editorial

শেষ লড়াই জিতবে কমিউনিস্টরাই

সম্পাদকীয় বিভাগ

নতুন সরকার শপথ নেবার আগেই পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচনের সভায় অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য ঘোষণা করে দিয়েছেন। বলেছেন বিজেপি’র বাংলা জয়ের ফলে এখন থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির চিন্তাধারা অনুসৃত হবে। কমিউনিস্ট চিন্তা ধারামুক্ত বাংলা গ‍‌ড়ে তোলার পথে যাত্রা শুরু হবে। কেরালায় সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন এলডিএফ’র নির্বাচনী পরাজয়ের পর আনন্দিত প্রধানমন্ত্রী মোদী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন: ভারতের রাজনীতিতে আজ আরও একটি পরিবর্তন হয়েছে। আজ দেশে একটিও রাজ্য নেই যেখানে কমিউনিস্ট সরকার আছে। এটা শুধু একটা ক্ষমতার বদল নয় ভাবনার বদল।
জাতীয় রাজনীতিতে শক্তির নিরিখে বামপন্থীরা নিতান্তই ছোট। কংগ্রেস ছাড়াও এমন অনেক আঞ্চলিক দল আছে সাংসদ-বিধায়ক মিলিয়ে তারা বামেদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। মোদী-শাহদের তাদের নিয়ে মাথাব্যথা নেই। যত দুশ্চিন্তা বামপন্থীদের নিয়েই। ভারত বিজয়ের (হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়) পথে কমিউনিস্টরাই সবচেয়ে বড় বাধা হবে বলে মনে করে ফ্যাসিস্ত ধাঁচের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি। তাই কমিউনিস্টদের সবচেয়ে বেশি ভয় করে তারা।
কেন কমিউনিস্টদের নিয়ে আরএসএস-বিজেপি’র এত ভয়? কমিউনিস্টরা আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতো কোনও দল নয়। একটা সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে কমিউনিস্ট পার্টি। এই দলের নীতি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কোনও ব্যক্তি বা নেতার ব্যক্তিগত ভাবনার উপর নির্ভরশীল নয়। সামাজিক কাঠামো বিন্যাসে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দর্শনকে অনুসরণ করে বামপন্থীরা। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক কার্ল মার্কস এই দর্শনের উদগাতা। মার্কসীয় দর্শন কোনও দেশ-কালের সীমায় আবদ্ধ নয়। এটা সর্বজনীন বিশ্ব মানবিক দর্শন। এই দর্শন বিভেদ বৈষম্যহীন মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও সমতার কথা বলে। মানুষের উপর মানুষের শোষণ ও নিপীড়নের অবসানের কথা বলে। শ্রমজীবী মানুষের সীমাহীন শ্রম শোষণের মাধ্যমে বড়লোক মালিকের সম্পদ ও মুনাফা বৃদ্ধির অসহনীয় নির্মম ব্যবস্থার অবসানের কথা বলে। এই দর্শন শেখায় এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি তার পেছনে রয়েছে মানুষের শ্রম। অথচ যাদের শ্রমে সম্পদ তৈরি হয় তারা সম্পদের ন্যায্য ভাগ পায় না, চলে যায় মুষ্টিমেয় শোষক ও শাসকের হাতে। কমিউনিস্ট মতাদর্শ শ্রমলব্ধ সম্পদের ন্যায্য বণ্টন চায়। অর্থাৎ সমাজ থেকে শ্রমশোষণ নির্মূল করতে চায়। পাশাপাশি ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত ইত্যাদি সামাজিক বিভাজনকে উৎপাটন করে সামাজিক শোষণ-বঞ্চনারও অবসান ঘটাতে। কমিউনিস্টরা ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের  বিষয় বলে মনে করে। কোনও অবস্থাতেই ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি তথা রাষ্ট্রের মিশ্রণ চায় না। রাষ্ট্র যদি ধর্ম পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় তাহলে ভিন্ন ধর্মমত তার অধিকার ও মর্যাদা হারায়।
তাই শ্রেণি ও সামাজিক শোষণ ও নিপীড়ন ভিত্তিক বৈষম্যমূলক সমাজের গর্ভেই জন্ম নেয় শ্রেণি সাম্য ও শোষণমুক্তির কমিউনিস্ট দর্শন। এই দর্শন কোনও এক দেশের জন্য নয়। যেখানেই শ্রেণি শোষণ-নিপীড়ন আছে সেখানেই কমিউনিস্ট দর্শনকে আঁকড়ে ধরে শোষিত ও নিপীড়িত মানুষ।
কোনও এক সময় কোনও রাজ্যে কমিউনিস্ট সরকার ভোটে পরাজিত হলে কমিউনিস্ট দর্শন বা কমিউনিস্ট পার্টি মুছে যায় না। শ্রেণি সংগ্রাম আর গণআন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অতএব মোদী-শাহদের অতি আহ্লাদিত হবার কারণ নেই। আর কমিউনিস্ট দর্শন সমাজের সব মানুষকে নিয়ে কীভাবে অগ্রগতির পথে যায় এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন দেখিয়েছিল। বর্তমানে বিস্ময়কর বিকাশ দেখাচ্ছে চীন। দ্রুত এগচ্ছে ভিয়েতনামও। ধর্ম ও জাত বিভাজন করে হিন্দুত্ববাদীরা কিছুকাল হয়তো ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু সর্বজনীন বিকাশ কোনোদিন হবে না। সেটা করতে পারে একমাত্র কমিউনিস্টরাই।

Comments :0

Login to leave a comment