violence against women

নারীদের ওপর হিংসা রুখতে তৃণমূলের মতো ব্যর্থ বিজেপি-ও, দেখাচ্ছে তথ্য

জাতীয় স্পটলাইট রাজ্য

পূজা বোস

শিয়ালদহ আদালত তুলোধোনা করেছিল সিবিআই-কে। রাজ্যের পুলিশকে অনুসরণ করে তদন্ত চালানোয় খেদ জানিয়েছিলেন বিচারপতি। আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ-খুনের শিকার সেই চিকিৎসক ছাত্রীর প্রসঙ্গ ভোটের আগে তুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু চেপে গিয়েছেন সিবিআই’র প্রসঙ্গ।
এদিন সিউড়ি ও আসানসোলে বিজেপি’র নির্বাচনী জনসভায় মোদী বলেছেন, ‘মহিলাদের মর্যাদা ও সুরক্ষা রক্ষার ভোট এবার’। তিনি বলেছেন, ‘তফসিলি জাতি, আদিবাসী এবং ওবিসি পরিবারের মহিলাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’ 
মোদী রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সফর ঘিরে জটিলতার দায়েও। বলেছেন, ‘আদিবাসী, মহিলা এবং সংবিধানের অবমাননা হয়েছে।’ আর বলেছেন, ‘‘আর জি কর হাসপাতালে ছাত্রীর সঙ্গে কী হয়েছে সবাই দেখেছেন।’
নারী সুরক্ষা এবং মর্যাদায় বিজেপি আদৌ কোনও বিকল্প দিতে পারে কিনা সে প্রশ্ন তুলছেন বামপন্‌থীরা। গুজরাটে বিলকিস বানুর ধর্ষণে দোষীদের জেল থেকে ছাড়িয়ে মালা পরিয়েছিল বিজেপি। উত্তর প্রদেশের হাথরসে দলিত কন্যা হত্যায় অভিযুক্তদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। উন্নাওয়ে আক্রান্ত কিশোরীদর পরিবারের ক্ষোভ, দলের নেতাকে বাঁচাতে বিজেপি সিবিআই তদন্তকেও ভুল পথে চালিত করছে। 
কেবল দেশে তোলপাড় ফেলে দেওয়া একাধিক ঘটনাই নয়। নারীদের মর্যাদা ও সম্ভ্রমের প্রশ্নে বিজেপি’র ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে এনসিআরবি’র তথ্যও। দেশে মোদী সরকার আসীন হওয়ার পর বেড়েছে নারীদের বিরুদ্ধে হিংসা। আর বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি, পশ্চিমবঙ্গের মতোই রয়েছে সামনের সারিতে।  
দেশ জুড়ে মহিলাদের উপর নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে মোদীর মেয়াদে। এনসিআরবি অর্থাৎ ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রেকর্ডে এমনি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই সংস্থা প্রধানত বিভিন্ন রাজ্যের সরকারের থেকেই তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রিপোর্ট পেশ করে থাকে। 
দেশের অন্যান্য রাজ্যের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নারী সুরক্ষা ও তলানিতে ঠেকেছে। মহিলাদের উপর নির্যাতনের কোনও ঘটনা ঘটলে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় যে প্রশাসন সেই সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ করতে বেশিরভাগ সময়ই অস্বীকার করে। চাপের মুখে অভিযোগ গ্রহণ করলেও গোটা ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে সেই প্রশাসনই। একই দায় রয়েছে বিজেপি’র ওপরও।
বৃহস্পতিবার নরেন্দ্র মোদী বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় মহিলা সুরক্ষা নিয়ে একাধিক গালভরা কথা বলেন, কিন্তু আরজিকর কাণ্ডের সময় নির্যাতিতা চিকিৎসকের পরিবার প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখকে করতে চাইলে তাঁরা তাদের সঙ্গে দেখা করেননি। 
এনসিআরবি’র তথ্যে উঠে এসেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলা নির্যাতনের হার সব সবচেয়ে বেশি। রাজ্য পর্যায়ে, ৬৬,৩৮১টি মামলা (জাতীয় মোট সংখ্যার ১৫.৪%) নিয়ে উত্তর প্রদেশ তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এরপরে রয়েছে মহারাষ্ট্র (৪৭,১০১), রাজস্থান (৪৫,৪৫০) এবং মধ্যপ্রদেশ (৩২,৩৪২)। 
হরিয়ানা এবং আসামেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে, ২০২৩ সালে দেশব্যাপী নথিভুক্ত ৪.৩ লক্ষ মামলার অর্ধেকেরও বেশি মামলা বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে নথিভুক্ত হয়েছে।
মহানগরগুলির তথ্যেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। প্রধান শহরগুলিতে নথিভুক্ত হওয়া ৫১,৩৯৩ টি মামলার মধ্যে, শুধুমাত্র দিল্লিতেই প্রায় ২৬% ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী শহর দিল্লিতে সর্বদা দিল্লি পুলিশকে চালায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসের মধ্যে ঘটা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ওড়িশায় সদ্য আসীন হয়েছে বিজেপি। তারপর থেকে বাড়ছে মহিলাদের ওপর নির্যাতন। কিছুদিন আগেই সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তিনজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রায় দু’বছর ধরে ছাত্রীকে নির্যাতন করা চলছিল। নির্যাতিতার মা দাবি করেছেন যে তিনি আগেও এই অশোভন আচরণের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 
বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝির নেতৃত্বে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে ৩৭,৬১১টি অপরাধের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। 
দিল্লির সরিতা বিহারে ২২শে ফেব্রুয়ারি ৩৫ বছর বয়সী এক মহিলা এবং তাঁর ছয় বছরের মেয়েকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ক প্রতিবেশীকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য থেকে আরও জানা গেছে যে, ২০২৬ সালের ১ থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে রাজধানীতে ৮০৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তার মধ্যে ৫০৯ জন মহিলা বা কিশোরী। 
উল্লেখ্য, দলিত নারী ও শিশুদের উপর হিংসা বৃদ্ধি পেয়েছে। এনসিআরবি-র পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দলিত নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের নথিভুক্ত ঘটনা ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন ২০২০ (৭,৩৯৭টি ঘটনা) এবং ২০২১ (১৫,৮৫৫টি ঘটনা)-এর মধ্যে এই ধরনের ঘটনা দ্বিগুণ হয়ে যায়। 
অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে, ২০২০ সালের ১,০৫৫টি এবং ২০২১ সালে ১,২৮৫টি  দলিত নাবালিকা মেয়েদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ২১.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। 
২০২১ সালে এনসিআরবি-র প্রতিবেদনে বলা হয় যে, যেখানে প্রতিদিন ১০ জনেরও বেশি দলিত নারী ও নাবালিকা মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছিল, সেখানে মাত্র ২৪ শতাংশ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

Comments :0

Login to leave a comment