডেল নেই, বারবার বলতে হচ্ছে ‘সনাতনী’ ঢঙে পুজোর কথা, সেটা কী তাঁরা নিজেরাও জানেন না। আর ‘পবিত্রতা’ রক্ষা করে পুজো বলতে তাঁরা একটাই জিনিষ বোঝেন: মুসলমান এবং মার্কসবাদী বা ‘দিমাগি নকশাল’ রাষ্ট্রদ্রোহীদের অশুভ প্রভাব থেকে মণ্ডপ মুক্ত রাখা। এটাও কীভাবে করা যায় তা নিয়ে ধন্দে আছেন বলেই একেকবার একেক কথা বলছেন। তবে জমানার এই প্রথম বছরটা একটু সামলে না চললে, শহুরে শিক্ষিত বাঙালির অস্মিতায় আঘাত লাগলে তাঁদের কিছুটা নাকাল হতেই হবে।
সংস্কৃতির বিপদটা অন্যখানে। বাঙালির অস্মিতায় যেমন রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্তের যুক্তিবাদের ঐতিহ্য রয়েছে তেমনই রয়েছে কৌলীন্য প্রথার ‘জাতের নামে বজ্জাতি’র ধারা, একসময়ে সবচাইতে বেশি সতীদাহের ঘটনার রঙ্গমঞ্চ ছিল বাংলা, আবার স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্রান্তিকারী মুহূর্তেও এই বাংলাতেই রয়েছে পরের পর ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার ইতিহাস। এই ‘সনাতনী’ অন্ধকারের ঐতিহ্য শহুরে শিক্ষিত বাঙালিরও চামড়ার নিচেও বিদ্যমান। সেখানে আঁচড়িয়ে এই অন্ধকারের ক্ষরণ ঘটানো যাদের ব্যাবসা এ রাজ্যেও তারাই এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। ভোজন ও ভজনের মধ্য দিয়ে বিভাজন সেই ক্ষরণ ঘটিয়ে মানুষকে নীরব রাখবে এই ভরসাতেই তো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ‘গেরুয়ার অপমানে’র উত্তর দিতে কাজের দিনে নাগা সন্ন্যাসীর বাহিনী জোগাড় করে এক জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে তা দখল করার হুমকি দিতে পারে।
এরা প্রথম এসে নিজেদের ‘জাতীয়তাবাদী’ বললেও এখন ‘রাষ্ট্রবাদী’ মতাদর্শের ধ্বজাধারী হিসাবে বুক বাজাচ্ছে। এই রাষ্ট্র আবার পরিচালিত হচ্ছে বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির অঙ্গুলিহেলনে; সে শক্তি তার মনমোহিনী উপকরণ নিয়ে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের যাবতীয় দমনমূলক শক্তির সঙ্গে। গণেশ এবং হনুমানের মাথা ফুটপাতের মানুষের চালানো ছোট মন্দির ছাড়িয়ে আশপাশের প্রতিবেশীকে গ্রাস করে আকাশ স্পর্শ করছে। সেখানকার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করছে অনেক ওপরতলায় থাকা রাষ্ট্রবাদীরা। এমনকী প্রত্যন্তের আদিবাসী পাড়ার খোলা জাহেরথানেও রঙ্গিন টালির মন্দির উঠছে যাতে ‘ওঁ’ বা ত্রিশূলচিহ্ন প্রকট হচ্ছে। সংস্কারকে চিরাচরিত সংস্কৃতির মূল্যবোধের মোড়কে সাজাচ্ছে। পাড়ার গণ্ডির মধ্যে চিরাচরিত উৎসবগুলির ইজারা নিয়ে আমাদের সমস্ত স্বাভাবিক সামাজিকতাকে, এমনকী আমাদেরপারিবারিক জীবন, বন্ধুত্ব আমাদের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহকে নিয়ন্ত্রণে এনে বাজারের ছকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলছে। বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপে অতিকায়‘ভব্য’ রামমন্দিরের মতো তা আমাদের চেতনাকে গ্রাস করছে। নব অস্মিতার এই মোহিনী মায়া রাষ্ট্রের জবরদস্তিকেও সহনীয় মনে করাচ্ছে। আজ বাঙালির সংস্কৃতিকে এই নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে হবে।
Culture and Bengal
বাঙালির সংস্কৃতি: ভোজন ও ভজন
×
Comments :0