সুদীপ্ত বসু ও অনিল কুণ্ডু
নৃশংসতার চিহ্ন জড়িয়ে ছিল ২৫ কেজির চালের বস্তায় দুমড়ে মুচড়ে রাখা ক্ষতবিক্ষত নাবালিকার নিথর দেহে।
গত দেড় দশকের চিহ্নও জড়িয়ে রয়েছে বিজেপি সরকারের তথাকথিত ‘অন্যরকম পুলিশ মন্ত্রী’র পুলিশ বাহিনীতেও। নাবালিকার অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগকেও বেমালুম অগ্রাহ্য করে রাত আটটা থেকে রাত তিনটে পর্যন্ত বারুইপুর পুলিশের হাত গুটিয়ে থাকার পরিণামেই এই মর্মান্তিক পরিণতি? যন্ত্রণায়, ক্ষোভে এক হয়ে রাস্তায় নেমে আসা সুর্যপুরের অভিযোগ অন্তত তাই।
সোমবার সকালে সেই নাবালিকার স্কুলে, তারই বেঞ্চে, তাঁরই বসার জায়গায় রজনীগন্ধা আর গোলাপ রেখে দিয়ে সহপাঠীদের চোখের জলে তাঁকে স্মরণ করার দৃশ্য আর সন্তানহারা মায়ের আর্তি শুনলো সুর্যপুর— ‘‘একরত্তি মেয়ে, এভাবে কেউ মারতে পারে? পুলিশ সেই রাতে একটু তৎপর হলে মেয়েটাকে বাঁচানো যেত!’’
ক্ষোভ, সমষ্টির প্রতিবাদ, একসঙ্গে গ্রাম উজাড় করে সকলে মিলে নেমে আসা রাস্তায়, ‘জাস্টিস ফর বারুইপুর’ স্লোগানে বারেবারে এদিন সকাল থেকে উত্তাল হলো সুর্যপুর। সেই সূর্যপুরে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টার ঘটনা পরম্পরা এ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি কি তাও স্পষ্ট করেছে।
সেই বিবরণের আগে বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভার এই সুর্যপুরে দু’টি পৃথক বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ানো যাক।
সুর্যপুর বাজার থেকে ডান দিকের পিচ রাস্তা ধরে সোজা রতনপুর। ওখানেই ধর্ষণের পরে খুন হওয়া নাবালিকার পুরানো বাড়ি। দাদু, দিদা সহ আত্মীয়রা থাকেন। বৃষ্টিতে কাদামাখা উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় তখন বসে ছিলেন সন্তানহারা জননী। চোখের জলও যেন শুকিয়ে গেছে। অস্ফুট স্বরে বলছিলেন, ‘‘ ক’দিন আগেই ওর জন্মদিন গেল। খুব মিশুকে ছিল, সবাই ওকে পাড়ায় চিনত। শনিবার বিকেলে ওর দিদি আর আমি শুয়ে পড়েছিলাম। ও বলল, মা আমি যাচ্ছি দোকানে। তখন সাড়ে চারটে। আর ফিরলো না। ওইটুকু মেয়ে, এত কষ্ট দিয়ে মারলো!’’ নিহত নাবালিকার মেজ দিদিও স্কুলে পড়ে। ‘‘বোন সেদিন বেরোলো, কে ভাববে এসব ঘটবে। রাত পর্যন্ত আমরা সবাই খোঁজাখুঁজি করলাম। আটটায় বারুইপুর থানায় জানালাম। তখন যদি পুলিশ আসতো ঠিক পাওয়া যেত। আসেনি!’’ কান্নায় ভেঙে পড়ল স্কুলপড়ুয়া কিশোরী। রতনপুরের বাড়িতে গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছে। দশকের পর দশক সকলে মিলে এখানে একসঙ্গে থাকেন। অন্য কোনও ভাবনা কোনোদিন জায়গা পায়নি মনে। পরিবেশ এখন থমথমে। পুলিশি তৎপরতা এখন বেড়েছে। গ্রামবাসীদের সন্দেহ, তা কি কেবলই প্রতিবাদের স্বর প্রবল হচ্ছে বলে? তাই কি পুলিশের তরফে পালটা স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ দায়ের করে গ্রামবাসীদেরই ভয় দেখানোর কৌশল?
রতনপুর যাওয়ার আগে ট্যাকা সেতু পেরিয়ে বা হাতে মাটির রাস্তা ধরে এগোলেই ট্যাকা গ্রাম। সেখানেই শান্তনু মণ্ডলের বাড়ি। দুপুরে যখন সেখানে যাওয়া গেল, তখন বাড়ি শুনশান। বাড়িতে জনরোষের চিহ্ন স্পষ্ট। শঙ্করপুর-১, শঙ্করপুর-২ এবং ধপধপির প্রায় ৭৪টি বুথের দায়িত্বে, বিজেপি’র মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদক এই যুবক। বাড়িতে কেউ নেই। গ্রামেরই বাসিন্দা জনৈক কার্তিক সরদারের কথায়, রবিবার থেকে বাড়িতে কেউ নেই। বাবা-মা’ও অন্যত্র চলে গেছে। এই ঘটনা সত্যি ভাবা যায় না। শান্তনুকে চিনতেন? ‘‘হ্যাঁ তো, বিজেপি করে। শুনলাম ও সেদিন সকালে ফাঁড়িতে গিয়ে ঐ আনন্দ সরদারকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছিল।’’ এখন কোথায়? ‘‘আমরা জানিনা, শুনেছিলাম পুলিশ আটক করেছে, তারপর জানিনা।’’
পুলিশ আটক করেছিল রবিবার রাতে, তাহলে সোমবার কোথায় গেল শান্তনু মণ্ডল? নাকি কোন প্রভাবশালীর ‘সেফ কাস্টডি’তে রাখা হয়েছে? ট্যাকা গ্রামেরই এক বিজেপি কর্মীর কথায়, ‘‘এসব মিথ্যা প্রচার। শান্তনু বরং সারা রাত বাকিদের সঙ্গেই মেয়েটিকে উদ্ধার করার জন্য খুঁজেছিল।’’ কিন্তু ফাঁড়ি থেকে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সরদারকে ছাড়িয়ে আনতে গেল কেন? বিজেপি’র সেই কর্মীর দাবি, ‘‘আরে শান্তনু তো বিজেপি নেতা, ও তো প্রশাসনেরই অংশ!’’
প্রথমে পুলিশি নিস্ক্রিয়তা এবং পরে অন্যতম অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে আনতে বিজেপি নেতার এমন তৎপরতার ফলাফল হলো সুর্যপুরের জনগণের ক্ষোভের এই বিস্ফোরণ!
ঠিক কি হয়েছিল শনিবার? বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ সূর্যপুর বাজারের সামনে নতুন হওয়া তাঁদের বাড়ি থেকে মা ও দিদিকে জানিয়ে বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কিনতে বেরিয়েছিল ১২বছরের ওই স্কুলপড়ুয়া। বাড়ি থেকেই বেরিয়ে বারুইপুর-জয়নগর মেইন রোড, সুর্যপুর বাজার। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার পরেও না ফিরতে সামান্য সন্দেহ হয় নাবালিকার মায়ের। তারপর সময় আরও যায়। ততক্ষণে আশঙ্কা চেপে বসে। গ্রামের বাসিন্দারাও এবার খোঁজ করতে নামেন। রাত পৌনে আটটা নাগাদ বারুইপুর থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়। যদিও নাবালিকার বাবার অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের অভিযোগ তখন ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি, কোন গুরুত্বই দেয়নি। এরপর গ্রামের যুবকরাই দল বেঁধে বেরোন। সুর্যপুর বাজারে থাকা তিনটি সিসিটিভি’র ফুটেজ দেখা হয়। সেখানেই দেখা যায় লাল গেঞ্জি পরে একটি যুবক মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। তখন বাজে বিকেল ৪-৩৫ মিনিট। এরপর ৪-৪২ মিনিট নাগাদ একটি স্কুলের সামনে দেখা যায় নাবালিকাকে। তখন সেখানে দু’জন। একজনকে চিহ্নিত করা যায়। ডাক নাম গুলি। আরেকজনের হদিশ পেতে এখানে বালি-সিমেন্টের এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে যাওয়া হয়। তিনি চিহ্নিত করেন আরেকজনের নাম রাজু। এরপরে গ্রামবাসীরাই রাত দু’টো নাগাদ যায় ওই গুলি ওরফে প্রভাস মণ্ডলের বাড়ি। সেখানে প্রথমে খুঁজে পাওয়া না গেলেও পরে তাকে পাওয়া যায় বাড়ি থেকেই। জনগণের প্রবল ক্ষোভ, রাগের মুখে তখন ভয়ে সে স্বীকার করে, মেয়েটিকে নিয়ে গেছে কয়েকজন। মূল পান্ডা আনন্দ সরদার, দিবাকর সরদার সহ আরও দু’-তিনজন। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত তিনটে। জানানো হয়, মেয়েটি এখনও ঠিক আছে, তাকে নাকি ম্যাগি খাওয়ানো হয়েছে রাতে! এরপরে আসে ফাঁড়ির দু’জন প্রবীণ পুলিশ কর্মী। তাঁরা খানিকটা সহযোগিতা করেন। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটেছে।
সকালে বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে নাছোনগাছায় একটি ক্লাব সংলগ্ন পুকুরে মিলল বস্তাবন্দি দেহ। শরীরের ঊর্ধাঙ্গে একাধিক ক্ষত, কামড়ের চিহ্ন। সারা রাত মদ্যপ অবস্থায় ধৃতরা অত্যাচার চালিয়েছিল ১২ বছরের স্কুলপড়ুয়ার উপরে। ধর্ষণের পরে ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে নৃশংসভাবে মেরে মুখে কাপড় গুঁজে ২৫ কেজি চালের বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তখনও প্রাণ ছিল। কারণ ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, নাবালিকার ফুসফুসে ঢুকেছিল জল; মৃত অবস্থায় জলে ফেললে তা সম্ভব নয়।
আপাতত ধৃত ৩ জনের মধ্যে অন্যতম অভিযুক্ত আনন্দ সরদার। বিজেপি’র সক্রিয় কর্মী সূর্যপুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায়। বাকি কাউকে নয়, এই আনন্দকেই ছাড়িয়ে আনতে রবিবার সকালে অটো নিয়ে সুর্যপুরে পুলিশ ক্যাম্পে চলে যায় বিজেপি’র নেতা শান্তনু মণ্ডল। ছাড়িয়ে আনে। এদিন যদিও আনন্দকে বারুইপুর বাজার থেকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। তবে শান্তনুর খোঁজ নেই! পুলিশ উত্তরহীন।
Baruipur Rape and Murder
অভিযুক্ত বিজেপি নেতা সেই শান্তনু কোথায়?
×
Comments :0