অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় মনে হলেও এটাই সত্য ইতিহাসে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে সরকারি উদ্যোগে কোনও রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান হচ্ছে না। আর এমন এক সিদ্ধান্ত হেলায় নেওয়া হয়েছে রাজ্যে প্রথম আরএসএস-বিজেপি সরকারি ক্ষমতা দখল করেছে। মানবিক ঔদার্য ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ঘোরতর বিরোধী ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ধারক ও বাহক আরএসএস-বিজেপি’র চক্ষুশূল রবীন্দ্রনাথ। উদার বিশ্বমানবতার পথ প্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ জীবন দর্শনে, ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত, ভাষা-সংস্কৃতির কোনও সঙ্কীর্ণতার স্থান ছিল না। ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভেদ-বিভাজনকে কোনোদিন প্রশ্নয় দেননি। তাঁর চোখে মানুষের আসল পরিচয় সে মানুষ, অন্য কিছু নয়। হিন্দু-মুসলিমমের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। ভারতকে তিনি বহুত্বের মহামিলন ক্ষেত্র হিসাবে দেখেছেন। দেশভাগ রোখার জন্য তিনি যেমন পথে নেমেছেন তেমনি, হিন্দু, মুসলিম সকলকেই ভারতের সন্তান হিসাবে দেখতেন। এমনকি তাঁর দেশাত্মবোধের গভীরতা দেশকালের সীমা ছাড়িয়ে মহামানবের সাগর তীরে নোঙর করেছিল। এহেন মহাকবি অতিমাত্রায় সঙ্কীর্ণ ধর্মান্ধ রাজনীতির কুয়োর জলে আবদ্ধ হিন্দুত্ববাদীদের কাছে যে স্বাগত হবেন না সেটাই স্বাভাবিক। আরএসএস-বিজেপি কোনোদিনই রবীন্দ্রনাথকে সহ্য করেনি। মনুবাদ চালিত হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ বেমানান তাই পরিত্যাজ্য যে অজুহাতই খাড়া করার চেষ্টা হোক না কেন এহেন আরএসএস-বিজেপি এরাজ্যে ক্ষমতা দখলের পর রবীন্দ্র জয়ন্তী পালনে উৎসাহ দেখাবে না সেটাই স্বাভাবিক।
মনে রাখা দরকার বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের বিবিধ আয়োজন হয়েছে। প্রায় সর্বত্র এবং কেন্দ্রীয় বোর্ডে রবীন্দ্র সৃষ্টিকে পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভারতের একমাত্র কবি যাঁর সৃষ্টি শুধু দেশের সব ভাষায় অনুদিত ও চর্চিত হয়নি, বিশ্বের বেশিরভাগ ভাষায়ও অনুদিত হয়েছে। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র রচনা পাঠ্য। অথচ কবির নিজের দেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত তাঁকে মুছে ফেলার নির্লজ্জ নিকৃষ্ট প্রয়াস চলছে।
ইদানীং রাজনৈতিক স্বার্থে ও ভোটের স্বার্থে বিজেপি নেতার রবীন্দ্রনাথের বারবার উচ্চারণ করলে হিন্দুত্ববাদী মননে রবীন্দ্রনাথের কোনও জায়গা নেই। রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণ, ফুলমালা দেওয়ার উপরই তারা আটকে থাকবেন। রবীন্দ্র চর্চা, রবীন্দ্র দর্শনকে আত্মস্থ করলে হিন্দুত্ববাদ, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ঘৃণা চিরতরে বর্জন করতে হবে।
তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো নিজেদের বাঙালি প্রমাণ করতে ও রবীন্দ্র অনুরাগী প্রমাণ করতে মোদী-শাহ বিস্তর নাটক করে চলেছেন। মোদী তো ধুতি-পাঞ্জাবী পরে রীতিমতো ফ্যাশন প্যারেড করেছেন। আরও এক ধাপ এগিয়ে কবির জন্মদিনে নতুন সরকারের শপথের আয়োজন হচ্ছে। তার জন্যই রাজ্যজুড়ে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সব রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ রবীন্দ্র জন্মদিনে রবীন্দ্র দর্শন- রবীন্দ্র সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে ধর্মান্ধতা আর হিন্দুত্ববাদের জয়ধ্বনি হবে। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে এবার রবীন্দ্র ভাবনার বিরোধী ভাবনা ও সংস্কৃতিকে মহাসমারোহে উদ্যাপন করে রবীন্দ্রনাথকে অপমান ও অবজ্ঞা করার কৌশলী ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশ্য যাদের মনের মণিকোঠায় কবিগুরু চির অধিষ্ঠান বাংলার সেই মানুষ সেটা হতে দেবেন না। রবীন্দ্রজয়ন্তী এবারও ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় উদ্যাপিত হবে। অনেক বেশি করেই হবে।
Rabindra Jayanti 2026
কবি বর্জনের ইঙ্গিত?
×
Comments :0