Rabindranath Raktakarabi

তোমায় কি নতুন করে পাব, নন্দিনী?

স্পটলাইট

ক্যান্টিনআর্ট স্পেস প্রযোজিত জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকের দৃশ্যে নন্দীনী। ছবি: সন্দীপ কুমার

ক্যান্টিন আর্ট স্পেস প্রযোজিত রক্তকরবী নাটকে একুশ শতকের বাস্তবতায় বিপন্ন মানুষ দেখতে পাবেন একশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যা বলতে চেয়েছিলেন যুগান্তকারী এক নাটকে, তা আজকের সময়ে কতটা জ্যান্ত। গোটা যক্ষপুরী রাঙিয়ে তুলবার গান নিয়ে আসবার কথা ছিল যার— নন্দিনীর সেই প্রেমিক রঞ্জনের মরদেহটিই দেখা গিয়েছিল শেষ পর্যন্ত-যক্ষপুরীর রাজা তাকে বাঁচতে দেয়নি। কিন্তু আজকের রক্তকরবী, ক্যান্টিন আর্ট প্রযোজিত জয়রাজ ভট্টাচার্য ও তাঁর দলবলের দক্ষতা ও দায়বদ্ধতায় গড়ে ওঠা রক্তকরবী নাট্যে রঞ্জন মরণের কূল থেকে বেঁচে ওঠে ফের। নাটকের শেষ দৃশ্যে, যে-দৃশ্য রবীন্দ্রনাথে নেই, রঞ্জনের হাতে ঝলসে ওঠে মাউথ অর্গ্যান, শুরুতে খুব মৃদু, যেন বহুদূর থেকে কষ্টেসৃষ্টে উঠে আসে সুর, কিন্তু কিছু পরেই সেই সুর হয়ে ওঠে আহ্বান, হয়ে ওঠে সমস্ত অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত মানুষের মার্গসঙ্গীত। 
প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে পড়ার পর মুহূর্ত থেকেই কার্যত শুরু হয়ে যায় নাট্য। তিন ভাগের এক ভাগ মাত্র আসন শুধু বরাদ্দ দর্শকদের জন্য, মঞ্চ এবং প্রেক্ষাগৃহের বাকি অংশ একটি আস্ত যক্ষপুরী- দর্শক এক বুক চাপা, অস্বস্তির মধ্যে প্রবেশ করে, ডানদিক-বাঁদিকের কিম্ভূত সব পাটাতন দেখে সে বোঝার চেষ্টা করে প্রস্তুতির ধরন, এবং এই চেষ্টার মধ্যে দিয়েই সে আগাম ঢুকে পড়ে নাটকে— নাটকের প্রথম সংলাপ উচ্চারিত হওয়ার কিছু আগে থেকেই। দরজায় সে ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছে, টিকিট পরীক্ষকের মাথায় খনি শ্রমিকের মতো হেলমেট— সে বুঝেছে আকাদেমি অব ফাইন আর্টসের অন্দরে নয়, সে আসলে ঢুকছে খনি শহরের পেটে, যক্ষপুরীর ভিতর পাড়ায়। নেহাত নিস্পৃহ ভোক্তার স্বভাব থেকে সরিয়ে এইখান থেকেই জয়রাজ ও তাঁর সহকর্মীরা দর্শকের জন্য এক ধরনের সক্রিয়তার সুযোগ গড়ে দেন। খনি কিংবা কারখানার পরিবেশ বোঝাতে মানানসই নানা ধ্বনি ব্যবহার করা হয় নাটকে। তার মধ্যে সাইরেনের বিশেষ আওয়াজ খুবই পরিচিত। কিন্তু এ নাট্যে খনির আবহ তৈরিতে এসেছে ইলেকট্রিক কাটার, কিংবা ড্রিল মেশিনের একঘেয়ে কর্তনশব্দ, আর তার সঙ্গে ছিটকে পরা আগুন-ফুলকি। না মূল নাট্যে এসব ছিল না। 
এসব এবং আরও নানা বেচাল দেখলে রবীন্দ্রনাথ কি রাগ করতেন? তাঁর নাটকে যা নেই, তা কি মঞ্চে আনা যায়? যে সংলাপ নেই, যে চরিত্র নেই, যে পোশাকের স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই, যে বাদ্যযন্ত্র নেই, সঙ্গীত নেই- সেই সব কি মঞ্চ উপস্থাপনায় আধুনিক প্রযোজক-নির্দেশক নিয়ে আসতে পারেন? এই প্রশ্ন অনেককেই চিন্তিত করে তুলবে নির্ঘাত, অনেককে বিরক্ত করবে, উত্ত্যক্ত করবে। কিন্তু ভেবে দেখা যেতে পারে, যখন কোনও রচয়িতার লেখা আমরা পড়ি, সমালোচকের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়াই পড়ি, তখন নিজেরাই সেই রচনাকে নিজেদের সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী ঘটিয়ে তুলি মনে। সেই "ঘটিয়ে তোলায়" কারো অন্য কারো হাত নেই, কোনও নিষেধাজ্ঞা সেখানে চলে না। নিজেদের স্মৃতি এবং পাঠমুহূর্তের রুচি ও সংস্কার অনুযায়ীই নির্ধারিত হয় সেই পড়া। একই রকম ভাবে, কোনও রচনা যখন মঞ্চে কেউ হাজির করেন--রচয়িতা ব্যতিরেকে অন্য কেউ, তখন তিনি (এবং তাঁর সহকর্মীরা যৌথভাবে) আসলে মঞ্চে লিখে দেন নিজেদের পড়াটিকেই। এই হিসাবে পারফরমেন্স আসলে এক রিডিং-ই বটে- এমন এক রিডিং যা নিজেই এক শিল্পবস্তু হিসাবে দাবি জানায়। এই হিসাবে পারফর্মেন্স আসলে সমালোচনা বা ক্রিটিকও— মূল রচনাটির সঙ্গে নির্দেশক নামক পাঠকের সংলাপের একটি চিহ্ন সেখানে থাকেই। ঠিক যেমন অনুবাদকের গায়ের ওম লেগে থাকে অনুবাদ-কর্মে, মূল রচনাটির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকেন তর্জমাকারী, তেমনি, পুরাতন নাটকের নতুন নির্দেশক নিজের রুচি ও সংস্কার, মেধা ও মূল্যবোধে সিক্ত করে দেন নিজের উপস্থাপনাটিকে। রচনার উত্তরজীবন এইভাবেই বইতে থাকে— যে রচনার উত্তরজীবন নেই, সে রচনা বধির হয়ে গেছে বুঝে নিতে হবে। জয়রাজদের নাট্যে সর্দারের ভাষা, পোশাক, ভঙ্গি তাই হুবহু রবীন্দ্রনাটকের 'অনুরূপ' থাকে না, বিশুর হাতে বাঁশির বদলে আসে গিটার, রঞ্জনের ঠোঁটে উঠে আসে মাউথ অর্গ্যান। সর্দারের অনুগত প্রহরী-গুন্ডাদের উদ্ধত রোয়াব বোঝাতে মঞ্চে তাদের নির্মমভাবে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে দেখি— শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা ইনহেলার নিতে বাধ্য বিশুর মুখের উপর। নির্দেশক অনুগ্রহ করে ভেবে দেখবেন, নিষ্ঠুর, সংবেদনহীন, উদ্ধত পাইকদের ছবি তৈরি করতে এই ধূমপান ও ধোঁয়া-নিক্ষেপের কোনও বিকল্প চিহ্ন উদ্ভাবন করা যায় কিনা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ প্রেক্ষাগৃহে অনেক দর্শকের সত্যিই খুব কষ্ট হয় এতে— আশা করব, হোক কষ্ট, ওইটিই তো চাই— এমন 'যুক্তি' এইখানে ব্যবহৃত হবে না। 
রক্তকরবী নাটকের অন্যতম এক সৌন্দর্য হচ্ছে রাজা ও নন্দিনীর টানাপোড়েন। রাজা মঞ্চে আসবেন, নাকি আড়ালেই তিনি রয়ে যাবেন, কেবল তাঁর কণ্ঠ রইবে মঞ্চে— এ নিয়ে মতান্তর আছে। এ নাট্যে রাজা বহুক্ষণ আড়ালেই থাকেন, জালের ওপার থেকে এক আধবার বাইরে বেরিয়ে আসে কেবল তাঁর দেহাংশ- ক্ষমতার প্রসারিত হাত- যা বীভৎস, ভয়ানক, অস্বস্তিকর। তারপর শেষ দিকে তাঁকে সরাসরি দেখাও যায়— জালের বাইরে তিনি নেমে আসেন সশরীর। তখন অবশ্য তিনি ক্রুদ্ধ এবং অসহায়। এই উপস্থাপনায় রাজাকে ঈষৎ বেশি কাতর মনে হয়েছে, তাঁর ক্রুদ্ধ চিৎকারের মধ্যে প্রায় গোড়া থেকেই যেন আছে অসহায়তা। ভিন্ন পাঠ ও রুচির অধিকার মেনেও, তাকে সম্ভ্রম জানিয়েও বলছি, রাজার এই কাতরতার মাত্রা কি কিছু কমানো যায়? 
নাট্যের গোড়ায় এক কিশোরীকে দেখা যায়, মঞ্চে রাখা একটি বৃহদাকার কাঠের চাকা ঠেলে সরাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই তার একার চেষ্টায় সে চাকা নড়ে না। একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে সেই চাকা কয়েকজনের চেষ্টায় গড়াতে থাকে, তার উপরে উঠে পড়ে যক্ষপুরীর বাসিন্দাদের কেউ কেউ। নন্দিনী যখন বিশুর সঙ্গে কথোপকথনরত, তাদের পুরাতন সময়ের স্মৃতি উঠে আসছে গানের আশ্রয়ে, ঠিক সেই সময়ে সেই কিশোরী— যে প্রায়ই নন্দিনীর পায়ে পায়ে ঘোরে, সে-ই এসে চুপিসাড়ে নন্দিনীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে যায় গিটার। এই রহস্যময় কিশোরী কে? রবীন্দ্রনাথের নাটকে এর কোনও ছায়া —কেননা রক্তকরবী তো শেষ পর্যন্ত নন্দিনী নামক এক মানবীরই গল্প— বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জয়রাজদের নাট্যে এই কিশোরী এসেছে বোধ হয় নন্দিনীর উত্তরকাল হিসাবে। 
বিশু-কিশোর-রঞ্জন-রাজা- এ নাট্যের কেন্দ্রীয় মানবী নন্দিনীর প্রতি এই চার ব্যক্তি চার ধরনে আকৃষ্ট। সে সকলের নন্দিনী-আনন্দ এবং প্রেমই তার চিহ্ন। সেই মুক্ত প্রেমের সামনে প্রখর নিষেধাজ্ঞা হাজির করে যে যন্ত্র- মানব-শোষণ-তন্ত্র বলা যায় তাকে- সেই যন্ত্রকে চুরমার করে নন্দিনীর বার্তা এগিয়ে যায়। এ নাট্যের নন্দিনী শ্রাবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় আঙ্গিক ও বাচিক অভিনয় তো বটেই, সাত্ত্বিক অভিনয়েও মাত করে দিয়েছেন। নাট্যশাস্ত্রে যে চতুর্থ ধারাটির কথা বলা হয়েছে- আহার্য- অর্থাৎ কিনা পোশাক ও সজ্জার মধ্যে দিয়ে যে অভিনয় ফুটে ওঠে তাতেও তিনি চমকপ্রদ। ধানী রঙের শাড়ির বদলে তাঁর পোশাক এখানে ধানী রঙের কামিজ। মূল মঞ্চ তো বটেই, প্রেক্ষাগৃহ ফুঁড়ে মঞ্চের যে প্রসারিত অংশ- সেই সব জুড়ে তিনি সারাক্ষণ আশ্চর্য শরীরী দক্ষতায় ছুটে বেড়ান, নেচে বেড়ান। কখনও তাঁর সমস্ত দেহ জুড়ে থাকে ক্রোধ, কখনও সারল্য, কখনও আবার প্রণয় আকুলতা, অস্থির প্রতীক্ষা, বিষণ্ণতা, ঝলসে-ওঠা স্পর্ধার দৃষ্টি। 
দীর্ঘদিন নাট্যচর্চায় রত আছেন বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর অভিনয় দক্ষতার অন্যতম সেরা নজির হয়ে রইল সরদারের এই চরিত্র-রূপায়ণ। কুচক্রী নিষ্ঠুর সরদারই যে শোষণ-সিস্টেমের অন্যতম কারিগর তা দুরন্ত ভাবে ফুটেছে তাঁর সংলাপ, ভঙ্গি এবং সর্বোপরি নীরবতার উপস্থাপনায়। চন্দ্রা ও ফাগুলালের ভূমিকায় দেবপ্রিয়া এবং ঋদ্ধিবেশের কাজ নজরকাড়া। বিশুর চরিত্রাভিনয় করেছেন বুদ্ধদেব। স্বীকার করি, নিখুঁত সুরেলা নয় তাঁর সমস্ত গান, কিন্তু এমন এক জেদি আন্তরিকতা দিয়ে তিনি বুনেছেন এ চরিত্র যে প্রাথমিক ভাবে রেওয়াজি কান কিছু অস্বস্তি পেলেও মন তাঁকে গ্রহণ করে আদরেই। অবশ্য মেনে নেওয়া ভালো, গত একশো বছর ধরে বিরহী বিশুর জন্য যে ভালোবাসা আমরা জমিয়ে রেখেছি, তাকে নিজের নিজের মনোমত যেভাবে গড়ে রেখেছি, তাতে স্বয়ং নটরাজও যদি এ চরিত্রে অভিনয়ে রাজি হয়ে যান, তাঁকেও হয়তো শুনতে হবে, হলো না, হলো না, আমার মনের মতো হয়নি। বিশুর জন্য আমাদের জমানো মন খারাপ কিছুতেই বিশু পাগলকে যথাযথ হতে দেবে না। বাকি সকলের অভিনয়ই যথাযথ এবং উঁচু দরের, কিন্তু আলাদা করে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা দরকার।
জয়রাজদের এ নাট্যে অধ্যাপকের চরিত্র-রচনা অভূতপূর্ব এবং র্যারডিক্যাল। এ চরিত্রে অনসূয়ার অভিনয়ও চমৎকার। মূল নাটকে নন্দিনীর প্রতি অধ্যাপকের মুগ্ধতা ও টান এই নাট্যে বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এই ধাক্কা— কেন এতকাল কোনও প্রশ্ন ছাড়াই প্রায় সর্বসম্মত ভাবে আমরা অধ্যাপককে পুরুষই ভেবে এসেছি। এ প্রশ্ন এখানে অবান্তর, রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপকের ছবিটি নিজে কীভাবে দেখেছেন— যদিও রবীন্দ্রনাথ সংক্রান্ত গবেষণায় তার উপযুক্ত মূল্য আছে— সে কথাও স্বীকার করতে হবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যা-ই ভাবুন, পাঠকের পঠন প্রক্রিয়া (এবং সেই সূত্রে মঞ্চে উপস্থাপন প্রক্রিয়াও) কী বিপুল পরিমাণে "কন্ডিশন্ড", নিয়ন্ত্রিত- তা আচমকা আবিষ্কার করে চমকে উঠি। অধ্যাপক একজন নারীই-কিছুতেই পুরুষ নন, এ সিদ্ধান্ত একগুঁয়ে এবং পরিত্যাজ্য। কিন্তু অধ্যাপক পুরুষ ছাড়া আর কিছুই নন— এ ধারণাও খুবই গোলমেলে। শিক্ষক কিংবা ডাক্তার বললে 'প্রায়' সকলেই যে ধাঁ করে ভেবে ফেলি একজন পুরুষেরই মুখ, শিক্ষিকা কিংবা লেডি-ডাক্তার না বলা অব্দি অস্বস্তি হয়— এ আসলে গভীরে গোঁজা সংস্কারই। পাঠকের ভেবে -নেওয়ার অভ্যাসে কিছু বৈচিত্র থাকার কথা। সে বৈচিত্র যে আমাদের অভ্যাসে বিশেষ ছিল না, তা মনে করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব আলাদা করে দিতেই হবে। তবে অধ্যাপকের সঙ্গী- রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকে যাঁকে চিহ্নিত করেছেন পুরাণবাগীশ হিসাবে— তিনি কেন যে বাদ গেলেন বোঝা গেল না। আধুনিক প্রতিবেশে, একালের খনি পরিসরে পুরাণবাগীশ বেমানান ঠেকবে ভেবেই কি? 

আমরা যারা বহুদিন ধরে পড়েছি নাটক রক্তকরবী, কিংবা শম্ভু মিত্র কিংবা বাদল সরকারের দুই ভিন্ন ধারার কিংবদন্তি হয়ে-ওঠা নাট্য-উপস্থাপনা দেখে অথবা না-দেখে, কিংবা 'ক্যাসেট' শুনে আমরা যারা মনে মনে গড়ে নিয়েছি একটি নিজস্ব রক্তকরবী— প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ও গবেষণামূলক "নিখুঁত" পাঠপ্রক্রিয়ার কথা বলছি না, বলছি তার বাইরে বিপুল জনপরিসরে রক্তকরবীর যে বিচিত্র অভিঘাত ছড়িয়ে রয়েছে তার কথা- সেই আমাদের সযত্ন নির্মিত স্মৃতির রক্তকরবীকে বেশ জোরদার ধাক্কা দেবে ক্যান্টিন আর্ট স্পেস নিবেদিত এই সাম্প্রতিক প্রযোজনা। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর টেনে রেখে ইংরেজি গানের বেদনা কিংবা উদ্দীপনা ঢুকে পড়বে তার মধ্যে— দর্শকদের ডান কিংবা বাম দিকের পাটাতন বেয়ে আসা-যাওয়া করবে বিশু কিংবা সর্দার এমনকি নন্দিনী নিজেও, মাঝে মাঝেই পিছন থেকে আছড়ে পড়বে সংলাপ, দু’পাশের দেয়ালে ফুটে উঠবে ভিডিও ফুটেজ (ভিডিও নির্মাণ করেছেন কৌশিক, সিনোগ্রাফি- জয়রাজ)। এসব কিছুই আমাদের কল্পিত রক্তকরবীর মধ্যে কোত্থাও ছিল না, অথবা আমাদের পাঠের খুব গভীরে-বোনা প্রত্যাশায় এসব কি একেবারেই ছিল না? অধ্যাপকের ঈষৎ ভীরু অসহায়তার মাঝখানে ব্যথিত ও আশঙ্কিত মনটিকে আমাদের চারপাশে কি মিলিয়ে দেখিনি আমরা বারবার? কর্পোরেট সংস্কৃতির জেলখানা থেকে দেশে ও ঘরে ফেরার বাসনা কি শুধু চন্দ্রার? এবং আর্তস্বরে সেই বাসনাপূরণ যে অসম্ভব সে কথা কি ফাগুলালই শুধু বলেছে? আমাদেরই আশপাশে এইসব কথার অনুরণন শুনতে শুনতে আমরা কি রক্তকরবীর কথা মাঝে মাঝে ভুল করেও ভেবে ফেলিনি? প্রায় ঘাড় ধরে জয়রাজদের রক্তকরবী আমাদের দেখিয়েছেন একশো বছর আগের নাট্য কী অমিত সম্ভাবনাময়, কী আশ্চর্য এ নাট্যের উত্তরজীবন। একুশ শতকের ছাব্বিশ সালে এসে এ নাট্য শিখিয়ে দিতে পারে কেমন করে পড়তে হয় সমকালকে, পুঁজির অসীম লালসাকে, যন্ত্রের বিকারকে। 
নাটকের মাঝে এবং শেষ দিকে দু’-একবার ভারতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য স্থাপনের লক্ষ্যে কয়েকটি রেকর্ড-করা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করা হয়েছে এই নাটকে। উদ্দেশ্য, দর্শকের একাংশ সহজেই যাতে টের পান রক্তকরবী একশো বছর আগের নাটক নয়, তা আমাদের সমকাল এবং আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের ক্ষেত্রেও অতীব প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সমকালের সঙ্গে এ নাট্যের সংযোগ এত চমকপ্রদভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সারাক্ষণ- পোশাকে, সংলাপে, সঙ্গীতে, প্রারম্ভিক নিবেদনে, মঞ্চভাবনায় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার নিদারুণ দৃশ্যাবলীর অভিনব উপস্থাপনায়— তাতে মনে হয়, ঐটুকু মোটাদাগ না থাকলেও চলত। চিরকালীন নাট্যকে সাম্প্রতিকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে বারবার। আমরা যেন খেয়াল রাখি, রক্তকরবী নাটকের অনুবাদযোগ্যতা অপরিসীম— এতে কেবল একটি হিংস্র, স্বৈরাচারী এবং ভোগনির্ভর রাষ্ট্রকাঠামোর অন্ধিসন্ধি দেখানো হয়েছে তাই নয়, এর মধ্যে মানুষের  প্রণয় প্রত্যাশা ও চিরকালীন দুঃখসুখের একটি খবরও রয়েছে জড়িয়ে। আমাদের মনে হয়, অতীব সমকালীন করে তোলার লোভ কিছু নিয়ন্ত্রিত হলে নাটকেরই জোর বাড়ে। দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ পায়— নাট্য আস্বাদনে তার অংশগ্রহণ আরও নিশ্চিত হয়। কার কথা, ভঙ্গি, দর্শন জুড়ে নিতে হবে নাট্যবিষয়ের সঙ্গে তা সে নিজেই ঠিক করে নিতে পারে— নাট্যে সে নিজেও হয়ে ওঠে অংশীদার। 
ক্যান্টিন আর্ট স্পেস প্রযোজিত রক্তকরবী নাটকের তৃতীয় অভিনয় অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৭ মে। তার পরে আরও হবে নিশ্চয়, পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের নানা জায়গায় কিংবা বিদেশেও। দেখে আসুন কী দৃপ্তভাবে বেঁচে আছেন রবীন্দ্রনাথ। বেদনা বিরহ আর প্রতিরোধ নিয়ে আমাদের তিনি ডেকেছেন।

Comments :0

Login to leave a comment