ধাপে ধাপে একাধিক স্তরে অযৌক্তিক, অবাস্তব এবং ত্রুটিপূর্ণ ছাঁকনি ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লক্ষ নাম ছেঁটে ফেলে এ রাজ্যে হতে চলেছে বিধানসভা নির্বাচন। অর্থাৎ ২০২৪ সালে যাদের ভোটে হয়েছিল লোকসভা নির্বাচন এবং যাদের ভোটে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে গঠিত হয় আরএসএস-বিজেপি’র সরকার সেই ভোটারদের থেকে ৯১ লক্ষকে বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা করে দিয়েছে মোদী সরকারের গড়ে দেওয়া নির্বাচন কমিশন। মোদীকে ক্ষমতায় বসানোর নির্বাচনে যারা বৈধ ভোটার ছিলেন ক্ষমতায় বসেই মোদীরা তাদের ৯১ লক্ষকে অবৈধ করে দিলেন। আজ যাদের অবৈধ করা হলো তারা যদি সত্যি সত্যি অবৈধ হয় তাহলে সেই অবৈধদের ভোটে জেতা মোদী সরকার বৈধ হয় কিভাবে?
প্রজাতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্রে দেশের মানুষ তথা নাগরিকরাই মুখ্য। ভোটদান নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। কোনও সরকার বা সংস্থা সেই অধিকার কাড়তে পারে না। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন, স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা। তাদের কাজ নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। একজন নাগরিকও যদি ভোট দেবার অধিকার হারান তাহলে তার দায় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার জন্যই নাগরিকরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশন এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কমিশন যদি সত্যি সত্যি নিরপেক্ষ হতো, সরকারের পুতুলে পরিণত না হতো তাহলে এ রাজ্যে ৯১ লক্ষ ভোটারকে অবৈধ তক্মা পেতে হতো না। আসলে কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন করে মোদী সরকার গোড়াতেই কমিশনের নিরপেক্ষতার পায়ে কুড়োল মেরে দিয়েছে। আগে নিয়ম ছিল কমিশনার নিয়োগ করবে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত কমিটি। মোদী সরকার এই নিয়ম বদলে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে সেই জায়গায় অন্য এক মন্ত্রীকে যোগ করেছেন। ফলে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে মোদী তাদের অনুগত ও ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছেন। এইভাবেই গঠিত হয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। স্বাভাবিকভাবেই আরএসএস’র ছক অনুযায়ী কমিশন কাজ করছে। এসআইআর’র পদ্ধতি আরএসএস’রই পরিকল্পনা।
উদ্দেশ্য ছিল এমন নিয়ম বা কৌশল অবলম্বন করা যাতে মুসলিম মহিলা, দলিত, আদিবাসী এবং মতুয়াদের বাদ দেওয়া যায়। আরএসএস’র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শে এরা গুরুত্বহীন। তাই এদের যতটা সম্ভব বাদ দিয়েই ভোটার তালিকা তৈরির নির্দেশ ছিল। বিজেপি নেতারা এসআইআর শুরুর আগে থেকেই রীতিমতো প্রচার করে অন্তত এক কোটি অনুপ্রবেশকারী (অর্থাৎ মুসলিম) রোহিঙ্গা বাদ যাবে। নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে সেই টার্গেট পূরণ করেছে। রাজ্যে ক্ষমতা দখল স্বাভাবিকভাবে অসম্ভব। তাই মূলত বিজেপি-কে যারা ভোট দেবে না তাদের তালিকা থেকে ছেঁটে দেবার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্র রূপায়িত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে।
Editorial
পুতুল কমিশন
×
Comments :0