সাম্য রাহা
ডেঙ্গু রোগে আকস্মিক মৃত্যু আটকাতে শুরু হচ্ছে এমন একটি আন্তজার্তিক গবেষণা যাতে অংশগ্রহণ করছেন এ রাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা। ডেঙ্গুর মারণক্ষমতা রুখতে এই ইন্দো-ইউরোপীয় গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে কল্যাণীর জিন গবেষণা কেন্দ্র। দেশের বায়োটেকনোলজি বিভাগ এই গবেষণা প্রকল্পের নামকরণ করেছে ‘কমব্যাট’। প্রকল্পটি ‘ইন্দো-ইউরোপীয় হরাইজন ইউরোপ প্রোগামের’ অধীনে অর্থায়িত। শীতপ্রধান দেশে গরমের সময় এখন ডেঙ্গু থাবা বসিয়েছে। আমাদের দেশের উত্তর পূর্ব রাজ্যগুলিতেও এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশ বাড়ছে। মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। অকালে প্রাণ যাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে শীত প্রধান দেশগুলিতে এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু উত্তরোত্তর বাড়ছে। এই মারণ রোগের ভয়ে শঙ্কিত অনেক দেশই। তাই ভবিষ্যতের ডেঙ্গু মহামারীকে রুখতে প্রস্তুতি এখনই শুরু হচ্ছে।
মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ মানুষের শরীরে হঠাৎ করেই অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। কেন এমনটা হয়? চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে, যার এখনো কোনও সদুত্তর নেই। সেটি কি শুধুমাত্র ভাইরাসের কারণে নাকি অন্য কোন বিষয় এর সাথে জড়িত? অবশ্যই রোগীর শরীরে তখন যে অনাক্রমতা তৈরি হয়, তাই প্রকারান্তরে নানা সমস্যা তৈরি করে। সেই বিজ্ঞানভিত্তিক পথের সন্ধান করতে শুরু হচ্ছে এই আন্তজার্তিক গবেষণা। এই গবেষণা আগামীতে ডেঙ্গু মহামারীর চিকিৎসায় আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, গবেষণা থেকে এমন মেডিক্যাল পরীক্ষা পদ্ধতি বেরিয়ে আসবে যা দেখে আগে থেকে বলে দেওয়া সম্ভব হবে রোগী কী ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
এই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকছে কল্যাণীর ‘ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিক্যাল জেনোমিক্স’। এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেবেন অধ্যাপক অরিন্দম মৈত্র, ড. সাগর সেনগুপ্ত, ড. অনুপ মজুমদার। অন্যদিকে ইউরোপীয় পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক উজ্জ্বল নিয়োগী। এছাড়াও ফরিদাবাদের রিজিওনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনজি, মনিপাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি এবং দিল্লির ম্যাক্স ও গুরুগ্রামের আর্টেমিস হাসপাতালের চিকিৎসকরাও যুক্ত হয়েছেন এই প্রকল্পে।
এই গবেষণায় জীববিজ্ঞান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ন্যানো টেকনোলজি, একক-কোষ সিকোয়েন্সিং এবং 'অর্গান-অন-চিপ' ও বায়ো ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতাকে একত্রিত করে এই রোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য তৈরি হচ্ছেন জিন বিজ্ঞানী, গবেষকরা। একাধারে অনেকগুলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমাহার ঘটবে এই গবেষণায়। জানা গেছে, যে সব হাসপাতালে গুরুতর রোগী ভর্তি হন, সেখান থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে শরীরের তীব্র অনাক্রমণতার কারণ কী, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। এ আই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পূর্বাভাসমূলক মডেল তৈরি করা হবে, যা রোগের তীব্রতা ও রোগীর অবস্থা সময়মতো মূল্যায়নে সহায়ক হবে।
এখানে ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন শুধু নয়, রোগীর শরীরের কোষের ওপর তার প্রভাব বিশদভাবে খতিয়ে দেখা সম্ভব হবে। এই উন্নত পদ্ধতিগুলি শুধু ডেঙ্গু নয়, ভবিষ্যতে যে কোনও নতুন ভাইরাস বা রোগ জীবাণু দ্রুত শনাক্ত করতে এবং তার প্রতিকার করতে সাহায্য করবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
জিন বিজ্ঞানী অধ্যাপক অরিন্দম মৈত্র জানিয়েছেন, এই গবেষণার অনেকগুলি অভিমুখ রয়েছে। শুধুমাত্র রোগই নয়, রোগীর শরীরে কোষের অভ্যন্তরে ভাইরাসের কারণে কী পরিবর্তন ঘটছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা হবে। ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করার পাশাপাশি প্রতিটি কোষের ভিতরে একক কোষের জিন প্রকাশ বা জিন এক্সপ্রেশন’এর অবস্থান এবং নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। আরএনএ অণুর গঠনে যে রাসায়নিকভাবে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন হচ্ছে সেটিরও পর্যবেক্ষণ করা হবে। নিঃসন্দেহে এই গবেষণা আগামী দিনে ডেঙ্গুর চিকিৎসা পদ্ধতিতে নতুন দিশা দেখাবে। এছাড়াও এই যৌথ গবেষণা ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বাস্থ্য গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত আদান-প্রদানকে আরও উন্নত করবে, যার ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসবে। ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিশ্বস্বাস্থ্য গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
dengue
ডেঙ্গুতে মৃত্যু রুখতে আন্তর্জাতিক জিন গবেষণায় কল্যাণীর বিজ্ঞানীরা
×
Comments :0