অবশেষে গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প ‘রেগা’ পাকাপাকিভাবে বাতিল করার ফতোয়া জারি হয়ে গেছে। আগামী ১জুলাই থেকে এই প্রকল্পের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। বামপন্থীদের সমর্থন নির্ভর প্রথম ইউপিএ সরকার কর্তৃক এই রেগা প্রকল্প চালু হবার পর গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যিনি একে গর্ত খোঁড়ার প্রকল্প বলে বিদ্রূপ করেছিলেন আজ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি প্রকল্পটি বাতিল করে বৃত্ত সম্পর্ণ করলেন। গোড়া থেকেই হিন্দুত্ববাদী এবং কর্পোরেট সেবাদাস বিজেপি’র দু’চক্ষের বিষ ছিল রেগা। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করার পর নানাভাবে চেষ্টা করেও প্রকল্পটি গুটিয়ে ফেলতে পারেনি। প্রকল্পের জনপ্রিয়তা এবং গ্রামের গরিব মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হবার ফলে রাজনৈতিক কারণে সরকার ঝুঁকি নেয়নি। তবে গোড়া থেকেই নানা কৌশলে প্রকল্পটি বাতিলের ফন্দি-ফিকির তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছে। বছর বছর বরাদ্দ কমিয়ে, বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কাজের বন্দোবস্ত না করে অকার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে। গোটানোর বা বাতিলের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে করোনা অতিমারীকালের কারণে। সেই সময় প্রায় দু’বছর যখন কোথাও কোনও কাজের সুযোগ ছিল না তখন গ্রাম ভারতের মানুষ বাঁচতে পেরেছিল একমাত্র রেগার কল্যাণে। বস্তুত তখন যদি রেগা না থাকত তাহলে গ্রাম ভারতে গণমড়ক ঠেকানোর কোনও সাধ্য মোদী সরকারের ছিল না। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্য থেকে গ্রামে ফিরে কাজের অভাবে, খাদ্যের অভাবে সপরিবারে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ত। মোদীরা স্বীকার না করলেও বলা যায় গ্রামীণ ভারত গণমৃত্যুতে উজাড় হওয়া থেকে মোদী সরকারকে বাঁচিয়েছে এই রেগাই। আজ মোদীর হাতেই বাতিল হয়ে গেছে সেই রেগা। পুঁজিপতি মালিকদের স্বার্থে ২৯টি শ্রম আইন বাতিল করে যেমন চারটি শ্রমকোড চালু করা হয় শ্রমিক-কর্মচারীদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নিয়ে তেমনি রেগা বাতিল করে ভিবিজি রামজি চালু হয়েছে। শিল্প-বাণিজ্য মালিকদের স্বার্থে গ্রামের গরিব মানুষের রুজির অধিকার কেড়ে নিয়ে।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে গ্রামের মানুষের জন্য কাজের নিশ্চয়তা সহ সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশের জন্য এমন সফল ও সার্থক প্রকল্প অতীতে কোনোদিন ছিল না। চাষের বা অন্যান্য টুকটাক কাজ যখন থাকে না তখন অন্তত ১০০ দিনের কাজ ও মজুরির গ্যারান্টি ছিল রেগা। রেগা কর্মপ্রার্থীদের কাজ পাবার আইনি অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিল। কেউ কাজ চাইলে সরকার কাজ দিতে বাধ্য ছিল। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র অনেকটাই কমে যায়। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে। শিক্ষা, চিকিৎসা সহ অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যয় করার সামর্থ্য বাড়ে গ্রামের মানুষের। রেগার সাফল্য নিয়ে বহু গবেষণাপত্র তৈরি হয় যা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়। আজকাল নগদ টাকা দানের ভাতা প্রকল্পের মতো রেগা ছিল না। রেগা কাজের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কাজের বিনিময়ের উপার্জনের আত্মসম্মান ছিল।
মোদী সরকার রেগা বাতিল করে নতুন প্রকল্প এনে হাজারো প্রযুক্তিগত ও পদ্ধতিগত জটিলতার জাল তৈরি করে অধিকারকে সঙ্কুচিত করেছে। অর্থাৎ মোদী সরকার খরচার দায় কমিয়ে অনেকটা রাজ্যগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে কাজের সুযোগ কমাবার বন্দোবস্ত করেছে। আসলে মানুষকে কম দিয়ে কর্মহীনের সংখ্যা যত বাড়ানো যাবে ততই কম মজুরিতে শিল্প-বাণিজ্যে তাদের খাটানো যাবে। কর্পোরেটকে খুশি রাখতেই বাতিল হয়েছে রেগা। চালু হয়েছে কর্পোরেট স্বার্থবাহী রামজি।
Editorial
ছাঁটাই গ্রামীণ শ্রমজীবীর অধিকার
×
Comments :0