পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
অবশেষে রাজ্যে ঘটল সেই সরকারের পরিবর্তন। গত পনেরো বছর আগে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় পালাবদল ঘটিয়েছিল ঘাসফুলের দল। কার্যত গত এক যুগ ধরে সেই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিগুলি ক্রমশ প্রহসনে পরিণত হয়েছে তৃণমূল সরকারের রাজত্বে। পরপর তিনবার জয়ী, হ্যাটট্রিক করা সরকারের মেয়াদ যত বেড়েছে ক্ষমতার অলিন্দে তত বেশি আক্রান্ত হয়েছে রাজ্যের মানুষের অধিকার। শাসনের মেয়াদ বৃদ্ধির সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল রাজ্যের মানুষের অধিকার হরণের অপচেষ্টা। সেই লক্ষ্যে শাসক দল আর সরকারি প্রশাসন মিলে মিশে লুটেপুটে খাওয়ার নৈরাজ্যের এক ভয়ঙ্কর মডেল হয়ে উঠেছিল এই রাজ্য! জনজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ছেড়েছে ঐ শাসক দল! শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, শিল্প থেকে কাজ, নাগরিক সুরক্ষা থেকে আইন শৃঙ্খলা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন নতুন নজির গড়েছিল ঘাসফুলের সরকার। পাশাপাশি সমাজে দুর্নীতির ওই ভয়াবহ বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি বাহুবলি লেঠেল বাহিনীর মতো সিন্ডিকেট বাহিনী পুষে ছিল শাসক দল, পাড়ায় পাড়ায় প্রতিবাদ প্রতিরোধের দমিয়ে রাখতে। কার্যত গোটা রাজ্য জুড়ে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে উচ্ছিষ্ট ভোগী প্রজা বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল রাজ্যের শাসক। ফলে নিউটনের গতিসূত্রের মতো প্রতিটা ক্রিয়ার সমান এবং বিপরীত মুখী প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে ছেড়েছে তাঁদের রাজ্যের মানুষ!
ফলে ভোটের কয়েক মাস আগে থেকেই ট্রেন, বাস, অটো টোটো চড়লেই রাজ্যের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে যে জন অসন্তোষের চোরাস্রোত টের পাওয়া যাচ্ছিল। পরিবর্তনের ধোঁকা দেওয়া রাজ্যের ‘ মা – মাটি – মানুষের ‘সরকারের থেকে যে পরিত্রাণের পথ খুঁজছিল রাজ্যের মানুষ সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল এই ভোট যুদ্ধের ময়দানে। আজ ভোটের ফলে প্রমাণিত যে এবারের ভোটে রাজ্যে নতুন সরকার গড়ার ক্ষেত্রে ঘাসফুলের থেকে পরিত্রাণের পথকেই ‘পাখির চোখ’ করেছিল সাধারণ মানুষ। ফলে ফল প্রকাশের দিনে কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো প্রবল জনরোষের ধাক্কায় খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে ঘাসফুলের সরকার। এমন প্রবল জনরোষের আবহে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে রাজ্যে পদ্মফুলের সরকার। কার্যত বুথ ফেরত সমীক্ষার পণ্ডিতদের ফেল করিয়ে রাজ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়ার পথে দেশের শাসক দল বিজেপি।
সন্দেহ নেই স্বাধীনতা উত্তর কালে বাংলার মাটিতে পদ্ম সরকার প্রতিষ্ঠা কেবল রাজ্য রাজনীতি নয় উপরন্তু জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বাম রাজনীতির আঁতুড়ঘর বাংলায় বামপন্থার গুণগত উত্তরণের নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হলো এই নতুন সরকার পরিবর্তন এবং রাজ্য রাজনীতির পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও। সন্দেহ নেই বহুদলীয় গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন সময়ের পরিবর্তনের মতোই অনিবার্য। ফলে এবারও সমাজ মাধ্যম জুড়ে তৃণমূল সরকারের পরিবর্তন থেকে প্রত্যাবর্তনের বিতর্ক জমে উঠেছিল রাজ্যের ভোট পর্বে। ফলে রাজ্যের সরকার পরিবর্তন হলে কোন কোন ইস্যুতে পরিবর্তনের জনমত জোরালো হচ্ছিল, কোনও রাজনৈতিক প্রচারকে শাসক বিরোধী বিভিন্ন পক্ষই হাতিয়ার করছিল, সেগুলোর দিকে এখন নজর দেওয়া জরুরি পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বোঝার ক্ষেত্রে।
দেশের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি এ রাজ্যের ভোট রাজনীতিতে হিন্দু মেরুকরণের পথকেই হাতিয়ার করেছিল। যা ছিল সঙ্ঘের আসল উদ্যেশ্য। রাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান বিরোধী জনরোষকে ভোট বাক্সে তুলে আনতে চেয়েছিল এই পথেই। এমন মেরুকরণের রাজনীতিতে তারা যেমন একদিকে অনুপ্রবেশ ইস্যুকে ভোটের প্রচারে তুলে এনেছে পাশাপাশি শাসক তৃণমূলের পাহাড় প্রমাণ রাশি রাশি দুর্নীতিকে টেনে এনেছে প্রচারের ময়দানে। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মতো হাই প্রোফাইল গেরুয়া নেতাদের উচ্চগ্রামের ভাষণ এবং সেই ভাষণের ধারাবাহিক প্রচার চলেছে সংবাদ মাধ্যমের পর্দা কিংবা পাতা জুড়ে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী খরচে। সব মিলিয়ে ঘাসফুলের ভয় থেকে পদ্ম ফুলের ভরসা জোগানোর বর্ণময় প্রচার অভিযান প্রমাণ করেছে এদেশের নির্বাচনী প্রচারে অসম অর্থের বিষম রাজনৈতিক প্রভাব। ভোট প্রচারে সব মানুষের একটা ভোট, সবার ভোটের মূল্য এক এবং অভিন্ন কিংবা সব দলের জন্য নির্বাচনের অভিন্ন আচরণ বিধি হলেও অর্থের মাপকাঠিতে, প্রশাসনিক প্রভাবের দাপটে শাসক দল বনাম বিরোধী দলের ভোট যুদ্ধ যে কতটা অসমান, অরক্ষিত জমির উপর দাঁড়িয়ে চলে সেটা এবারের নির্বাচনে আবারও প্রমাণিত হলো। কিন্তু এমন বহু হাজারি প্রচারের ঢক্কা নিনাদ সত্ত্বেও দেশের মানুষ বহু সময় ইতিহাস সৃষ্টি করেছে সময়ের চাহিদা মেনেই।
পাশাপাশি এ রাজ্যের মানুষ সাম্প্রতিককালে পৌর ভোট থেকে পঞ্চায়েত ভোটে গণতন্ত্রের প্রহসনের নিত্য নতুন মডেল দেখেছে। রাজ্যের নির্বাচন কমিশনের মতো স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন অবস্থান লোপ পেয়েছিল রাজ্যের শাসকের নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির দাপটে। ভোটের মনোনয়ন থেকে শুরু করে, ভোটের দিনে হিংসা, গণনা কেন্দ্রে ভোটের ফল লুট, এমনকি ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসে মানুষকে আতঙ্কের আবহে ঘর বন্ধ এবং মুখ বন্ধ করে রাখাটাই রেওয়াজে পরিণত করেছিল রাজ্যের ঘাসফুল বাহিনী। ফলে গত পনেরো বছরে এমন স্থানীয় স্তরের ভোটে মানুষের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি কখনই। তার সাথে ছিল ভোটে ভেজাল ভোটার তালিকা। যে তালিকায় হাজির হাজার হাজার মৃত, ভুয়ো কিংবা স্থানান্তরিত ভোটারের নামে জাল ভোট দেওয়া চলতো রাজ্যের পুলিশ বাহিনীকে সঙ্গী করে। এবারের নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধনের ধাক্কায় বিপুল অবৈধ নাম ছাঁটাই হওয়ায় বুথে বুথে তৃণমূলের বাইক বাহিনীর সেই চেনা ভোট লুটের দৃশ্য ধরা পড়েনি। ফলে বিপুল সংখ্যায়, বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ এবার ভোট দিয়েছেন বিধানসভার ভোটে। আর বলাই বাহুল্য ওই ভোটের সিংহভাগ ছিল এবারে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ভোট। রাজ্যের শাসকের বিরুদ্ধে ভোট। কেন্দ্রের সরকারে থাকা এবং রাজ্যে বিরোধী দলের থাকার সুবাদে, বিজেপি, হাইভোল্টেজ প্রচারের আবহে এবং মেরুকরণের দাপটে জনমানসে ঘাসফুলের প্রধান বিকল্প এবং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে নিজেদের অনেকটাই তুলে ধরতে পেরেছে। ফলে তৃণমূলের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সিংহভাগ ভোট তারাই বাক্সবন্দি করেছে। কিন্তু একদিকে যেমন বহু মানুষ এবারের ভোটে তাদের অধিকার প্রয়োগ করেছে তেমনি রাজ্যের সাতাশ লক্ষ মানুষ এবারের এই বিধানসভার ভোটে বিনা অপরাধে তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতায়। রাজ্যের সরকার গড়ার ভোটে সমাজের এই বিপুল পরিমাণ প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার হরণের অধ্যায় হয়ে থাকবে গণতন্ত্রের ইতিহাসে কলঙ্কের পর্ব হিসাবেই।
পাশাপাশি, এই ভোটে বিপুল পরিমাণ কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার করে রাজ্যের প্রশাসনের খোল নলচে যেভাবে ভোট হয়েছে তাতে এটাও প্রমাণিত হলো যে পুলিশ প্রশাসনের দক্ষতা থেকে নিরপেক্ষতা সবটাই ছিল ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে। প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার চেয়ে বেশি ছিল প্রশাসকদের রাজনৈতিক আনুগত্য। এখন ভোট মিটে গেলে রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে আবারও কি নতুন আনুগত্য আদায়ের কৌশল দেখবে রাজ্যবাসী সেই গিরগিটির মতো বেঁচে থাকা আমলাদের থেকে ? কিংবা সমাজের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা, কলাকুশলীরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে আবার নতুন শাসক ঘনিষ্ঠ হওয়ার নতুন মহড়ায় যুক্ত হবেন? এমন বহু অজানা, অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো তোলা রইলো ভবিষ্যতের জন্যই।
এবারের ভোটে গেরুয়া শাসকদের নিরন্তর প্রচারে অনুপ্রবেশের কথা উঠে এলেও গত বারো বছর দেশের ক্ষমতায় থেকেও কেন সেই অনুপ্রবেশ রোখা যায়নি সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এই ভোট প্রচারে। তৃণমূলের ডজন ডজন নেতা মন্ত্রী সাংসদেরা একের পর এক দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়েও কেন্দ্রীয় তদন্তের বেড়াজাল টপকে কলার তুলে ঘুরে বেড়িয়েছে কিভাবে তার সদুত্তর মেলেনি দেশের শাসক দলের থেকে। ফলের রাজ্যের নতুন সরকারের কাছে তৈরি হয়েছে মানুষের পাহাড়-প্রমাণ প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে চিট ফান্ডের দুর্নীতি থেকে শিক্ষক নিয়োগ, অভয়া হত্যা, কয়লা, বালি, গোরু, রেশন, আবাসনের মতো কেলেঙ্কারির কুশীলবদের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের প্রশাসনিক অবস্থান। আশা করা যায় ভবিষ্যৎ এমন অনেক অধরা প্রশ্নের উত্তরের আশায় মানুষ অপেক্ষা করবে যারা দলে দলে বিপুল সংখ্যায় ঘাসফুলের অপশাসন থেকে মুক্তি পেতে পদ্মাসনে বসিয়েছে নতুন সরকারকে। পাশাপাশি রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মানুষের নজরে থাকবে রাজ্যে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পায়ন থেকে বেহাল কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সরকারের হাল ফেরানোর অবস্থান। থাকবে আতশ কাচের তলায় নতুন শাসকের বাংলা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি অবস্থান।
ধর্মীয় রাজনীতির মেরুকরণের ভোটে উচ্চমেধার অধিকারী ভারতীয় জনতা পার্টি। তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই করতে গিয়ে এদেশে নরম হিন্দুত্বের পথে হেঁটেছেন যারা তারা প্রত্যেকেই ভোটের ময়দানে হাত পুড়িয়েছেন। যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো এ রাজ্যের তৃণমুল কংগ্রেসের ভোটে ভরাডুবিতে। উগ্র হিন্দুত্বের প্রতিষেধক হিসাবে কখনও তাঁরা সংখ্যালঘু তোষণের পথ ধরেছে, আবার কখনও পুরোহিত ভাতা থেকে শুরু করে জগন্নাথ মন্দির, মহাকাল মন্দির কিংবা দুর্গা অঙ্গন তৈরির ছক কষেছে। কিন্তু সে পথে যে সরকারি অদক্ষতা এবং অপদার্থতার হাত থেকে রেহাই মেলে না সেটা আবারো স্পষ্ট হলো এই বিধানসভার ভোটে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিকল্প ভাষ্য তৈরি করতে না পেরে বিজেপি’র জুতোয় পা গলানোর চড়া মাশুল এবার দিতে হয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলকে। যার পরিণতি এবারের ভোটে মুখ্যমন্ত্রী সহ রাজ্যের দুই ডজন মন্ত্রী ভোটে ধরাশায়ী হয়েছে। ফলে ‘আমও গেল ছালাও গেল’ – এই হাল হতে চলেছে তাঁদের অদুর ভবিষ্যতে! গত পনেরো বছর ধরে দুয়ারে সরকার নয় কার্যত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে আতঙ্কের প্রতিবিম্ব হয়ে উঠছিল এই ঘাসফুলের দল। যে আগাছা সাফ করে এবারের ভোটে মানুষ নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
Highlights
স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলার মাটিতে পদ্ম সরকার প্রতিষ্ঠা কেবল রাজ্য রাজনীতি নয় উপরন্তু জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বাম রাজনীতির আঁতুড়ঘর বাংলায় বামপন্থার উত্তরণের নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হলো এই নতুন সরকার পরিবর্তন এবং রাজ্য রাজনীতির পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও।
Comments :0