গল্প | পান-ওয়ালা
সৌরীশ মিশ্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২৭ জুন ২০২৬
ব্যাংক থেকে বেরিয়েই বুঝতে পারলো তপন যে সে মস্ত একটা ভুল করে বসেছে, যে রিকশাটায় এসেছিল সেটাকে ছেড়ে দিয়ে।
ওর বাবা-কে নিয়ে ব্যাংকে এসেছিল তপন ঘন্টা দুয়েক আগে।
তপনের বাবা ভালোই অসুস্থ। বছর দু'য়েক আগে, তপনের তখন ক্লাস নাইন, হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন তপনের বাবা। প্রথম ক'মাস তো শয্যাশায়ীই ছিলেন পুরো। তারপর এই দু'বছরে ধীরে ধীরে সেই অবস্থার উন্নতি হয়েছে অনেকটাই, কিন্তু, এখনও বড় দুর্বল তিনি। কারোর সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না আজো।
তবু, একটা দরকারে তাঁকে নিয়ে আস্তেই হয়েছে আজ তপনকে এই ব্যাংকে। তবে ব্যাংকে অসুবিধা হয়নি একটুও। ব্যাংককর্মীরা সাহায্য করেছেন তপনকে যথেষ্ট। হুইলচেয়ারের ব্যবস্হাও করে দিয়েছিলেন তাঁরা তপনের বাবার জন্য। আর, ওর বাবার কাজটাও করে দিয়েছিলেন অত্যন্ত দ্রুততার সাথেই।
তাছাড়া, বাবা-কে নিয়ে আসার সময়ও তেমন কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় নি তপনকে। একটা রিকশা ডেকে এনেছিল সে বাড়িতে। বাড়ি থেকেই বাবা-কে নিয়ে চলে এসেছিল সোজা এখানে।
এই ব্যাংকের ঠিক সামনেই একটা রিকশার স্ট্যান্ড। যখন এসেছিল তপনরা তখন লাইন দিয়ে রিকশা দাঁড়িয়ে সেখানে। তাই, তপন ভেবেছিল, ব্যাংকের কাজ হয়ে গেলে এখান থেকেই ও একটা রিকশা নিয়ে নেবে। কিন্তু, ব্যাংক থেকে বেড়িয়ে এখন যখন তপন দেখল যে স্ট্যান্ডটায় একটা রিকশাও নেই, তখন সে অবাকই হোলো বেশ।
বাবা-কে ধরে-ধরে নিয়ে এল রিকশাস্ট্যান্ডটার সামনে তপন। বাবার দিকে তাকালো সে। দেখল ঘামছে ওর বাবা।
"বাবা, গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে না তোমার? জল খাবে একটু? জল আছে সঙ্গে।" বাবাকে জিজ্ঞেস করে তপন।
"না, ঠিক আছে।" অতি ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে বলেন তপনের বাবা রতনবাবু।
বাবা মুখে না বললেও বাবার যে কষ্ট হচ্ছে তা ভালোই বুঝতে পারে তপন। একদিকে অসুস্থ মানুষ, তার সঙ্গে আবার এই ভ্যাপসা গরম।
কি করা যায়, ভাবতে থাকে তপন। বাবাকে একা ছেড়েও যাওয়া যাবে না, যে এগিয়ে গিয়ে দেখবে ও সামনে কোথাও রিকশা পাওয়া যায় কি না। আর, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে কখন রিকশা আসবে তা কে জানে! এইসব ভাবছে ও আর এ'দিক-ও'দিক তাকাচ্ছে, তখনই কে যেন ওদের পিছন থেকে বলে উঠল, "রিকশার জন্য অপেক্ষা করছো?"
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় তপন। দেখে, রিকশাস্ট্যান্ডটার পাশে একটা পানের দোকান। সেটারই দোকানদার বলেছে ওকে কথাকটা।
"হ্যাঁ।" বলে তপন।
"এখন এই স্ট্যান্ডে রিকশা পাওয়া মুশকিল।" ফের বলতে থাকে পানের দোকানদার। "দুপুরের সময় তো, সবাই খেতে যায় এইসময়। তবে ঐ দিকে অফিস পাড়ায় আর একটা রিকশাস্ট্যান্ড আছে। সেটা বড় স্ট্যান্ড। ওটাতে রিকশা থাকে সবসময়।"
"তাহলে বাবা, তুমি একটু ওয়েট করো। আমি ছুটে উনি যে স্ট্যান্ডটার কথা বলছেন সেটা থেকে একটা রিকশা নিয়ে আসি, কেমন?" বাবাকে বলে তপন।
রতনবাবু কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই ফের বলে উঠল সেই পান-ওয়ালা। "তোমার গিয়ে কাজ নেই। তুমি চলে গেলে, তারপর দেরী হলে, উনি চিন্তা করবেন। অসুস্থ মানুষ উনি এমনিতেই। আমি যাচ্ছি। তুমি শুধু আমার দোকানটার দিকে একটু নজর রেখো।" বলতে বলতেই তার দোকান থেকে নেমে ফুটপাথে রাখা তার চটিজোড়া গলিয়েই এক ছুট লাগাল ফুটপাথ ধরে সেই পান-ওয়ালা। আর কয়েকক্ষণের মধ্যেই তপনের চোখের আড়ালেও চলে গেল সে।
মিনিট পাঁচেক মতোন কেটেছে এরপর। এখনো ঐ পান-ওয়ালা ফিরে আসেনি। এইদিকে এই স্ট্যান্ডেও আসে নি কোনো রিকশা। বাবা মুখে না বললেও বাবার যে বেশ কষ্ট হচ্ছে এখন ভালোই বুঝতে পারছে তপন। ও কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। সে উদগ্রীব হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেদিকে ঐ পান-ওয়ালা গিয়েছিল সেইদিকে। তখনই, পান-ওয়ালার কণ্ঠস্বর শুনতে পায় তপন যে দিকে তাকিয়েছিল সে তার উল্টোদিক থেকে। "এই যে এসে গেছি, এসে গেছি।"
তপন পিছন ফিরে দেখে একটা রিকশা ধরে নিয়ে এসেছে ঐ পান-ওয়ালা। রিকশাটা দাঁড় করায় ঐ পান-ওয়ালা তপনদের সামনেটায়। তারপর রিকশা থেকে নামতে-নামতে সে বলতে থাকে, "যে স্ট্যান্ডের কথা তোমাকে বলেছিলাম ওখানে পেলাম না। ওটার থেকে একটু দূরে আর একটা স্ট্যান্ড আছে। সেটা থেকে নিয়ে এলাম। তাই দেরী হোলো। নাও, বাবাকে নিয়ে উঠে পড়ো।"
তপন দেখল দরদরিয়ে ঘামছে পান-ওয়ালা।
তপন আর থাকতে পারে না। পান-ওয়ালার দু'হাত তার দু'হাতে চেপে ধরে সে।
পান-ওয়ালা ঠোঁটের কোণে একটু হেসে বলে, "তোমাকে দেখে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল, জানো। আমার বাবা-ও অসুস্থ ছিল খুব। তোমার বাবার মতোই হাঁটতে-টাটতে পারতো না। আমিই সব করতাম বাবার। কোথাও নিয়ে যাওয়ার হলে আমিই নিয়ে যেতাম, ঠিক তুমি যেমন নিয়ে এসেছো তোমার বাবাকে, ঠিক ঐরকম করে। বাবা ছেড়ে গেছে আমায় অনেক দিন হয়ে গেল। আজ তোমার বাবার জন্য ঐটুকু করতে পেরে আমার এতোদিন পর আবার মনে হোলো আমার বাবার জন্যই ফের একটু কিছু করতে পারলাম..." আবেগে এবার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে যায় তার। চোখ ছলছল করে ওঠে পান-ওয়ালার।
রতনবাবু পাশে দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ শুনছিলেন সব। তিনি এবার তাঁর কাঁপা-কাঁপা বাঁ হাতখানা আস্তে-আস্তে তুলে রাখলেন পান-ওয়ালার কাঁধে। তারপর ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, "তোমার ভালো হোক, ভাই। আসলাম, কেমন?"
"হ্যাঁ আসুন। সাবধানে নিয়ে যেও বাবাকে।" শেষ বাক্যটা তপনকে বলে পান-ওয়ালা।
"হ্যাঁ।" বলে তপন।
তপন ধরে ধরে ওর বাবাকে রিকশায় তোলে। ও-ও উঠে বসে পাশে।
রিকশা চলতে শুরু করে।
একটু এগোতে রিকশা, পিছনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তপন তাকায়। দেখে, পান-ওয়ালা তখনো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের রিকশারই দিকে।
তপন হাত নাড়ে।
ঐ দেখে, পান-ওয়ালাও হাত নাড়ে সাথে সাথে।
Comments :0