প্রতিশ্রুতি ছিল যে এবারে ডবল ইঞ্জিনের দৌলতে উন্নয়ন তরতর করে এগবে। কিন্তু কেন্দ্রের এবং রাজ্যের দুই বিজেপি সরকারের কার্যকলাপে তার কোনও নিদর্শন দেখা যাচ্ছে না। বরং গ্রামোন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ রেগা প্রকল্পে দুই সরকার মিলেই কোপ মেরে কাজ কমানোর বন্দোবস্ত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বন্দোবস্তে সারা দেশে ৪৪ শতাংশ জব কার্ড বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে রাজ্যের বিজেপি সরকার যা বরাদ্দ করেছে তাতে প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক কাজও দেওয়া যাবে না গ্রামবাসীদের। বামপন্থীদের সমর্থনে পরিচালিত প্রথম ইউপিএ সরকার গান্ধীজীর নামে যে আইনি গ্যারান্টি সহ বছরে একশো দিনের কাজের প্রকল্প সারা দেশের জন্য চালু করেছিল, মোদী সরকার আসার পরে তা দুর্বল করা হয়েছে। কাজ চাইলে কর্মহীন গ্রামীণ জবকার্ড হোল্ডারদের বাধ্যতামূলকভাবে কাজ দেওয়া এবং কাজ দিতে না পারলে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের বাধ্যবাধকতা খর্ব করা হয়েছে। তারপরে প্রকল্পটির নামই বদল করে দেওয়া হয়েছে, এখন নাম রাখা হয়েছে জি রামজি। আর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে জবকার্ড নিয়ে তৃণমূলের দুর্নীতি দেখিয়ে প্রকল্পটিই বন্ধ করে দিয়েছিল মোদী সরকার। রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পরেও কাজের ঢল নামিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার কোনও ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে?
নতুন বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পে মোট ১৪,১৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্র দেবে ৬০ শতাংশ বা প্রায় ৮,৫০৮ কোটি টাকা, আর বাকি ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫,৬৭২ কোটি টাকা বহন করবে রাজ্য। কিন্তু অর্থনৈতিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ৭৫.৯৭ লক্ষ সক্রিয় জবকার্ড রয়েছে। এই সংখ্যক শ্রমিককে বছরে ১২৫ দিনের কাজ দিতে প্রায় ২৯,৭৫২ কোটি টাকা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে রাজ্যের অংশীদারিত্বই হওয়া প্রয়োজন প্রায় ১৫,৫৭২ কোটি টাকা। এর বদলে যা বরাদ্দ করা হয়েছে যদি তার পুরো বাস্তবায়ন করা হয় তাহলেও তাতে ১২৫ দিনের কাজ দেওয়া সম্ভব নয়, সর্বাধিক ৬০ দিনের কর্মসংস্থান হতে পারে। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই প্রকল্পের রূপায়ণে শুধু অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়, এর বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও জরুরি। কিন্তু এ রাজ্যে বিজেপি সরকারে আসার পরেই তৃণমূলের দখলীকৃত পঞ্চায়েত থেকে পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। বহু পঞ্চায়েতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত বিডিওদের উপর বর্তেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিয়েও ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন বিধিতে সারা দেশে ৪৪ শতাংশ জবকার্ড বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৫৬ শতাংশ জব কার্ডের কেওয়াইসি ও আধার সংযুক্তিকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৪ শতাংশ জব কার্ড বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাছাড়া এই প্রক্রিয়ায় স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর উপর নির্ভরতা বাধ্যতামূলক করা হলে বহু দরিদ্র গ্রামীণ পরিবার প্রকল্পের নাগালের বাইরে চলে যাবে বলে খেতমজুর সংগঠনগুলি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যে প্রকল্প গ্রামবাসীদের কাজের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন অধিকারভিত্তিক ও চাহিদানির্ভর থাকবে না, বরং কেবল একটি বাজেট— বরাদ্দ নির্ভর প্রকল্পে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তারা কাজের দিন এবং কাজের মজুরি বাড়াতে পারতো, তার বদলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার গোটা প্রকল্পের দায় রাজ্যগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। প্রকল্পের আর্থিক দায় রাজ্যের ঘাড়ে চাপালে রাজ্য সরকারগুলিকে বাজেটে সেই অর্থের সংস্থান করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাজেটে সেই দায় গ্রহণ করে বরাদ্দের ইঙ্গিত মেলেনি। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যের সরকার এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার কি সেই আপত্তি জানাতে পারবে?
editorial
ধোঁয়াশায় জি রামজি
×
Comments :0