Refugees

বিশ্বজুড়ে বিপন্ন উদ্বাস্তু জীবন

স্পটলাইট

অর্ণব ভট্টাচার্য

গত আড়াই দশক ধরে ২০ জুন বিশ্ব উদ্বাস্তু দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। এ’ বছর রাষ্ট্রসঙ্ঘ এই আন্তর্জাতিক দিবসের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেছে ‘আনটিল এভরিওয়ান ইজ সেফ’। অর্থাৎ প্রত্যেক বাস্তুহারা মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এই সময় সবচেয়ে জরুরি কাজ। কেননা বিশ্বের দেশে দেশে নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন উদ্বাস্তু জনগণ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে যুদ্ধ, হিংসাত্মক সংঘাত, নিপীড়ন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য ১১ কোটি ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে রয়েছেন। এই অসহায় মানুষদের উপযুক্ত নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা পৃথিবীতে উদ্বাস্তু সমস্যা চরম আকার ধারণ করলে এই বাস্তুচ্যুত মানুষদের মানবাধিকার নিশ্চিত করবার জন্য ১৯৫১ সালে জেনেভায় উদ্বাস্তু কনভেনশন হয়। এই কনভেনশন উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলে যে কোনও ব্যক্তি ধর্ম, জাতীয়তা, কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যপদ অথবা রাজনৈতিক মতামতের কারণে নিজের দেশে চরম নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় জন্মভূমির বাইরে চলে যেতে বাধ্য হলে তিনি উদ্বাস্তু হিসাবে স্বীকৃতি পাবেন। কনভেনশনে এই নীতি গৃহীত হয় যে, উদ্বাস্তুদের এমন কোনও দেশে বা অঞ্চলে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। এর সঙ্গে সঙ্গে উদ্বাস্তুদের কিছু মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করবার কথা বলা হয়, যেমন আশ্রয় পাওয়ার অধিকার, আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ও আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার, আবাসন-কাজ ও শিক্ষার অধিকার, চলাচল ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার ইত্যাদি। পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালের ৩১ জানুয়ারি নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত আরেকটি উদ্বাস্তু সম্মেলনে একটি প্রোটোকল বা বিধি রচিত হয় যা ১৯৫১ সালের কনভেনশনে আলোচিত উদ্বাস্তু সমস্যার ভৌগোলিক ও সময়গত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে উদ্বাস্তুদের সুরক্ষাকে সর্বজনীন ও বিশ্বব্যাপী রূপ দেয়। এখনো পর্যন্ত বিশ্বের ১৪৬ টি দেশ এই প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু আমাদের দেশ এই প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেনি যদিও ভারতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক উদ্বাস্তু মানুষের বসবাস। এই প্রোটোকলের স্বাক্ষর না করার জন্য এদেশের উদ্বাস্তুরা রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসাবের বাইরে বরাবর থেকে গিয়েছেন। আমাদের দেশে উদ্বাস্তু সমস্যা এখনো পর্যন্ত অমীমাংসিত থাকলেও এদেশে উদ্বাস্তু সংক্রান্ত কোনও সুনির্দিষ্ট নীতি নেই।  কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গে এখনো উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তর আছে, কেন্দ্রীয় সরকার এ সংক্রান্ত কাজ বহু আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।
১৯৫১ সালের ঐতিহাসিক কনভেনশনের পর ৭৫ বছর কেটে গিয়েছে, কিন্তু উদ্বাস্তু সমস্যা কমার বদলে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পরেও পৃথিবীর ওপর থেকে যুদ্ধের রক্তমেঘের ছায়া সরে যায়নি। বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসরদের সামরিক আগ্রাসন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহীন করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান, সুদান, সিরিয়া, মায়ানমার, লেবানন,লিবিয়া, ইউক্রেনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলি থেকে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে ভিনদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার ইজরায়েলের হানায় ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় গাজার কয়েক লক্ষ মানুষ নিজ দেশের অন্যপ্রান্তে কোনোমতে তাঁবুতে ও আশ্রয় শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজের দেশেই নানা কারণে বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন। সব মিলিয়ে সারা পৃথিবীতে উদ্বাস্তু সমস্যা যে আকার ধারণ করেছে তাতে এই মানবিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে প্রতিটি দেশের সুনির্দিষ্ট উদ্বাস্তু সংক্রান্ত নীতি এবং মানবিক ও সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া প্রয়োজন।
এটা লক্ষণীয় যে বিশ্বজুড়ে ক্রমশ বিপন্ন হচ্ছে উদ্বাস্তু জীবন। মূলত স্বল্প ও নিম্ন আয় ভুক্ত দেশগুলিতেই অধিকাংশ উদ্বাস্তু মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন । উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশে ১২ লক্ষেরও বেশি মায়ানমারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু রয়েছেন যারা মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। কক্সবাজার ও ভাসানীর চরে তাদের চরম দুর্দশার জীবনের অবসানের আপাতত কোনও লক্ষণ নেই কেননা আন্তর্জাতিক সহায়তা অত্যন্ত কম। অন্যদিকে মায়ানমার সরকারও তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কোনও আগ্রহই দেখাচ্ছে না। অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও উদ্বাস্তুদের প্রতি ব্যাপক বিরূপ মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতি দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পুঁজিবাদের সঙ্কট জনিত হতাশা ও রাগকে হাতিয়ার করে বাস্তুহারা ভিনদেশি মানুষ ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ইউরোপের আম জনতাকে ক্ষেপিয়ে তুলছে। মিথ্যে বয়ান তৈরি করা হচ্ছে একথা প্রমাণ করতে যে এই বাস্তুহারা মানুষ ও অভিবাসীরা দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির পক্ষে বিপজ্জনক। সাম্প্রতিককালে ইউরোপের দেশে দেশে জাতি বিদ্বেষীরা হিংসা ছড়িয়েছে লাগামহীনভাবে যার ফলে একটা ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বর্তমানে ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন যেভাবে আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলির ফুটবল দলের সঙ্গে কদর্য আচরণ করা হচ্ছে তাতে এ কথা প্রমাণিত যে এই দেশগুলির মানুষের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন কতটা ঘৃণার মনোভাব পোষণ করে। ইউরোপের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি জার্মানি ২০১৫ সালের পরে উদারভাবে উদ্বাস্তুদের আমন্ত্রণ  জানিয়েছিল। আজ সেই দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা উদ্বাস্তু এবং অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে ব্যাপকভাবে। ইউরোপে বিগত দুটি নির্বাচনে উদ্বাস্তু ও অভিবাসী বিরোধী পার্টিগুলির জনসমর্থন প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গিয়ে ২৭.৬ শতাংশ হয়ে গিয়েছে। হাঙ্গেরির সরকার এমন ব্যবস্থা করেছে যে আইনিভাবে কোনও উদ্বাস্তু হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করতে পারছে না। সার্বিয়া এবং হাঙ্গেরির বর্ডারে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ছাড়াও সশস্ত্র নাগরিকদের মোতায়েন করেছে সরকার। ইউরোপে সুইডেন এক সময় উৎপীড়িত উদ্বাস্তুদের আশ্রয়স্থল হিসাবে পরিচিত ছিল। সেই দেশে এখন অভিবাসন বিরোধী সোশাল ডেমোক্র্যাট পার্টি দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি। তারা দাবি করেছে যে সুইডেনে নানারকম সামাজিক সমস্যার জন্য এই অভিবাসীরাই দায়ী। অভিবাসন বিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে তীব্র ইসলামবিদ্বেষ। সারা পৃথিবীতে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা তথাকথিত জাতিগত পবিত্রতার ধারণায় বিশ্বাসী এবং কোনোরকম সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ ও মেলবন্ধনের বিরোধী। লুটেরা পুঁজিবাদ এই সমস্ত উগ্র ভাবধারাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে যাতে কর্পোরেট সংস্থাগুলির শ্রমিক শোষণ, ছাঁটাই, প্রকৃতির ওপর কর্পোরেট আগ্রাসন, যুদ্ধবাজদের পৃষ্ঠপোষকতার মতো ধ্বংসাত্মক বিষয়গুলির প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষিত না হয়। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট শহরে ব্যাপক অভিবাসী বিরোধী হিংসা ছড়িয়েছিল। শুরু হয়েছিল আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের ওপর হামলা দিয়ে, তারপর দেখা গেল ভারতীয়দের দোকানও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও উদ্বাস্ত ও অভিবাসী বিরোধী বিক্ষোভ এবং হিংসা লক্ষ্য করা গিয়েছে। একদিকে যেমন ক্রমাগত উদ্বাস্তু ও অভিবাসী বিরোধী বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে অন্যদিকে নিরুপায় মানুষ প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে পাড়ি দিতে গিয়ে নানারকম বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। গত দশ বছরে ইউরোপে আসতে গিয়ে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। উদ্বাস্তু ও অভিবাসীরা অনেকে মানব পাচার চক্রেরও শিকার হচ্ছেন। সাহারা মরুভূমিতে ছেড়ে দেওয়া বা বিপজ্জনকভাবে নৌকায় তুলে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এ সময় উদ্বাস্তুদের বা অভিবাসীদের পুনরায় তাদের জন্মভূমিতে যেতে বাধ্য করার ঘটনা বিভিন্ন দেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রেই উদ্বাস্তু বা অভিবাসীদের বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করে। এক্ষেত্রে উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া না থাকলে মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেই এখন বর্ডারে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর পুশব্যাক একটা বহুল চর্চিত বিষয় হয়ে গিয়েছে। ধর্ম এবং জাতীয়তাকে একাকার করে দিয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা এমন বয়ান তৈরি করছে যেখানে নির্দিষ্ট ভাষা ও ধর্মের মানুষ উপযুক্ত তথ্য যাচাই করার আগেই অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। গত বছর বীরভূমের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালি খাতুনকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে বলপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়া এবং তারপরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাকে ফিরিয়ে আনার ঘটনা আমাদের সকলের জানা। এখন আইনি-বেআইনি বিতর্ককে প্রভাবিত করছে ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতি। সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ আর বিজিবি’র বিতর্কের মাঝে সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে একটি পরিবারের কিশোরী সদস্যা- ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাঠরতা একটি মেয়ের করুণ আর্তনাদ সকলের নজর কেড়েছিল। দুই রাষ্ট্রের প্রশাসন ও সীমান্ত বাহিনীর বাক্‌বিতণ্ডার মাঝে ফুটে উঠেছিল এক ছোট্ট মেয়ের অসহায়তা যার দায়িত্ব কোনও রাষ্ট্র নিতে নারাজ। এই কিশোরীকে উদ্দেশ্য করে যেরকম অশ্লীল, নির্মম ও ভয়ানক সব কটূক্তি করা হয়েছে সোশাল মিডিয়ায় তা কয়েক বছর আগে ভাবাও যেত না। কেউ বলেছে মেয়েটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করে দিতে, কেউ তাকে মৃতদেহ হিসাবে মেডিক্যা ল কলেজে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে, কেউবা তাকে ক্রীতদাসী বানাতে চেয়েছে। এই চরম মানসিক বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ যারা দেখিয়েছেন তারা সকলেই শিক্ষিত নারী, পুরুষ। এক অসহায় কিশোরীর প্রতি কোনোরকম সহানুভূতির বদলে তাকে মনুষ্যেতর কোনও বিপজ্জনক জীব হিসাবে ভাবা হচ্ছে যাকে অবলীলায় হত্যা করা বা পঙ্গু বানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও উগ্র দক্ষিণপন্থার দর্শন এভাবেই দেশে দেশে "অপর"-এর ধারণা তৈরি করছে। এই "অপর" কখনো উদ্বাস্তু বা অধিবাসী, কখনো সংখ্যালঘু মানুষ বা উভয়েই । তাই আমাদের দেশে এক কোটি রোহিঙ্গাকে তাড়ানোর’ গল্প ছড়িয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। সীমান্ত বা কাঁটাতার রাজনৈতিক প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে। অনেকসময় মানুষ নিরুপায় হয়ে  সীমান্ত লঙ্ঘন করে। কখনো দূরভিসন্ধি নিয়ে কেউ কেউ অন্য দেশে প্রবেশ করে, সেটা দেখা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু সীমানা পেরোনো মানুষ মানেই তাকে সন্দেহের তালিকায় রাখা এবং তার মানবিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রসঙ্ঘ এই নেতিবাচক প্রবণতা দূর করার কথা বারে বারে বলেছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত রেখেই এই কাজ করা সম্ভব।
আমাদের দেশে দেশভাগের ফলে পূর্ব ও পশ্চিম দুই সীমান্ত দিয়েই লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষ এসেছেন। পশ্চিম সীমান্ত পেরোনো উদ্বাস্তুরা সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য পেলেও পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুরা দশকের পর দশক উপেক্ষিত থেকেছেন। আমাদের রাজ্যে কেবলমাত্র বামপন্থীরা ১৯৫০ সাল থেকে লাগাতার উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য আন্দোলন করে চলেছে। ইউসিআরসি’র নেতৃত্বে চলা এই মরণপণ সংগ্রামের ফলে ১৯৬৭ ও '৬৯ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং তারপর ১৯৭৭ সাল থেকে একটানা ৩৪ বছর বামফ্রন্ট সরকার উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের কাজ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে উগ্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী শক্তি উদ্বাস্তুদের পাশে কখনো থাকেনি। এমনকি কেন্দ্রে প্রথমে বাজপেয়ী এবং বর্তমানে নরেন্দ্র মোদী সরকার রাজ্যের উদ্বাস্তু মানুষের পুনর্বাসনের জন্য কোনোরকম অর্থ বরাদ্দ করেনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলা ভাগের ‘কৃতিত্ব’ দাবি করছে যারা তারা দেশ ভাগ তথা বাংলা ভাগের শিকার উদ্বাস্তুদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কেন উদ্যোগী হয়নি। আজ যখন নির্বিচারে হকার উচ্ছেদ হচ্ছে তখন বহু উদ্বাস্তু পরিবার নতুন করে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ছেন। তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে কোন স্বর্গরাজ্য নির্মাণ করতে চাইছেন হিন্দুত্ববাদীরা? উদ্বাস্তু আন্দোলনের প্রবাদপ্রতীম নেতা সমর মুখার্জি বলেছিলেন,‘উদ্বাস্তুরা বোঝা নন, সম্পদ’। আজ ধান্দার ধনতন্ত্র দেশে দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থার পৃষ্ঠপোষকতা করে উদ্বাস্তুদের অস্তিত্বের যে সঙ্কট সৃষ্টি করছে তাকে প্রতিহত করবার জন্য প্রগতিশীল মানুষকে সঙ্ঘবদ্ধ হতে হবে। এক মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে যেখানে উদ্বাস্তুরা নিরাপদ থাকবেন, বঞ্চনা ও উপেক্ষার জীবন যাপন করতে বাধ্য হবেন না।

Comments :0

Login to leave a comment