RG Kar Case

আরজি কর: সিবিআই-পুলিশের যৌথ ষড়যন্ত্র

রাজ্য স্পটলাইট

আরজি কর হাসপাতাল থেকে অভয়ার দেহ তৃণমূল ও পুলিশ লোপাট করতে পারেনি বামপন্থী ছাত্র-যুব-মহিলা কর্মীদের বাধায়। প্রকৃত তদন্তের স্বার্থেই দেহ আটকাতে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই রাতেই গোপনে পুলিশ ও তৃণমূল অভয়ার মরদেহ দাহ করে দিয়েছিল পানিহাটি শ্মশানে। 

তারপরের ঘটনাক্রম

 ‘‘আরজি করের ঘটনা মোকাবিলায় রাজ্য সরকার যে পদক্ষেপ করবে তাতে তাঁদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।’’ মোহন ভাগবত, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪।
 ৭ আগস্ট, ২০২৫। অমিত শাহ দেখা করেননি। দিল্লিতে গিয়ে সন্তানহারা বাবা-মা সাক্ষাতের চেষ্টা করলে কোনও কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী দেখা করেননি তাঁদের সঙ্গে।
 ঘটনার এক বছরের মাথায় একমাত্র চিকিৎসক কন্যার ধর্ষণ-খুনের তদন্তের অগ্রগতি জানতে সিবিআই’র সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন বাবা-মা। সিবিআই’র অধিকর্তা, যুগ্ম অধিকর্তা, আইজি এবং আরজি করের ঘটনার তদন্তকারী আধিকারিক সীমা পাহাজার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে আসার পরেই ক্ষোভ উগরে দিলেন বাবা। বলেছিলেন,‘‘বেকার এরা সব! কলকাতা থেকে দিল্লির যে খরচ হয়েছে সেই টাকাও নষ্ট হলো। কোনও কিছু এরা আর করবে না। সময়, পরিশ্রম সব নষ্ট হলো। সিবিআই’র কোনও মেরুদণ্ড নেই। ওরা শুধু আমাদের বোঝাতে চাইছে, গোটা ঘটনায় কেবলমাত্র ওই সিভিক ভলান্টিয়ারই যুক্ত, আর কেউ নয়। ওরা বলছে ওদের কাছে কোনও এভিডেন্স বা প্রমাণ নেই। তা প্রমাণ কী আমরা বাড়ি থেকে জোগাড় করে আনবো?’’
 ‘‘আরজি করের মামলায় কলকাতা পুলিশের তদন্তকেই কেবল অন্ধভাবে অনুসরণ করে গেছে সিবিআই।’’ পর্যবেক্ষণ আদালতের। 
 ৫০ নম্বর সাক্ষী ছিলেন সিবিআই’র তদন্তকারী আধিকারিক সীমা পাহাজা। তিনি কলকাতা পুলিশের তৎকালীন কমিশনার বিনীত গোয়েলের ব্যাচমেট। তিনি আদালতে দাবি করেন কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়ই একমাত্র অভিযুক্ত ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায়। তৃণমূল, কলকাতা পুলিশেরও একই দাবি ছিল।
 ওই সিবিআই আধিকারিক আদালতে জানিয়েছিলেন কলকাতা পুলিশের থেকে পাওয়া তথ্য, নথির ভিত্তিতই তিনি তদন্ত চালিয়েছেন। তিনি কোনও অভিযুক্তের আঙুলের ছাপ নেননি, এমনকি অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়ের উদ্ধার হওয়া ছেঁড়া ব্লু টুথ হেডফোনেও আঙুল ছাপ মিলিয়ে দেখেননি। এমনকি তদন্তকারী আধিকারিক হিসাবে তিনি হাসপাতালের কোনও নার্সিং স্টাফ, গ্রুপ ডি স্টাফ, আয়াকেও জেরা পর্যন্ত করেননি। 
 ২০২৪-এর ৯ আগস্ট রাতে কেন অতি তৎপর হয়ে পুলিশ দেহ দখল করে বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়াই সোদপুরের বাড়িতে নিয়ে যায়, বাবা-মা’র সম্মতি ছাড়াও দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের কোনও সুযোগ না রেখেই তৎপর হয়ে শাসক তৃণমূলের দ্রুত সৎকার করা হলো, তা  ‘তথ্য প্রমাণ লোপাট’ হিসাবে গণ্যই করেনি সিবিআই। 
 কেন সকালে দেহ উদ্ধার হওয়ার পরে রাতে এফআইআর নেওয়া হলো, কেন বাবা-মাকে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখেও দেখতে দেওয়া হয়নি দেহ, তা আদালতে জানালেও চার্জশিটে উল্লেখ করেনি সিবিআই।
 সিএফএসএল রিপোর্ট ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিল সেমিনার রুমে এবং পোডিয়ামে আরজি করের পড়ুয়া চিকিৎসকের সঙ্গে ধর্ষকের ধস্তাধস্তির কোনও প্রমাণ মেলেনি। ‘সামনেই নার্সিং স্টেশন রয়েছে যেখানে ২৪ x ৭ নার্স কিংবা হাসপাতালের স্টাফরা থাকেন, তা পেরিয়েই সেমিনার রুমে ঢুকে এত বড় অপরাধ সংগঠিত করল সকলের অগোচরে তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে’- তাও বলেছিল সিএফএসএল। সিবিআই’র চার্জশিটে তেমন কিছু নেই। 
 মুখ্যমন্ত্রী সেই ঘটনা তিনদিনের মাথাতেই গোটা ঘটনায় অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষকে সেখান থেকে সরিয়ে আরেকটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অধ্যক্ষের পদেই প্রাইজ পোস্টিং দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। তথ্য প্রমাণ লোপাটের গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া আরজি কর হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ, টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডল জামিন পেয়ে যান সিবিআই ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে না পারায়।
 সিবিআই আদালতে জানায় সন্দীপ ঘোষ ও টালা থানার ওসির ফোনের কল রেকর্ড খতিয়ে দেখে জানা গেছে তাদের মধ্যে একাধিকবার কথা হয়েছিল। সন্দীপ ঘোষের ফোনে সেদিন একাধিক রহস্যময় ফোন এসেছিল। তাঁরা কারা? আদালতে এত কিছু জানালেও দ্বিতীয় দফায় চার্জশিট দিতে পারেনি সিবিআই। 
 কেন দেহ উদ্ধারের পরেও তা কর্ডন করা হয়নি নিয়ম মেনে, সকালে উদ্ধারের পরে রাত পৌনে বারোটায় কেন এফআইআর নেওয়া হলো? কেন ঘটনাস্থলের ভিডিওগ্রাফিও করা হয়নি, ক্রাইম সিন থেকে যা যা সংগ্রহ করা হয় বা সিল করা হয় তা ভিডিওগ্রাফি করার সময়েও নিময় মানা হয়নি? 
 মেয়ের মৃতদেহ বাড়িতে থাকা অবস্থায় কেন কলকাতা পুলিশের উচ্চ পদস্থ আধিকারিক ঘটনার পরে বাড়িতে গিয়ে  বাবা-মাকে টাকার বিনিময়ে গোটা ঘটনা মিটিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল? বাবা-মা’কে কিনে নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল কে? 
 ২০২৪’র ৯ আগস্ট সকালে সেমিনার রুমে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকা পড়ুয়া-চিকিৎসকের দেহের কয়েক ফুট দূরত্বে বহিরাগতদের প্রায় মেলার মতো ভিড় করে থাকার যে ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছিল, তাকে ধরে কেন তদন্তই করল না? সাতসকালেই মালদহ, বর্ধমান থেকে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ  সব চিকিৎসকরা চলে এসেছিলেন চার তলার সেমিনার রুমে। পরিকল্পিতভাবে ক্রাইম সিন নষ্ট করা হলো। ফুটেজে লাল জামা পরা এক ব্যক্তিকে দেখায় যায়। কলকাতা পুলিশ তাঁকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞ বলে চালিয়ে দিয়েছিল। পরে জানা যায়, লালা জামা পরা ব্যক্তির নাম অভীক দে, তৃণমূলের চিকিৎসক নেতা, এসএসকেএম হাসপাতালের পিজিটি! 
 সেই রাতে কেন অতি তৎপর হয়ে পুলিশ দেহ দখল করে বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়াই সোদপুরের বাড়িতে নিয়ে যায়, বাবা-মা’র সম্মতি ছাড়াও দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের কোনও সুযোগ না রেখেই তৎপর হয়ে শাসক তৃণমূলের নেতাদের উদ্যোগে দ্রুত সৎকার করা হলো, তাও  ‘তথ্য প্রমাণ লোপাট’ হিসাবেও কেন গণ্য করল না সিবিআই?
 দিল্লি এইমসের ফরেন্সিক মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ ডাঃ আদর্শ কুমারের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল তৈরি হয়েছিল। সেই বোর্ড জানিয়েছিল নির্যাতিতার শরীরে যে সমস্ত আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে, মৃত্যুর আগেই সেই আঘাত করা হয়েছে। সিভিকের দেহে যে ক্ষত চিহ্ন দেখা গিয়েছিল তা নির্যাতিতার প্রতিরোধেরই চিহ্ন। পড়ুয়া চিকিৎসকের সঙ্গে অভিযুক্তের শারীরিক ধস্তাধস্তি হয়। আর সিএফএসএলের রিপোর্ট বলছে চারতলার সেমিনার রুমে এমন ঘটনা ঘটার কোনও প্রমাণ বা চিহ্ন মেলেনি। তাহলে কোথায় হলো? 
 সেদিন সিসিটিভি ক্যামেরায় রাতে হাসপাতালের চারতলায় ৬৮ জনের যাতায়াত দেখা গেছে।  এদের চিহ্নিত করা হয়েছিল কী? ডিএনএ-তে একাধিক জনের নমুনা মিলেছিল। তা কি বিকৃত করা হয়েছিল? যদি না হয় তাহলে সেদিন সেখানে উপস্থিত সবার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছিল কী? 
 ২০২৫-এর ৪ নভেম্বর সিবিআই আদালতে জানায়,‘‘সঞ্জয় রায়ের বিরুদ্ধে বায়োলজিক্যাল তথ্য প্রমাণ মিলেছে তাই প্রথম দফার চার্জশিট নাম যুক্ত করা হয়েছিল। তার অর্থ এই নয় যে আর কেউ যুক্ত নয়।’’ আবার সেই সিবিআই ১৩ ডিসেম্বরে আদালতে ৯০ দিন পেরিয়ে গেলেও ‘যথেষ্ট প্রমাণ’ না থাকায় দ্বিতীয় চার্জশিট দিতে না পারার কথা জানিয়েছেন।

Comments :0

Login to leave a comment