NATUNPATA | MONDA MITHI | OPARESION BADHU | GOUTAM ROY | 16 AUGUST 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | মণ্ডা মিঠাই | অপারেশন বাদু | গৌতম রায় | ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  MONDA MITHI  OPARESION BADHU  GOUTAM ROY  16 AUGUST 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

মণ্ডা মিঠাই

অপারেশন বাদু

গৌতম রায়

৯ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

 
বাজারে যদি একটা লোক থাকে যার কাছে অক্সিজেনের চেয়েও বেশি দরকারি হলো শ্রোতা, তবে সে হলো আমাদের বাদু। পুরো নাম বাদল চন্দ্র দাস, কিন্তু কেউ ওই নামে ডাকলে সে নিজেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাবে না। বাদু নামটাই তার ব্র্যান্ড।
বাদুর বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, পেশা? নিজের ভাষায় সে "ফ্রি-ল্যান্স অ্যাডভাইজার"। মানে পাড়ার যে কোনও  বিষয়ে ফ্রিতে জ্ঞান বিতরণ করে। আসল পেশা কিছুই না। সকাল দশটায় ঘুম থেকে উঠে, মুখ না ধুয়েই সোজা হাজির হয় শ্যামবাজারের মোড়ে, নিতাইদার চায়ের দোকানে।
নিতাইদার দোকানের লম্বা বেঞ্চিটা বাদুর সিংহাসন। ওখানে বসে সে ঢপ দেয়। সে ঢপ মানে যে সে মাপের ঢপ না। "বুঝলি নিতাই, অমিতাভ বচ্চন একবার আমার অটোতে উঠেছিল। বলল, বাদুদা, তোমার মতো টাইমিং কেউ দিতে পারবে না।"
কেউ বিশ্বাস করে না। কিন্তু শুনতে হয়। কারণ বাদু বেঞ্চি জুড়ে এমনভাবে বসে যে আর কেউ বসতে পারে না। এক ঠ্যাং তুলে, হাত নেড়ে, চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে গল্প চলতেই থাকে। কখনো সে এভারেস্টে উঠেছে, কখনো সৌরভ গাঙ্গুলীকে ব্যাট ধরতে শিখিয়েছে। নিতাইদা বিরক্ত, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। খদ্দেররা বাদুর ভয়ে দাঁড়িয়ে চা খেয়ে চলে যায়। দোকানের বিক্রি অর্ধেক।
শ্রীধর হলো নিতাইদার ভাগ্নে। সদ্য কলেজ পাশ করে বেকার। কিন্তু মাথায় বুদ্ধি কিলবিল করে। নিতাইদা একদিন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "বাবা শ্রীধর, তুই কিছু একটা কর। এই বাদুকে না তাড়ালে আমার দোকান উঠে যাবে। ওর ঢপের চোটে আমার চায়ের কেটলি পর্যন্ত ভয় পায়।"
শ্রীধর চা খেতে খেতে বাদুকে দুদিন অবজার্ভ করলো। সে বুঝলো, বাদুকে বকা দিয়ে, ঝগড়া করে তাড়ানো যাবে না। বাদু অপমানে আরও জাঁকিয়ে বসবে। একে ইজ্জত দিয়ে মারতে হবে। পরদিন থেকে শুরু হলো 'অপারেশন বাদু'।
অপারেশন ডে ওয়ান:
শ্রীধর বাদুর পাশে এসে বসলো, একদম ভক্তের মতো মুখ করে। "বাদুকাকা, তুমি এত জ্ঞানী মানুষ, এখানে এই চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে তোমার ট্যালেন্ট নষ্ট হচ্ছে গো।"
বাদু অবাক। আজ পর্যন্ত কেউ তার ট্যালেন্টের কদর করেনি। সে বুক ফুলিয়ে বলল, “তুই বুঝেছিস! এই গাধা গুলো বোঝে না!” শ্রীধর বলল, "আমি তোমার জন্য একটা প্রমোশন ভেবেছি।"
"প্রমোশন?"
"হ্যাঁ। তুমি এখন থেকে নিতাইদার চায়ের দোকানের 'বেঞ্চ এম্বাসেডর' না, তুমি হবে জুতোর দোকানের 'চেয়ারম্যান'।"
পাশেই ছিল পটলার জুতোর দোকান। সেখানে এসি আছে, নরম গদির চেয়ার আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা, সারাদিন লোক আসে জুতো ট্রাই করতে, মানে বাধ্য হয়ে বসে থাকতে হয়। মানে একদম বন্দী শ্রোতা।
বাদু প্রথমে একটু ঘাবড়ালো। "জুতোর দোকান? আমি জুতো সেলাই করতে যাবো নাকি?"
শ্রীধর আঁতকে উঠলো, “ছি ছি! তুমি সেলাই করবে কেন? তুমি হবে 'কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স অফিসার'। বড় বড় শোরুমে থাকে। তোমার কাজ হবে, লোককে জ্ঞান দেওয়া। যেমন কেউ জুতো কিনতে এলে তুমি বলবে কোন জুতো পরে হিমালয়ে ওঠা যায়, কোনটা পরে দৌড়লে অলিম্পিকে যাওয়া যায়। তোমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করবে।” বাদুর চোখ চকচক করে উঠলো। হিমালয়, অলিম্পিক! এ তো তারই সিলেবাস।
শ্রীধর আরও ঘি ঢাললো, "আর ওখানে চা ফ্রি। নিতাইদা রোজ দু'বার চা পাঠিয়ে দেবে চেয়ারম্যান স্যারকে। আর বেঞ্চ না, রাজার মতো গদি চেয়ার।"
ব্যস। বাদু উঠে দাঁড়ালো। নিজের গামছাটা কাঁধে ফেলে গম্ভীর গলায় বলল, "নিতাই, অনেক করলি। এবার আমাকে বড় জায়গায় যেতে হবে। দেশের জন্য আমার অভিজ্ঞতা দরকার।"
নিতাইদা প্রায় হাতজোড় করে বলল, “যাও বাবা বাদু, দেশের সেবা করো।” এইভাবে বাদুর উচ্ছেদ হলো। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। আসল মজা শুরু হলো জুতোর দোকানে গিয়ে।
পটলার জুতোর দোকানে বাদু গিয়ে সিংহাসনে বসলো। প্রথম খদ্দের এলো, একটা বাচ্চা ছেলে স্কুলের জুতো কিনতে। বাদু শুরু করলো, "এই জুতো? এই জুতো পরে আমি একবার সুন্দরবনে বাঘের পিছনে দৌড়েছিলাম..."
বাচ্চাটা ভয়ে কেঁদে ফেললো। তার মা জুতো না কিনেই পালালো।
দ্বিতীয় খদ্দের, এক অফিসের ভদ্রলোক। বাদু বলল, "এই কালো অক্সফোর্ড? এটা পরে আমি একবার ব্রিটেনের রানীর সঙ্গে ডিনার করেছিলাম। রানী বলল, বাদু, তোমার জুতোয় এত পালিশ কী করে?"
ভদ্রলোক জুতো রেখে খালি পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল প্রায়। পটলা তো রেগে আগুন। সে শ্রীধরের কাছে গিয়ে বলল, "এই তোর চেয়ারম্যান? আমার দোকান লাটে উঠবে! ওকে ফেরত নে!"
শ্রীধর মুচকি হেসে বলল, "পটলাদা, একটু ধৈর্য ধরো। খেলা এখনো বাকি আছে।"
শ্রীধর বাদুর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বাদুকাকা, তুমি ভুল করছো। এখানে সবাইকে গল্প বললে হবে না। তোমাকে 'সিলেক্টিভ' হতে হবে। তুমি শুধু তাদেরই গল্প বলবে যারা জুতো পরে বসে আছে, যারা উঠতে পারবে না।"
বাদুর মাথায় বুদ্ধি এলো। তাই তো! যে দাঁড়িয়ে আছে সে পালিয়ে যাবে, কিন্তু যে এক পায়ে জুতো গলিয়েছে, সে তো পালাতে পারবে না।পরদিন থেকে পটলার দোকানের বিক্রি তিনগুণ বেড়ে গেল।
কারণ লোকজন বুঝে গেল, বাদুর হাত থেকে বাঁচতে একটাই উপায়। জুতো পছন্দ হলেই তাড়াতাড়ি কিনে কেটে পড়ো। যত দেরি করবে, তত ঢপ শুনতে হবে। কেউ কেউ তো জুতো ট্রাই না করেই বলতো, "ভাই, ওইটাই প্যাক করে দাও, সাইজ দেখতে হবে না।"
পটলা খুশি। নিতাইদা খুশি। কারণ তার চায়ের দোকানের বেঞ্চি এখন ফাঁকা, খদ্দেররা শান্তিতে বসে চা খায়।
আর বাদু? বাদু এখন জুতোর দোকানের স্থায়ী চেয়ারম্যান। তার নতুন গল্প শুরু হয়েছে, "বুঝলি পটলা, আমি যখন নাসায় গেছিলাম, তখন ওরা আমাকে এই জুতোটাই পরতে বলেছিল, মহাকাশে গ্র্যাভিটি নেই তো..."
শ্রীধর দূর থেকে দেখে হাসে। সে জানে, বাদুর মতো বাতেলাবাজকে থামানো যায় না, শুধু তার বেঞ্চিটা বদলে দেওয়া যায়। এটাই ছিল তার অপারেশন বাদুর আসল সাকসেস।
 

Comments :0

Login to leave a comment