RSS

তৃণমূলের বন্ধু মানুষের শত্রু সঙ্ঘ, বিজেপি বিজেপি-সঙ্ঘ-তৃণমূল বনাম মানুষ

রাজ্য বাংলা বাঁচানোর ভোট স্পটলাইট

আরএসএস কী?

 

বিজেপি আসলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)র রাজনৈতিক শাখা। সঙ্ঘই বিজেপি-কে চালায়। আরএসএসর জন্ম ১৯২৫ সালে। আরএসএস হিন্দুত্ববাদী, ভারতকে পাকিস্তানের মতো একটি ধর্মের রাষ্ট্র বানাতে চায়। প্রথমে জনসঙ্ঘ ও পরে বিজেপি তৈরি করে আরএসএস দেশের ক্ষমতা দখলের অভিযান চালিয়েছে। সঙ্ঘের বহু সংগঠন-নামে এবং বেনামে। কিন্তু লক্ষ্য একভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলা।

 

হিন্দুপ্রেমী নয়, ধনী প্রেমী

 

মুখে হিন্দুদের কথা বললেও আসলে আম্বানি, আদানিদের মতো কর্পোরেটদের স্বার্থে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি। সঙ্ঘ পরিচালিত মোদী জমানায় নতুন ধনী পরিবারের সম্পদ বেড়েছে বিপুল। প্রথম স্থানে রয়েছে মুকেশ আম্বানি গোষ্ঠী। তাঁর সম্পদের পরিমাণ মোদী-জমানায় বেড়ে হয়েছে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে এসেছে সঙ্ঘ-মোদী ঘনিষ্ঠ আদানি গোষ্ঠী। তাঁর সম্পদের পরিমাণ হলো ১৪ লক্ষ কোটি টাকা। 

বার্কলের হুরুন ইন্ডিয়ার এই সমীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে ভারতের ৩০০টি ধনী পরিবারের সম্পদের সম্মিলিত পরিমাণ হলো দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ বা ১৪০ লক্ষ কোটি টাকা। 

এই ৩০০ ধনী পরিবারের ১০০টি হলো প্রথম প্রজন্মের নতুন ধনী পরিবার। সেই নতুন ১০০ পরিবারের সম্পদের পরিমাণ বিপুল হারে বেড়ে হয়েছে ১৩৪ লক্ষ কোটি টাকা। ৩০০ পরিবারের ৭৫ ভাগের সম্পদ বিপুল হারে বেড়েছে গত দুই বছরে। দেশের ধনীর শীর্ষে থাকা ৩০০ পরিবারের হাতে ২০২৪-২৫-এ প্রতিদিন ৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা সম্পদ মজুত হয়েছে।

 

আরএসএস ভোটে দাঁড়ায়!

 

আরএসএস দাবি করে,তারা একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। তারা দাবি করে, নির্বাচনের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু সেই দাবি তাদের প্রকৃত চরিত্রকে আড়াল করার মুখোশ। তাদের কর্মীরা নির্বাচনে বিভিন্ন শক্তির হয়ে প্রচার করে। যেমন এবার ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, ফালাকাটা, নবদ্বীপ, নাকাশিপাড়া, কালিয়াগঞ্জ, ইটাহার, ইসলামপুর, খড়গপুর সদর, সিউড়ি, যাদবপুরের মতো রাজ্যের অনেক কেন্দ্র আছে, যেখানে সঙ্ঘ অথবা তার সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, কর্মী। আবার তৃণমূলেও আছে সঙ্ঘ পরিবারের কর্মী। নির্বাচনে এমন কৌশলে যোগ দেওয়ার পিছনে সঙ্ঘের লক্ষ্য থাকে প্রধানত দুটি। প্রথমত, কমিউনিস্ট সহ বামপন্থীদের দুর্বল করা। দ্বিতীয়ত, সংসদ, বিধানসভার ভিতর থেকে ভারতের সংবিধানের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে বানচাল করা। নিজের নামে ভোটে না দাঁড়ালেও তারাই বিজেপির আসল শক্তি। বিজেপি-ই তাদের রাজনৈতিক মঞ্চ। আমাদের রাজ্যে তৃণমূলের মধ্যে থেকেও তাদের সদস্যরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

 

ধনীরা সঙ্ঘ, বিজেপিকে টাকা দেয়

 

কর্পোরেটরা টাকা ঢালছে বিজেপির তহবিলে। আরএসএস তা সমর্থন করে। মোদী সরকার নির্বাচনী বন্ডের যে নিয়ম চালু করেছিল, যা সুপ্রিম কোর্টে এখন বাতিল হয়ে গেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি টাকা পেয়েছে বিজেপি। নির্বাচনী বন্ড বাদ দিয়েও ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে কোম্পানিগুলির কাছ থেকে বিজেপি পেয়েছে ৬০০০ কোটি টাকার বেশি। কর্পোরেটের মোট রাজনৈতিক চাঁদার ৮৫ শতাংশ পেয়েছে একা বিজেপি। আবার তৃণমূলও সেই বন্ডের মাধ্যমে বিপুল টাকা পেয়েছে।

 

সঙ্ঘ, বিজেপি সব ধর্মের গরিবের বিপদ

 

মোদী-শাসনেই বিশ্ব ক্ষুধা তালিকায় ১২৫টি দেশের মধ্যে ভারত ১০২নম্বরে নেমে এসেছে। 

২০১৭ থেকে ১৬ লক্ষের বেশি মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। 

উচ্ছেদের বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ। (সূত্র: হাউসিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্ক)। এঁদের বেশির ভাগই বস্তিবাসী, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, পরিযায়ী শ্রমিক। 

সরকার নিজে কোনও স্পষ্ট হিসাব দেয় না। কিন্তু বেসরকারি সমীক্ষা সংস্থার (যেমন সিএমআইই) হিসাবে ২০২৩-এর শেষেও বেকারির হার ১০.৮ শতাংশ। আসল হিসাব হচ্ছে, কর্মক্ষম তরুণদের মধ্যে বেকারির হার ২৩ শতাংশ। 

১৫-২৪ বয়সের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ কাজের জগতে রয়েছেন, বাকিরা কাজের বাইরে রয়ে গেছেন। দেখা যাচ্ছে, যত শিক্ষিত তত বেকারির হার বাড়ছে। স্নাতকদের ৪২ শতাংশের বেশি বেকার। 

ভারতে যাঁরা নিয়মিত মজুরি/ বেতন পেয়ে কাজ করেন তাঁদের ৫৮ শতাংশের কাজের কোনও লিখিত চুক্তি নেই অর্থাৎ আইনি নিশ্চয়তা নেই। শহরে বেতন/মজুরিপ্রাপ্তদের ৫৬ শতাংশ এইরকম কর্মী। 

ভারতে এখন ২৩ কোটির ওপরে পরিযায়ী শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের বৃহত্তম অংশে পরিণত হয়েছেন তাঁরা। 

কেন্দ্রীয় সরকার চালু শ্রম আইনগুলিকে বাতিল করে চারটি শ্রম কোড তৈরি করেছে। এই কোডে কাজের সময় বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। 

মোদী বলেছিলেন, কৃষকের আয় দ্বিগুণ করবেন। বাস্তবে কৃষকের গড় আয় নেমে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ২৭ টাকা। 

শহরে মাথার ওপরে নিশ্চিত ছাদ নেই, বস্তিবাসী, কোনোক্রমে থাকেন, এমন মানুষের ঘর তৈরির জন্য দরকার অন্তত ৪ কোটি ঘর। 

 

আরএসএস ফ্যাসিবাদের সমর্থক

 

আরএসএসর প্রতিষ্ঠাতা ও পরে হিন্দু মহাসভারও নেতা মুঞ্জে ১৯৩১ সালের মার্চ মাসে ইতালিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং কীভাবে ফ্যাসিস্তদের মতো সংগঠন বানানো যায় তার পরামর্শ নিয়েছিলেন মুসোলিনির থেকে। 

আরএসএসর গুরুজীগোলওয়ালকর তার উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ডবইতে লিখেছেন : হিন্দুস্তানের বিদেশি জাতিগুলিকে হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষা গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্মকে সম্মান করতে ও শ্রদ্ধা জানাতে শিখতে হবে, হিন্দু জাতি ও হিন্দু সংস্কৃতির মহিমান্বিতকরণ ছাড়া অন্য কোনো ধারণা পোষণ করা চলবে না এবং হিন্দু জাতির সাথে মিশে গিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলীন করতে হবে। তবেই তারা এই দেশে থাকতে পারবে, কিন্তু থাকতে হবে হিন্দু জাতির অধীনস্ত হয়ে, কোনও কিছু দাবি না করে, কোনও বিশেষ সুবিধা বা অধিকারের দাবি না করে, এমনকি নাগরিক অধিকারও দাবি না করে।অর্থাৎ বাকি সবাইকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে। এটি হিটলার, মুসোলিনির ভাবনা।

 

দাঙ্গা এবং সঙ্ঘ

 

দেশ স্বাধীন হবার আগেই ১৯৪০-র দশকে একাধিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত করেছিল আরএসএস। বিশেষ করে উত্তর ভারতে। দেশভাগের সময়ে অবিভক্ত বাংলা ও পাঞ্জাবে রক্তাক্ত ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল। বাংলায় সঙ্ঘ ও হিন্দু মহাসভা এবং পাঞ্জাবে সরাসরি আরএসএস এই দাঙ্গায় অংশ নিয়েছিল। একদিকে মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি, অন্যদিকে সঙ্ঘের পরিচালনায় দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৪৮-র ৩০শে জানুয়ারি গান্ধীজীকে হত্যা করে হিন্দু মহাসভা ও সঙ্ঘের কর্মী নাথুরাম গডসে। এই হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তে যুক্ত ছিলেন সঙ্ঘের নেতারাও। ১৯৪৮-র ৪ ফেব্রুয়ারি সরকার আরএসএস-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেছিল : সঙ্ঘের আপত্তিকর ও ক্ষতিকর কার্যকলাপ অব্যাহত থেকেছে এবং সঙ্ঘের কার্যকলাপের মদতে ও অনুপ্রেরণায় হিংসার যে ধারা গড়ে উঠেছে তার শিকার হয়েছেন বহু মানুষ। সর্বশেষ এবং সবচেয়ে মূল্যবান শিকার হলেন গান্ধীজী নিজেই। 

পশ্চিমবঙ্গে সঙ্ঘ, বিজেপি শক্তি বাড়ানোর সুযোগ পাওয়ায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে অনেকগুলি। 

 

ভারতমাতা কী জয়

 

স্বাধীনতার আগে সঙ্ঘ ব্রিটিশের সেবা করতো। এখন দুনিয়া জুড়ে স্কুলে, হাসপাতালে বোমা ফেলা, অন্য দেশের রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক নিজের দেশে অপহরণ করে নিয়ে আসা আমেরিকার সেবা করে। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রপতির অনুমতিনিতে হয়েছে। মার্কিন চাপের মুখে অসম বাণিজ্য চুক্তি করে দেশের অর্থনীতিকে মার্কিনীদের কাছে বিক্রি করে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে। শুধু সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতিস্বীকারই নয়, দেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন চার দেশীয় কোয়াডজোটে ভারতকে শরিক করেছেন মোদী। ভারত মহাসাগরে মার্কিন দাপাদাপি মেনে নেওয়া, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুরে কথা বলার অভ্যাস ভারতকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আবার ইজরায়েলের কট্টর জায়নবাদী, হামলাবাজ শাসকেরও বন্ধু বিজেপি, সঙ্ঘ। কারণ, নেতানেয়াহু আর সঙ্ঘের দর্শন এক। প্যালেস্তাইনে গণহত্যার সময়েও ইজরায়েলের নিন্দা করার সাহস দেখাননি তিনি। বরং গণহত্যাকারী ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়িয়েছেন। ইজরায়েলে গিয়ে সে-দেশের ঘৃণিত প্রধানমন্ত্রী নেতানেয়াহুকে জড়িয়ে ধরেছেন। দুদিন পরেই সেই ইজরায়েল ইরান আক্রমণ করেছে। তারও নিন্দা করেননি মোদী। ভারতেরই আমন্ত্রণে মহড়ার জন্য ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ ভারতে এসেছিল। ফেরার সময়ে মার্কিন টর্পেডো তাকে ধ্বংস করে। তারও নিন্দা করতে পারেননি মোদী।

 

বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি

 

সঙ্ঘ, বিজেপি সারা দেশে একটিই ভাষা চায় হিন্দি। অন্য কোনও ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধী তারা। সম্প্রতি বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলায় কথা বলার জন্য শ্রমিকদের মারধর করেছে সঙ্ঘ পরিবারের কর্মীরা। 

 

আরএসএসর অপপ্রচার এবং বাস্তবতা:

 

মুসলিমরা বাড়ছে?

 

সঙ্ঘ পরিবার প্রচার করে মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বাড়ছে যে তা অচিরেই হিন্দুদের থেকে বেশি হয়ে যাবে। বাস্তবে গত ৪০ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হিন্দুদের কমেছে ৬%, মুসলিমদের কমেছে ৯%। ২০০১-র তুলনায় ২০১১-তে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ১৮ কোটি ২০লক্ষ প্রায়। তার মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩ কোটির বেশি। মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েছে ৪কোটির কম। সন্তান সম্ভাবনার হার (ফার্টিলিটি রেট) সব ধর্মেই কমেছে। সর্বশেষ হিসাবে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা দাঁড়িয়েছে ২.১, মুসলিমদের ক্ষেত্রে ২.৬, খ্রিস্টানদের ২। ২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী হিন্দুরা জনসংখ্যার ৭৯%, মুসলিমরা ১৪%। পারসিরা ছাড়া সব ধর্মেরই জনসংখ্যা বেড়েছে কিন্তু জন্মহার কমেছে।

দুই ধর্মের মানুষের মধ্যেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে। হিন্দুদের ক্ষেত্রে প্রায় ৩%, মুসলমানদের ক্ষেত্রে কমছে প্রায় ৫% হারে।

ফলে মুসলমানরা দারুণ বাড়ছে এই বক্তব্য অঙ্ক, যুক্তির হিসাবে দাঁড়াচ্ছে না। বরং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মুসলমানরাও অনেকটা সচেতন হয়ে উঠছেন, তা রিপোর্ট জানাচ্ছে। 

 

অনুপ্রবেশ:

 

অনুপ্রবেশ নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোও ঘৃণার অভিযানের অংশ। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে ৯৯% ভারতীয় নাগরিক এদেশেই জন্মেছেন। ভারতে যতজন বাইরে থেকে আসছেন তার তিনগুণ দেশ ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এসআইআর-এ দেখা গেছে অনুপ্রবেশের ভাষ্য ধোপে টেকেনি, যাদের নাম বাদ গেছে তাদের বড় অংশই হিন্দু।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস ছিল না

 

দেশকে ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে স্বাধীন করতে কোটি কোটি ভারতবাসী সর্বস্ব ত্যাগ করলেও হিন্দু মহাসভা বা আরএসএস সেই লড়াইয়ে কোনো ভূমিকা পালন করেনি। সাভারকর বন্দি অবস্থায় মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান। সাভারকর দীর্ঘদিন ব্রিটিশের পেনশনও নিয়েছেন। তারপর হিন্দু মহাসভা গঠনের পরে কখনও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেননি। গোলওয়ালকারও সেই পথ ধরেই বলেছিলেন, হিন্দুদের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে শক্তিক্ষয় করার প্রয়োজন নেই। উলটে গোলওয়ালকার মুসলিম, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্টদেরই দেশের বিপদ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এমনকি নেতাজী যখন সবাইকে এক হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন, তখনও আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভা তা প্রত্যাখ্যান করে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিও ব্রিটিশ বিরোধী কোনও আন্দোলনে অংশ নিয়ে লাঠি-গুলির মুখোমুখি হননি, জেলেও যাননি। এরা ছিল বিশ্বাসঘাতক। 

 

মুসলিম লিগের বন্ধু

 

হিন্দু মহাসভা- আরএসএসর মতো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি মুসলিম লিগের মতই ব্রিটিশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নীতিকে সমর্থন করতো। হিন্দু মহাসভার নেতা সাভারকরই প্রথম দ্বিজাতি তত্ত্বের কথা বলেন। পরে মুসলিম লিগ লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তানের দাবি তোলার মধ্য দিয়ে সেই একই দাবি করে। জামাতে ইসলামির স্রষ্টা সইয়াদ আবু আলা মৌদুদী আরএসএসর হিন্দুরাষ্ট্রতৈরির লক্ষ্যকে প্রবল সমর্থন করেছিলেন। কারণ, ভারতও পাকিস্তানের মতো দেশ হোক, মৌদুদি চাইতেন। মুসলিম লিগ এবং হিন্দু মহাসভা প্রকাশ্যে একে অপরের প্রবল বিরোধিতা করলেও ১৯৩৯ সালে মুসলিম লিগের সঙ্গে জোট গড়ে সিন্ধ এবং উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রদেশে সরকার গড়ে হিন্দু মহাসভা। বাংলাতেও ফজলুল হকের সঙ্গে সরকার গড়েন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। যে ফজলুল হক মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাবউত্থাপন করেছিলেন। সেই সরকারের মন্ত্রী হিসাবেই শ্যামাপ্রসাদ বাংলার গভর্নরকে চিঠি লিখেছিলেন ভারত ছাড়ো আন্দোলন দমন করার জন্য।

 

আরএসএস-বিজেপি আদিবাসী

তফসিলি জাতি, দলিতদের বিরোধী

 

আরএসএস জাত কাঠামো ভাঙতে চায় না। আদিবাসীদের তারা দেশের আদি বাসিন্দা মনে করে না। বলে বনবাসী। আর্যরা বাইরে থেকে এসেছে, এই ইতিহাস তারা পালটাতে চায়। আরএসএস-বিজেপি তাই সংরক্ষণ বিরোধী। ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিং মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করে ওবিসি সংরক্ষণ সুনিশ্চিত করলে আরএসএস-বিজেপি এর তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করে। এরপরেও আরএসএস-বিজেপি নেতারা বারে বারে সংরক্ষণের বিরোধিতা করেছে। বিহারে আরজেডি-জেডি(ইউ) সরকার জাতভিত্তিক সমীক্ষা প্রকাশ করার পরে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তীব্র আক্রমণ করেছিলেন বিরোধীদের। জাতভিত্তিক জনগণনারও লাগাতার বিরোধিতা করেছেন মোদী। কিন্তু বিহার ভোটের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত জাতগণনার কথা বলেছেন। যদিও তার প্রকৃত চিত্রটি স্পষ্ট নয়। 

শেষ এক দশকের বেশি সময়ে দেশে মোদী সরকারের সময়ে তফসিলি জাতি, আদিবাসীদের উপরে নিপীড়ন বহুগুন বেড়েছে। এনসিআরবি-র রিপোর্ট অনুসারে শুধুমাত্র নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যাই ২০১৫ সালের ৪৫হাজার থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৭০ হাজারের বেশি হয়ে গেছে। নথিভুক্ত হয়নি এমন ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি। তফসিলি জাতিভুক্তদের উপরে নিপীড়ন বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৯শতাংশের বেশি। আদিবাসীদের উপরে নিপীড়ন বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুনের বেশি। এই ঘটনাগুলির ৯৭-৯৮শতাংশই ঘটেছে ১৩টি রাজ্যে। যার মধ্যে শীর্ষে আছে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, মহারাষ্ট্র। যা দীর্ঘ সময় ধরে বিজেপি ও বিজেপি সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত। দেশজুড়ে আকছার এমন ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে আরএসএস-বিজেপি নেতারা দলিত-আদিবাসীদের মুখে-গায়ে প্রস্রাব করছে বা তাদের থুতু-প্রস্রাব চাটতে বাধ্য করছে। জমি দখল, পিটিয়ে হত্যা, আদিবাসী-দলিত মেয়েদের ধর্ষণ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। অরন্যের অধিকার আইন লঘু করে দিয়েও কর্পোরেট স্বার্থে অবাধে আধিবাসীদের জমি দখল করা হচ্ছে তাদের জমি-জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ করে।

 

আরএসএস-বিজেপি গণতন্ত্র বিরোধী

 

সঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের বর্তমান সাধারণতন্ত্রের বদলে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়। তার চায় একচ্ছত্র কর্তৃত্ব। 

পার্লামেন্টকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে বিজেপি। ২০১৪ থেকে ২০১৯ লোকসভা বসেছে ৩৩১ দিন, বছরে গড় ৬৬ দিন। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্বে ২৭৪ দিন। স্বাধীনতার পরে সবচেয়ে কম। বছরে গড়ে ৫৫ দিন। ২০২৫-এ বসেছে ৬২ দিন। লোকসভার অধিবেশন বসলেও সেখানে সরকারপক্ষই অর্ধেক দিন ভণ্ডুল করে দিচ্ছে, কোনও বিল নিয়ে বিশদ আলোচনা হচ্ছে না। সংসদীয় কমিটিতে বিল পরীক্ষার পদ্ধতি উঠে যেতে বসেছে। ষোড়শ লোসভায় ২৭% বিল কমিটিতে গেছে, সপ্তদশ লোকসভায় মাত্র ১৭%। 

 

দখলে নির্বাচন কমিশন

 

নির্বাচন কমিশন গঠনের নিয়ম বদলে ফেলা হয়েছে মোদী-শাসনে। আগে নিয়ম ছিল প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও প্রধান বিচারপতির কমিটি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বাছাই করবেন। বিজেপি সরকার প্রধান বিচারপতিকে এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে আরো একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে এই কমিটিতে যুক্ত করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রয়েছেন। অর্থাৎ সব সময়েই সরকার তার নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে কমিশনের মাথায় বসাবে। 

আরএসএসর অ্যাজেন্ডা এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করে ভোটার তালিকা থেকে প্রচুর নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। নাম বাদ দেওয়া বা ভোটার তালিকায় বিবেচনাধীনকরে নাগরিকত্বকে জুড়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘু, তফসিলি, আদিবাসী, মহিলা, বিশেষ করে গরিব ও প্রান্তিক মানুষ। এছাড়াও, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, বিহারের ভোটে প্রদত্ত ভোট ও গণনা করা ভোটের হিসাব মেলেনি। ভোট চুরির অভিযোগ জোরালো ভাবেই উঠেছে।

 

 

 

Comments :0

Login to leave a comment