POST POLL VIOLENCE

বিজেপি আছে তৃণমূলেই

সম্পাদকীয় বিভাগ

নতুন ধুতি-পাঞ্জাবী পরে বাঙালি জামাই সেজে যতই জয় উদ্‌যাপন করুন, বিরোধী নেতা-কর্মী ও অফিসে হামলা না করার আবেদন জানান অথবা বদলা না বদলের কথা বলুন বাস্তবের মাটিতে বঙ্গ বিজেপি’র কাছে তা অর্থহীন। বদলা নয় বদলের কথা সদ্য পরাজিত মুখ্যমন্ত্রীও সেদিন বলেছিলেন কিন্তু তাঁর অনুগত বাহিনী সেটা কানেও তোলেনি। এবার বিজয়ী প্রধানমন্ত্রীর কথাও কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। সেটিং তত্ত্বকে ফের প্রাসঙ্গিক করে তুলে অত্যুৎসাহী ও উশৃঙ্খল বিজয়ীরা প্রমাণ করে দিচ্ছেন তারা তৃণমূল থেকে ভিন্ন কোনও প্রজাতি নয়। ২০১১ সালে তৃণমূল জেতার পর যেভাবে রাজ্যের সর্বত্র পাড়ায় পাড়ায় বাম কর্মী সমর্থকদের উপর ভয়ঙ্কর আক্রমণ হয়েছিল, বামেদের পার্টি অফিস ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও দখল হয়েছিল এবারও তার অন্যথা হচ্ছে না। নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক হিংসা, পরাজিতের উপর বিজয়ীদের প্রাণঘাতী হামলার যে ধারা তৃণমূল তৈরি করেছিল মাত্রায় কিঞ্চিত কম হলেও বিজেপি সেই ধারাকেই অনুসরণ করছে। আসলে নাম বিজেপি হলেও তাদের স্ফীত হয়েছে তৃণমূল থেকে আসা পরিযায়ীদের দ্বারা। আর বাংলার বিজেপি-তে এই পরিযায়ীদেরই প্রভাব প্রতিপত্তি বেশি। বিরোধী দলনেতা এদেরই মধ্যমণি, একদা নন্দীগ্রাম-জঙ্গলমহলে নজিরবিহীন খুন-সন্ত্রাসের মাস্টারমাইন্ড। তাই তৃণমূলী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও তৃণমূলী ঘরানাতেই বিজেপি একাত্ম হয়ে গেছে।
২০১১ সালে গণনার দিন বিকেল থেকে সর্বত্র শুরু হয়ে গিয়েছিল বামপন্থী বিশেষ করে সিপিআই(এম) নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর নির্বিচারে হামলা, তাদের বাড়িতে আক্রমণ, লুটপাট, আগুন লাগানো। একদিনে প্রায় লক্ষাধিক হামলা-হুম‍‌কি সংগঠিত হয়েছিল। নিমেষের মধ্যে বাংলা ফিরে গিয়েছিল মধ্যযুগের অমানবিক, অসভ্য বর্বরতায়। সমস্ত রিকশা-ভ্যান-অটোয় জোর করে লাগানো হয় তৃণমূলী ঝান্ডা। সব রিকশা-অটো স্ট্যান্ড ও ইউনিয়ন অফিস দখল হয়। একইভাবে সমস্ত হকার ইউনিয়ন, বাস শ্রমিক ইউনিয়ন গায়ের জোরে দখল করে। রিকশা-অটো-বাস দোকান বন্ধ করে তাদের দিয়ে তৃণমূলের বিজয় মিছিল করানো হয়।
দেড় দশক পর সেই তৃণমূলের পরাজয়ে তাদেরই দোসর বিজেপি তৃণমূল অনুসৃত পথ পরিহার করেনি। একইভাবে সর্বত্র রিকশা-অটোস্ট্যান্ড, ইউনিয়নের দখল নিয়ে বিজয় উৎসব করছে, মিছিল করছে। বিরোধী নেতা-কর্মী-সমর্থকরা অক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের বাড়িতে হামলা করা হচ্ছে। ছাড় পাচ্ছে না বিরোধীদের দলীয় অফিসও। ত্রিপুরায় ছ’বছর আগে বিজেপি-র জয়ের পর ঠিক এমনটাই হয়েছিল। তবে ত্রিপুরায় আক্রমণ সন্ত্রাসের বীভৎসতা ও নৃশংসতা ছিল অনেক বেশি। কারণ সেখানে শত্রু পক্ষ ছিল বামপন্থী তথা সিপিআই(এম)। সেই অর্থে বাংলায় এখন হামলা ততটা তীব্র নয় কারণ বাংলায় এখন বামপন্থীদের উৎখাত করে বিজেপি ক্ষমতায় আসেনি এসেছে আরএসএস আর এক ঘনিষ্ট তৃণমূলকে হারিয়ে। এই হামলার আর একটি অভিমুখ অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে উন্মোচিত হয়েছে। রেল স্টেশন এবং রাস্তার পাশে বিশেষ করে গরিব সংখ্যালঘু হকারদের দোকানপাট ভেঙে তছনছ করে দেওয়া শুরু হয়েছে। রেল লাইনের ধারে বা খালের ধারে বস্তি-ঝুপড়িগুলির উপরও হামলা শুরু হয়েছে। মুসলিম এবং অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে এমন ধ্বংসলীলা চলছে।
দিল্লি থেকে নেতারা যতই ভয়শূন্য বাংলা, নিরাপদ বাংলা সুশাসনের বাংলার প্রতিশ্রুতি দিন না কেন তৃণমূলী ঘরানা থেকে বেরোনো একরকম অসম্ভব। কারণ ট্র্যাডিশন তো একই। বিজয়ী আর পরাজিতর ডিএনএ’র উৎস তো একই—আরএসএস।

Comments :0

Login to leave a comment