প্রতীম দে
নির্বাচনী উত্তাপের পারদ এখন চরমে। মাসব্যাপী প্রচার, রাজনৈতিক তরজা এবং ভোটগ্রহণ পর্ব সমাপ্ত হওয়ার পর এখন সকলের নজর গণনা কেন্দ্রগুলির দিকে।
কিন্তু ফলাফল ঘোষণার এই চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে গণনাকেন্দ্র লুট, এজেন্টদের মারধর এবং ব্যাপক কারচুপি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অতীত তাই বলছে।
ফলে বামপন্থী নেতৃবৃন্দের বার্তা হলো, ‘লড়াইয়ের শেষ ল্যাপে, যে কোন মূল্যে সতর্ক থাকতে হবে গণনাকেন্দ্রে’।
অতীতে দেখা গিয়েছে বিরোধী এজেন্টদের ভিতরে ঢুকতে না দিয়ে গোটা গণনা কেন্দ্রের দখল নিয়েছে তৃণমূল। যেমন ত্রিপুরায় ভোট লুট করে বিজেপি। বদলে দেওয়া হয় নির্বাচনী ফলাফল। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব গণনা কেন্দ্র সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নির্বাচনে কেন্দ্রের সরকারে আসীন বিজেপি’র হয়ে কাজ করেছে। হরিয়ানা, দিল্লি বা মহারাষ্ট্রের নির্বাচনে অভিযোগ স্পষ্ট। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়নি। যার অন্যতম এসআইআর প্রক্রিয়ার মাঝ পর্বে এসে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপান্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির মাপকাঠি হাজির করা। ফলে এরাজ্যে বিজেপি বাদে বিরোধী অন্য দলের আপত্তিতে কমিশন কতটা সক্রিয় হবে সে প্রশ্ন জোরালো।
সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম লোকসভা নির্বাচনের পর বলেছিলেন, আই-প্যাকের লোক ঢুকিয়ে গণনা কেন্দ্র লুঠ করেছে তৃণমূল। এবার দ্বিতীয় দফার ভোট মিটে যাওয়ার পর তিনি সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। কমিশনের কাছে দাবি তুলেছেন যে গণনা কেন্দ্র যাতে দখল না হয়ে যায় তা দেখতে হবে।
বিরোধী দলের কাউন্টিং এজেন্টদের ভয় দেখিয়ে এবং জোর করে গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বার বার। অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের পরিচয়পত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া রাউন্ড শেষের পর সঠিক তথ্য না দেওয়া, ইভিএমের সিল ভাঙা থাকা বা পোস্টাল ব্যালট গণনায় অস্বচ্ছতার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
যে কোনও নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটগ্রহণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভোট গণনা ঠিক ততটাই সংবেদনশীল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি হলো দৌড় প্রতিযোগিতার ফাইনাল ‘ল্যাপ‘। সারা বছর ধরে যে রাজনৈতিক লড়াই করা হয়, তার চূড়ান্ত রায় সুরক্ষিত করার সময় এটাই। জনসমর্থন হারিয়ে শাসকদল এখন পুরোপুরি প্রশাসন ও পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে সামান্যতম অসতর্কতা বা ঢিলেমি দেখালে মানুষের গণতান্ত্রিক রায় ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। তাই এই 'শেষ ল্যাপে' মাটি কামড়ে পড়ে থাকাটা প্রয়োজনীয়।
বলে রাখা ভালো গণনা কেন্দ্রে তৃণমূল নির্দলের এজেন্ট নিয়ে গিয়ে ভিড় বাড়ায়। সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী এজেন্টদের বসার জায়গা তারা দখল করে নেয়। গণনা শুরু হওয়ার আগেই এমন উত্তেজনা তৈরি করে যাতে মানসিক ভাবে চাপে পড়েন বিরোধী প্রার্থীর এজেন্টরা।
এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে ভোট লুট আটকাতে হবে। সে কারণেই কয়েকটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন বামপন্থী নেতৃবৃন্দ।
মাঠ না ছাড়া: কোনও অবস্থাতেই গণনাকেন্দ্র ছেড়ে যাওয়া চলবে না। ভয় দেখালেও টেবিল আঁকড়ে বসে থাকতে হবে।
হিসাব মেলানো: প্রতিটি রাউন্ডের শেষে রিটার্নিং অফিসারের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে নিজেদের কাছে থাকা ফর্ম ১৭সি (Form 17C) অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দেখতে হবে।
লিখিত অভিযোগ: সামান্যতম অসঙ্গতি বা কারচুপির সন্দেহ হলে মৌখিক অভিযোগের পাশাপাশি অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হবে এবং প্রয়োজনে পুনর্গণনার দাবি জানাতে হবে।
Comments :0