Editorial

কাকে দিয়েছে রাজার পাঠ

সম্পাদকীয় বিভাগ

ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পাতে মিড ডে মিলের খাবার তুলে দেবার দায়িত্ব রাজ্যের নতুন আরএসএস-বিজেপি সরকার যে ইস্কনকে দিয়েছে তাদের নৈতিকতা, সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সংস্থার অভ্যন্তরেই গুরুতর প্রশ্ন উঠে গেছে। ইস্কনের অভ্যন্তরীণ চিঠি, অডিট রিপোর্ট এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে ভূরি ভূরি অভিযোগ। এমনকি ২০১৫ সালের জাতীয় হিসাবরক্ষকও (সিএজি) তাদের রিপোর্টে এমন অনিয়মের আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিল। অভিযোগগুলির মধ্যে অনেকগুলিই বেশ গুরুতর। অন্ধ ধর্মবিশ্বাসীদের চোখে যেসব প্রতিষ্ঠান নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক ইস্কন তাদের একটি। ধর্ম সংস্থার পরিচালনা করে ‍‌নিঃস্বার্থ ধার্মিকরা এমনটাই বিশ্বাস করেন ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই সর বিশ্বাসের মর্যাদা যে বেশিরভাগ ধর্মসংস্থা, মন্দির কর্তৃপক্ষ রাখেন না তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক নজির অযোধ্যার রামমন্দির এবং ইস্কন।
ইস্কন কেন্দ্রীয় ধর্মসংস্থা হলেও তার অধীনে আছে অনেক তথাকথিত স্বতন্ত্র সংস্থা। এনজিও হিসাবে পরিচিত অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন তার অন্যতম। সারাদেশে ১২টি রাজ্যে ১৯০৩৯টি স্কুলের ১৮ লক্ষ পড়ুয়াকে ইস্কন মিড ডে মিলের খাবার বণ্টন করে এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। ২০০৯ সালে কর্নাটকে তৎকালীন বিজেপি সরকারের হাত ধরে মিড ডে মিলের কাজে ইস্কনের হাতে খড়ি। তারপর থেকে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি’র ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে ইস্কনের কাজও বেড়েছে। এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে শিশুদের সেবায় উজাড় করে দেবার জন্য ইস্কন এ কাজ করছে। যদি তা হতো তাহলে তাদের সরবরাহ করা খাবারের মান অনেক বেশি উন্নত হতো। সর্বত্র ইস্কন ভক্তদের যে ভোগ খাওয়ায় এবং তার জন্য যে মূল্য আদায় করে তা বাজার দর থেকে অনেক বেশি। যদি লাভ ছাড়া ভক্তদের ভোগ বিতরণ করা হতো তাহলে ভোগের মূল্য অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু ইস্কন উদ্বৃত্ত মূল্য রেখেই মি ডে মিল সরবরাহ করে না। তাদের কেন্দ্রীয় রান্না ব্যবস্থায় আধুনিক পরিকাঠামোর ফলে খরচ স্বাভাবিকের চেয়েও কমে যায়। এতদসত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে অর্থ তছরূপ, আর্থিক বেনিয়ম, চাল চুরির মতো গুরুতর অভিযোগ আছে। অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পাওয়া সরকারি অর্থ ও দর্শনার্থীদের দান কোটি কোটি টাকা মন্দির ট্রাস্টের কাজে খরচ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে জানা যায় ইস্কন মিড ডে মিলের খাবার তৈরির খরচ অস্বাভাবিক বেশি দেখিয়ে বাড়তি টাকা আত্মসাৎ করছে। ধর্মসংস্থার মধ্যে এমন অসাধুতা, অনৈতিক কাজ, অসততা সরল ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কল্পনাও করতে পারেন না। তবে ধর্মের নামে, দেবতাদের নামে বেশিরভাগ জায়গাতেই এমনটা ঘটে থাকে। ধর্মসংস্থাতেই যদি এমন দুর্নীতি বাসা বাঁধে তাহলে ধর্মবিশ্বাসী কোথায় যাবেন। তাই এধরনের সন্দেহজনক সংস্থার মাধ্যমে নিষ্পাপ শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেবার কথা ভাবাও গুরুতর অপরাধ। শুভেন্দু সরকারকে অবিলম্বে ইস্কনকে দিয়ে মিড ডে মিলের খাবার বণ্টনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে।
স্থানীয় প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবারই মিড ডে মিলের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। তাছাড়া এতে স্থানীয় মহিলারা কাজ পেতে পারেন। আবার স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য ও অন্যান্য উপাদান কেনার ফলে স্থানীয় বাজার উপকৃত হয়। তা না হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপছন্দের খাবার জোর করে চাপানো হবে। শিশুদের পছন্দের খাবারের অধিকার আছে। সেই অধিকার কেড়ে নেবার অধিকার কোন সরকারের থাকতে পারে না। শিশু যে অঞ্চলে যে ধরনের খাবার খেয়ে বড় হয়েছে, সেই খাবারই তাদের দিতে হবে।
 

Comments :0

Login to leave a comment