Post Editorial

বাংলা এখন সঙ্ঘের নতুন পরীক্ষাগার

সম্পাদকীয় বিভাগ

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য
 

সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা এখনও পুরানো আরএসএস-কে ‘সম্মান’ করেন , ভোটের আগেও বলেছেন আবার ভোটে হারার পরেও বলেছেন। এখনও রাজ্যের ২৭ লাখ জীবিত মানুষ তাদের ভোটাধিকার তথা নাগরিকত্ব নিয়েই চরম সঙ্কটে। তারপরেও মমতার মতে ‘দিল্লির নেতারা’ অত ‘বাজে’ নয় , ইতিমধ্যে তাঁর নিজের দলও তিন ভাগে ভাগ হয়েছে । আবার ঠিক একইভাবে বিজেপি রাজ্য সভাপতিও ভোটের ফলের পরে প্রথম পাঁচ দিন কাব্যিক ঢঙে এসো না এসো না করেও ‘ভালো’ তৃণমূলকে তাদের সরকারি জোটে শামিল করে ফেলেছেন মাত্র এক মাসের মধ্যে। এই সমঝোতা সেই ৯৭ সাল থেকে মমতা কংগ্রেসে থাকার সময় থেকেই। বাংলা থেকে বামপন্থীদের উৎখাত করতে আরএসএস’র সেরা বাজি ছিল মমতাই। আরএসএস-বিজেপি’র তত্ত্বাবধানে কংগ্রেস ভেঙে মমতার তৃণমূল গঠন থেকে শুরু করে তারপরের পরবর্তী ঘটনাক্রম সকলেরই জানা। আরএসএস দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে কাজ করে। রাজ্যে তৃণমূল লাগাতার পনেরো বছর ধরে বামপন্থীদের একটানা খতম করার কাজটা যেমন করেছে তেমনি রাজ্যজুড়ে আরএসএস’র শাখা বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে— ২০১১ সালে ২৫০ টি শাখা থেকে ২০২৬ সালে ৪৩০০ টি শাখাতে। এই বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে যে কোনও বিজেপি শাসিত রাজ্যকেও টেক্কা দিয়েছে তৃণমূল শাসিত বাংলা। ফলে মমতা যেমন তাদের ‘সম্মান’ করেন, মমতার প্রতিও প্রতি সঙ্ঘের ‘কৃতজ্ঞতা’ রয়েছে ।  
সঙ্ঘের অনেক পরিকল্পনা আছে, আপাতত বাংলা তাদের প্রাথমিকভাবে সফল পরীক্ষাগার। যে রাজ্যে বামপন্থীরা তিন দশক শাসনে থেকেছে সেখানে মানুষের মনে সাম্প্রদায়িকতার বিষ চাষ করা সঙ্ঘের জন্য সহজ কাজ ছিল না। মমতা কিছুটা করে দিয়ে গেছেন, যদিও পুরোটা পারেননি। আরএসএস তাই এবার জোর দেবে বাকিটা শেষ করার জন্য। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত ও পালিত দল আরএসএস-বিজেপি সরাসরি তাদের কর্পোরেট প্রভুদের বিপুল মুনাফা বৃদ্ধিতেই নজর দেবে সেটাই বলা বাহুল্য আর সেই কার্যসিদ্ধিটা তারা যে মোড়কে করে সেটা হলো উগ্র জাতীয়তাবাদ ( আরএসএস’র ভাষায় রাষ্ট্রবাদ ) আর কট্টর সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে দিয়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যাদের অবদান একদম বিশুদ্ধ শুন্য তারা সারাদিন ধরে মানুষকে বোঝাবে ‘রাষ্ট্রবাদী’ হওয়ার জন্য আর তার সাথে জুড়ে দেবে ধর্ম। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আর এসএস-বিজেপি’র সাথে অন্য যে কোনও রাজনৈতিক দলের পার্থক্য এটাই যে বাকিরা শুধু ভোট চাইতে পারে আপনার কাছে, কিন্তু এরা আপনার মুল্যবান ভোটের পরেও আরও অনেককিছু চাইবে । কি পোশাক পরবেন আর পরবেন না, কি খাবেন আর কি খাবেন না, কার সাথে মিশবেন আর কাদের একঘরে করে দেবেন– তালিকার শেষ নেই। সবচেয়ে কঠিন আঘাতটা নামিয়ে আনবে শিক্ষাক্ষেত্রে যেখানে তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আপনাকে জানতে হবে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। সেই হীরকরাজের দরবারের মগজ ধোলাই। আপনার পুরোপুরি বশ্যতা অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য। আপনাকে স্বপ্নের দুনিয়ায় নিয়ে যাবে তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া দিয়ে, আপনি এতোটাই বিভোর হয়ে থাকবেন যে পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাসের দাম নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ পাবেন না। বুলডোজার দিয়ে গরিব মানুষের মাথা গোঁজার শেষ জায়গাটুকু গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে, নির্বিচারে জীবন ও জীবিকার উচ্ছেদ হবে আর ঠিক তখনই কোনও সংস্কৃতিমনা সভাপতি আপনাকে শক্তির কবিতা শোনাবেন– অবনী বাড়ি আছো ? বাংলার জন্য আরএসএস-বিজেপি’র মডেল এরকমই– নরমে ও গরমে। কারণ বাংলা আর যাইহোক অন্য রাজ্যের মত তো নয় , বাংলায় ভারতের রেনেসাঁর শুরু। আজও যদি প্রগতিশীল মানসিকতা একজোট হয়ে যায় তাহলেই আরএসএস’র পক্ষে মুশকিল। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের প্রসার ঘটলে এরকম ফ্যাসিস্ত সুলভ ও গুপ্ত সংগঠনের পক্ষে তাদের ভাষ্য প্রচারে অসুবিধা হবে।
মমতার সরকারের চূড়ান্ত অপশাসন, লাগামছাড়া দুর্নীতি, সরকারি টাকার লুট, তৃণমূলের গুন্ডা আর তোলাবাজদের রাজত্ব আজ পরবর্তী বিজেপি সরকারকে যে কোনও কাজের জন্য বৈধতা দিয়েছে। তাই গোটা দেশের মতই বাংলাতেও আরএসএস-বিজেপি’র প্রথম টার্গেট সংসদীয় গণতন্ত্রের সমাধি ঘটানো । কার্যক্ষেত্রে একদলীয় শাসন অর্জন করা। ভোটারদের আঙুলের কালি ওঠার আগেই রাজ্যের বিরোধী দল বেসরকারিভাবে সরকারি দলে মিশে গেছে। সেই মিশ্রণ এতোটাই গাঢ় যে, সরকারিভাবে বিরোধী দলের নেতা কে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়! প্রাক্তন তৃণমূলের নেতা ও বর্তমান বিজেপি’র মুখ্যমন্ত্রী সাংগঠনিকভাবে নিঃসন্দেহেই খুবই ‘দক্ষতার’ পরিচয় দিয়েছেন এই কাজে। রাজ্যে এখন একটি গৃহপালিত বিরোধী দল তৈরি হয়েছে যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের মালিক একই। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত দল তৃণমূলের সংসদীয় দল এখন কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে আর বিধানসভার বিধায়করা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সস্নেহ অভিভাবকত্বের অধীনে। বামজোটের দুই বিধায়ক বাদে বাকি বিধানসভা এখন নিয়মরক্ষার কাজে পরিণত। দেশজুড়েও এই মডেল বাস্তবায়িত করতে খুবই আগ্রাসী মনোভাব নিয়েছে বিজেপি, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য ২০২৯-এর লোকসভা ভোটে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়ে এক দেশ এক ভাষা এক ধর্ম এক দলের শাসন। প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে ভিন্নমত থাকবে, আবার একইসাথে যে বহুত্ববাদ ভারতের ভিত্তি, সেটারই দরমুশের কাজ চলছে এক দশক ধরে । তৃণমূলের মতো ভাড়ায় খাটা দলগুলো বিজেপি’র সেই কাজে আরও সুবিধে করে দিয়েছে ।  
গণতান্ত্রিক সমাজে ভয়, প্রচার এবং প্রশাসনিক বৈধতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বর্জনমূলক রাজনীতি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। কর্তৃত্ববাদ এক ধাপ এক ধাপ করে এগোয়—প্রতিষ্ঠান, আইন, প্রশাসনিক ভাষা এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি সামাজিক উদ্বেগের মাধ্যমে। তিরিশের দশকে হিটলার বারবার দাবি করেছিলেন যে জার্মানি তথাকথিত “বিদেশি” জনগোষ্ঠী, বিশেষত ইহুদিদের কারণে জনসংখ্যাগত ও সভ্যতাগত ধ্বংসের মুখে। অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য অভ্যন্তরীণ শত্রুদের দায়ী করা হয়। ১৯৩৫ সালের ন্যুরেমবার্গ আইন ইহুদিদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির বাসিন্দায় পরিণত করেছিল।
আমাদের দেশ বা রাজ্যেও একটা স্থায়ী “অভ্যন্তরীণ শত্রু” তৈরি করে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক নীতির ব্যর্থতা বা কর্পোরেট পুঁজির কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে জনগণের একাংশকে বিশ্বাস করানো হচ্ছে যে দেশের সমস্যার মূল কারণ– ‘ঘুসপেটিয়া’, ’উইপোকা’ ইত্যাদি। এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি একটি অভিন্ন ধর্মের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে জাতিগত নিপীড়ন, বেকারত্ব বা শ্রেণিশোষণের মতো বাস্তব সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরে গিয়ে শুধুমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণে কেন্দ্রীভূত হয়। এই জনসংখ্যাগত ‘ভয়’ রাষ্ট্রের নজরদারি ও নথিপত্রভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এগিয়ে দিলে নাগরিকত্ব যাচাই, আটক শিবির, তথ্য সংগ্রহ এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর উপর বিশেষ নজরদারির মতো পদক্ষেপ সহজেই বৈধতা পায়। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করে দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষ। সমস্ত সরকারি সামাজিক প্রকল্প থেকে এরা বাদ পড়ে। আজ যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এসব দেখে তৃপ্তি পাচ্ছেন আগামিদিনে তাদের ঘাড়েও কোনও না কোনোভাবে বিভিন্ন রকম বিধি নিষেধ আসতে চলেছে , নিশ্চিত থাকুন। বাংলায় তৃণমূল এই ধ্বংসের বীজ বুনে দিয়ে পালিয়ে গেছে, তবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে আছে এবং থাকবে একমাত্র বামপন্থীরাই, সেটা প্রথম দিন থেকেই প্রমাণিত।      

 

Comments :0

Login to leave a comment