ইরানে আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার জেরে অশান্ত পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরার আগেই আচমকা তেল রপ্তানিকারী দেশগুলির সংস্থা ওপেক-এর সদস্যপদ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে সংযুক্ত আরব আমীরশাহি। বস্তুত আজ (১ মে) থেকেই তারা ওপেক-এর উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ শৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন ও বিক্রি করবে। তেল বিশ্বে ওপেক-এর প্রভাব-প্রতিপত্তিতে এই সিদ্ধান্ত ঠিক কতটা ধাক্কা দিতে পারবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সংযুক্ত আরব (ইউএই) মনে করছে বকলমে সৌদি আরব নিয়ন্ত্রিত ওপেক-এ তাদের আর্থিক স্বার্থ খর্ব হচ্ছে। ওপেক সদস্যরা নির্দিষ্ট করে দেওয়া পরিমাণের বেশি উৎপাদন করতে পারে না। ইউএই চাইছে অনেক বেশি তেল উৎপাদন করতে এবং সেটা বিক্রি করে বেশি আয় করতে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা আছে তাদের।
সদস্যপদ ছাড়ার পেছনে এমন অর্থনৈতিক কারণ বলা হলেও রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কারণও আছে। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধে ইরানের বাইরে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সংযুক্ত আরবের। এই অঞ্চলে যে সব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে এবং ইরানে হামলার জন্য যে সব দেশে থাকা ঘাঁটি সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে সে সব দেশে ইরান পালটা হামলা বেশি করেছে। এটাও ঠিক বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমেরিকার সঙ্গে নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠতা অনেক বেশি বাড়িয়েছে। এখন ইজরায়েলের সঙ্গেও অন্য যে কোনও দেশের থেকে সংযুক্ত আরবের সম্পর্ক ঘনিষ্ট হয়েছে। বস্তুত আরব দুনিয়ার চিরাচরিত জায়নবাদ বিরোধিতার বলয় থেকে ক্রমশ বেরিয়ে সংযুক্ত আরব জায়নবাদীদের ঘনিষ্ট মিত্র হবার পথে পা বাড়িয়েছে। লক্ষণীয় এই পর্যায়ে মোদীর নেতৃত্বে ভারতও ধাপে ধাপে অবস্থান বদলে ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করেছে। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে ইউএই’র সম্পর্কেও ঘনিষ্টতা বেড়েছে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কৌশলই ছিল পশ্চিম এশিয়া তথা আরব দুনিয়ার তেল সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং ইজরায়েলকে এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে ইজরায়েলের সঙ্গে এই অঞ্চলের দেশগুলির বিরোধ শূন্যে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্যেই শিয়া-শুন্নি বিরোধ উসকে ইরানের সঙ্গে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলি স্থায়ী শত্রুতা তৈরি করার ব্যবস্থা হয়। ইরানকে ভয় দেখিয়ে সৌদি আরব সহ এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরি হয় এবং তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া। তাতে এই সব দেশকে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। তাই প্যালেস্তাইনের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের ধারাবাহিক আগ্রাসনে এই দেশগুলি নীরব থাকে।
অন্যদিকে তেলের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেশি রাখার ওপেক কৌশল পছন্দ নয় আমেরিকার। তাই বেশ কয়েক বছর ধরে ওপেক-এর মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে নড়বড়ে করে দেবার চেষ্টা চলছে। ওপেক-কে ভাঙতে পারলে তেল বিশ্বে একচ্ছত্র অধিপতি হবে আমেরিকা। ইরানের যুদ্ধের পেছনে এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যও ছিল আমেরিকার। কিন্তু ইরানের প্রত্যাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ওমান, কুয়েত, জর্ডন, সংযুক্ত আরব দেখেছে তাদের রক্ষা করতে আমেরিকা কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। কেবল ইজরায়েলকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরেছে এই দেশগুলির। এমন অস্থিরতার আবহে আমেরিকা সংযুক্ত আরবকে উসকে দিয়েছে। ওপেক-কে দুর্বল করার কাজে। অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার নতুন এক অভিমুখ খুলে দিয়েছে আমেরিকা।
OPEC SHOCK
ওপেক-এ ধাক্কা
×
Comments :0