অরুণাচল দত্ত চৌধুরি
ভূমিকা
জনস্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিধিভুক্ত কোনও বিষয় নয়। এটি একটি দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক দর্শনের দর্পণ। ১৮৪৫ সালে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এবং পরবর্তীতে রুডলফ ভিশো স্পষ্ট করেছিলেন যে, অধিকাংশ রোগের মূল কারণ সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যচিত্র সেই ঐতিহাসিক সত্যকেই পুনরায় প্রমাণ করছে। যেখানে স্বাস্থ্য হওয়া উচিত ছিল একটি মৌলিক অধিকার, সেখানে নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির প্রতাপে তা আজ একটি মহার্ঘ্য 'পণ্য’।
পরিকাঠামোগত কঙ্কালসার দশা ও সরকারি উদাসীনতা
ভারতের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ দীর্ঘকাল ধরেই জিডিপি’র মাত্র ১% থেকে ২.১% এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই অর্থিক অনাহার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
শয্যা ও জনবল সঙ্কট: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি হাজার জনসংখ্যায় ৩.৫টি শয্যা থাকা প্রয়োজন হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা মাত্র ১.৫। সারা দেশে প্রায় ৩৫ লক্ষ হাসপাতাল শয্যা এবং ১৯ লক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে।
শূন্যপদ: পশ্চিমবঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৩৫% এবং নার্সিং পদের ২০% শূন্য পড়ে আছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে (PHC ও CHC) এই চিত্র আরও ভয়াবহ, যার ফলে প্রান্তিক মানুষ বাধ্য হয়ে জেলা হাসপাতাল বা কলকাতার মেডিক্যাHল কলেজগুলোতে ভিড় করছেন।
এই শূন্য পদে নিয়োগও যেটুকু পরিস্থিতির চাপে করা হয়, সেখানেও থাকে অদ্ভুত সব নিয়মের ফাঁস।
উদাহরণ দিই একটা। সম্প্রতি কিছু ডাক্তারকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছে জেনারেল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে। একজন এমএস পাশ বন্ড পোস্টিংয়ের প্রার্থী সেখানে সিলেক্টেড। তার সামনে দুটো অপশন। বন্ডের মেয়াদ শেষের আগেই জিডিএমও হিসাবে প্রান্তিক হাসপাতালে নিযুক্ত হওয়া। সেই জিডিএমও হিসাবেই থেকে যাওয়া, কেন না এদের স্পেশালিস্ট(এইক্ষেত্রে সার্জেন) পোস্টে নিযুক্ত হওয়া বা শিক্ষক পদে কোনও মেডিক্যাল কলেজে যুক্ত হবার ন্যূনতম প্রভিশন নেই নিয়মকানুনের ফাঁসে।
আমার পরিচিত এই ডাক্তার বেছে নিয়েছে দ্বিতীয় অপশনটা। সে চাকরিটা নেবে না। সে তো সার্জেন হতে চায়। বন্ড পোস্টিংয়ের শেষে সে তাই ঝাঁপাবে তার সার্জেন হবার স্বপ্ন সমুদ্রে। যে ক্ষেত্রটা স্পষ্টতই বেসরকারি। অর্থাৎ নিয়মের ফাঁসে জড়িয়ে এমন ব্যবস্থা করা হল যাতে ডাক্তার চাকরিতে যোগ না দেয়। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় চাকরি তো দেওয়া হয়েছিল!
হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড নামে একটা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক প্রহসন রয়েছে, যারা প্রচুর পোস্ট গ্রাজুয়েট করা ডাক্তারকে বঞ্চিত করে, প্রভাবশালী ডাক্তারের পোস্টগ্রাজুয়েট না করতে পারা ছেলেকে বেসিক টিচার পদে নিয়োগ দেয় এসএসকেএম’র মতো হাসপাতালে।
রেফারেল ব্যবস্থার বিপর্যয়: প্রাথমিক ও দ্বিতীয় স্তরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তৃতীয় স্তরের (Tertiary) হাসপাতালগুলোর ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে, যা পরিষেবার গুণমানকে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে।
ওষুধের বাজার ও ব্যক্তিগত খরচের বোঝা:
ভারতে স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের মোট খরচের প্রায় ৭০% ব্যয় হয় ওষুধ কিনতে। ২০১৩ সালের পর ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাজারের হাতে চলে যাওয়ায় জীবনদায়ী ওষুধের দাম আজ আকাশছোঁয়া।
আর্থিক বিপর্যয়: পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৮০% হয় আউটপেশেন্ট (Outpatient) বা বহির্বিভাগীয় চিকিৎসায়। এই ক্ষেত্রে কোনও সরকারি সুরক্ষা না থাকায় সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকে (Out-of-Pocket Expenditure) বিপুল টাকা খরচ করতে হয়। এর ফলে বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে দারিদ্রসীমার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
বিমা-নির্ভরতা: জনসেবার নামে কর্পোরেট তোষণ
বর্তমান সরকার 'আয়ুষ্মান ভারত' বা পশ্চিমবঙ্গের 'স্বাস্থ্যসাথী'র মতো বিমা-ভিত্তিক মডেলের ওপর জোর দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি জনকল্যাণমূলক মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে অন্য সমীকরণ:
সরকারি অর্থের বিচ্যুতি: জনগণের করের টাকা সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় না করে বিমা কোম্পানি ও কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর পকেটে চলে যাচ্ছে।
পরিষেবার সীমাবদ্ধতা: এই বিমাগুলো কেবল হাসপাতালে ভর্তি হলেই কার্যকর হয়, কিন্তু চিকিৎসার সিংহভাগ খরচ (ওষুধ ও পরীক্ষা) যা বহির্বিভাগে হয়, তা এর আওতার বাইরেই থেকে যায়।
তথ্যগত অসাম্য: কর্পোরেট হাসপাতালগুলো মুনাফার লোভে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ডেলিভারি বা প্রায় অসম্ভব খরচাবহুল নানান পরীক্ষার দিকে রোগীদের ঠেলে দিচ্ছে, যা এক প্রকার নৈতিক অবক্ষয়।
পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ প্রেক্ষাপট ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
এক সময় পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্যসূচকে প্রথম সারিতে ছিল। বর্তমানে তা শ্রীহীন। নিয়োগ দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ এবং আরজি করের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে যে, স্বাস্থ্য প্রশাসন আজ এক গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত। নিরাপত্তা ও দুর্নীতির কারণে সরকারি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে, যার সরাসরি সুবিধা নিচ্ছে বেসরকারি মুনাফালোভী গোষ্ঠী।
উপসংহার: বিকল্পের দাবি
স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এই তলানি থেকে টেনে তুলতে গেলে বিমা-ভিত্তিক জোড়াতাপ্পির বদলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপি’র অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করা।
ওষুধের দাম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও জেনেরিক ওষুধের প্রসার ঘটানো।
এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলি। যে কোনও ওষুধের মান সুকঠোরভাবে নির্ধারিত করার ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ অসুখে এবং তার কারণে আস্থাহীনতায় ভুগতেই থাকবে। ফার্মা মাফিয়াদের সেটাই উদ্দেশ্য।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের নামে বেসরকারিকরণ বন্ধ করা।
স্বাস্থ্য কোনও করুণা বা দান নয়, এটি বেঁচে থাকার অধিকার। কর্পোরেট মুনাফার গ্রাস থেকে স্বাস্থ্যকে মুক্ত করে একে সর্বজনীন ও বিনামূল্যে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই হোক বর্তমান সময়ের প্রধান অঙ্গীকার।
Comments :0