Spotlight

ইতিহাসের পথ চিনিয়েছেন বহু বিদ্যাবিশারদ ডিডি কোসাম্বি

স্পটলাইট

সুদীপ্ত সাহারায়

দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি (৩১জুলাই, ১৯০৭- ২৯জুন, ১৯৬৬) ছিলেন এক ব্যতিক্রমী পণ্ডিত, নবজাগরণের অগ্রদূতদের মধ্যে যে বহুবিদ্যায় পারদর্শিতা এবং গভীর ও বিস্তৃত পাণ্ডিত্য দেখতে পাওয়া যেত তিনি ছিলেন তারই প্রতিরূপ। কিন্তু কোসাম্বির জীবনের সবচেয়ে বড় দিক ছিল তিনি কখনও গজদন্ত মিনারে বসে থাকা পণ্ডিত ছিলেন না। ভেবেছেন মানুষকে নিয়ে, তাঁদের শোষণমুক্তি  সম্পর্কে। স্বদেশে, কোথায় বাঁধ হবে তার স্থান নির্বাচনে ও নির্মাণে সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তকে তিনি রাশি বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিক থেকে আপত্তি জানিয়েছেন। তদানীন্তন বোম্বাই শহরে মরশুমি মৃত্যু প্রতিরোধ করতে তিনি বর্ষা আসার মুখে তিন সপ্তাহ টাইফয়েড বিরোধী কর্মসূচি গ্রহণের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে পরামর্শ দিলেন। দেখিয়ে ছিলেন বোম্বাই শহরে ফি বছরে অন্তত ৫০০ মানুষের অকাল মৃত্যু কীভাবে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। চীনের  বেজিঙে এক আমন্ত্রণী সফরে তিনি চীনা খাদ্যশস্য উৎপাদনের আগাম ঘোষণা করতে ও শিল্পজাত দ্রব্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে রাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর এই আলোচনায় শ্রোতাদের মধ্যে চৌ এন লাই এবং চীনা সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রনেতা কুয়ো মো জো উপস্থিত ছিলেন। তিনি স্বদেশের সরকারকে বিকল্প শক্তির উৎস হিসাবে বহু ব্যয় সাপেক্ষ পারমাণবিক শক্তির বদলে সৌরশক্তি উৎপাদনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে সরকারের কাছে আরজি জানিয়েছিলেন আজ থেকে পৌনে এক শতাব্দীরও আগে। এতটাই দূরদর্শী ছিলেন তিনি।
একজন গণিতজ্ঞ ও রাশি বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি জেনাটিক্স বা জিনবিদ্যাতেও অবদান রেখেছিলেন, শুধু তাই নয় আমাদের দেশে নিউমিস্মাটিক্স বা মুদ্রাবিদ্যাতেও তাঁর অবদান পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। আধুনিক ইতিহাস রচনায় তাঁর দিগন্ত উন্মোচনকারী অবদান, ভারততত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব কিংবা ভারতীয় ইতিহাসে জাতপাত বিষয়ে তাঁর প্রগাঢ় বিশ্লেষণ তাঁকে বিশ্বের সারস্বত সমাজের উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক। শুক্রবার ছিল তাঁর ১২০ তম জন্মদিবস। 
গোয়ার কসবেনে তাঁর জন্ম। বাবা ধর্মানন্দ কোসাম্বি ছিলেন বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন বেশ অনেক বছর। বাবার কাছ থেকেই বিদ্যার্জনের মূল প্রেরণা পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন বাবার মেধার বহুমাত্রিকতা ও মানবতাবোধ। বিদ্যালয়ের প্রথাগত শিক্ষা পুনা শহরে। এর পরে তিনি বাবার সঙ্গে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ভর্তি হন কেমব্রিজ ল্যাটিন স্কুলে, ১৯২৫ সালে ওখানে পড়া শেষ করে স্নাতক পর্যায়ে বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ১৯২৯ সালে সেখান থেকে স্নাতক হন। বুৎপত্তি দেখান গণিত, ইতিহাস এবং গ্রিক, লাতিন, জার্মান ও ফরাসি প্রভৃতি ভাষায়। 
হার্ভার্ডে পড়াকালীন তিনি সংস্পর্শে আসেন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ জর্জ বিড়খোফ ও নরবার্ট উইনেরের। দেশে ফিরে ওই বছরই তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপনায় যোগ দেন, গণিতজ্ঞ হিসাবে তাঁর খ্যাতি হতেই তিনি ডাক পান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেখানেও পড়ান এক বছর। ১৯৩২সালে তিনি পুনেতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন, যোগ দেন ফারগুসন কলেজে গণিত বিভাগের অধ্যাপক পদে। উল্লেখ্য, এই কলেজেই তাঁর বাবা দীর্ঘদিন পালি বিভাগে অধ্যাপনা করেছিলেন। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ১৪বছর ফারগুসন কলেজে অধ্যাপনার সময়ে জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর মুনশিয়ানা  তাঁকে আধুনিক ভারতের একজন মহান পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে গণিতের প্রধান অধ্যাপক হিসাবে। ১৯৬২সালে সেখান থেকে অবসর নেন।
সমাজ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গাণিতিক পদ্ধতির অভিনব প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যাচর্চায় তাঁর অবদানকে বিশ্ববিখ্যাত আইরিশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জেডি বার্নাল ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ১৯৪৪ সালে জিনবিদ্যায় তথা জেনাটিকসে ক্রোমোসোমম্যাপিং এর ওপর তাঁর কাজ সেই সময়ের পৃথিবীব্যাপী এই বিষয়ে তাত্ত্বিক গবেষণাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। জিনবিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন সাফল্যের সাথে। ফলে সুপ্রাচীন উপজাতি সমাজের বিভিন্ন গোত্রের আরও সুস্পষ্টভাবে বললে কৌম সমাজের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন কোসাম্বি। ফলে ভারতীয় নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র ও তাদের ব্যবহারগত বৈশিষ্ট্যগুলি উঠে এসেছিল বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক প্রমাণের আলোকে ।
১৯৫৬ সালে কোসাম্বির লেখা এক প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘ভারত-ইতিহাস চর্চার ভূমিকা’ নামে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই  তার সম্পর্কে ইতিহাসের ছাত্র, শিক্ষক, ও গবেষক মহল বলতে শুরু করলেন যে ভারতের ইতিহাসকে দেখার ও  বোঝার এক নতুন দরজা খুলে গিয়েছে। আর কোসাম্বি নিজে এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকার শুরুটা করেছিলেন এইভাবে, ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস হিসাবে এ -বই নিজেকে জাহির করতে চায় না, এটা নিছকই ভারত ইতিহাসকে বোঝার এক আধুনিক প্রয়াস— লেখা হয়েছে এই আশায় যে পাঠক হয়তো নিজের প্রয়োজনেই সেই ইতিহাসকে বুঝতে উদ্বুদ্ধ হবেন, অথবা অন্তত আরেকটু সহানুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে দেশটার দিকে তাকাতে সক্ষম হবেন’।
তিনি পাঠককে বলতে চেয়েছেন, ‘ইতিহাসের দৃষ্টান্তগুলো সহজ, সরল। যে কেউ খুঁজে পেতে পারে প্রতিবেশীদের জীবন ও আচরণের মধ্যে বা তাঁর অঞ্চলে টিকে থাকা প্রাচীনত্বের অবশেষগুলির মধ্যে।’ অর্থাৎ আন্তরিক ক্ষেত্রানুসন্ধান ও তার সঙ্গে বিশ্লেষণামূলক অন্তর্দৃষ্টির যোগফলই  ইতিহাসকে জানার ও বোঝার অন্যতম উপায়, এই ছিল কোসাম্বির অভিমত। কোনও কিছুকে স্বতঃসিদ্ধ বলে বা বিশ্বাসী চোখে বা আবেগতাড়িত সংস্কার দিয়ে দেখলে সেটা আর যাই হোক, ইতিহাস হয় না। এই ছিল তাঁর দৃঢ় মত। তিনি এই বার্তা মানুষকে দিতে চেয়েছেন খুব আন্তরিকভাবে কিন্তু যুক্তির দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যে ইতিহাস কিছু অসংলগ্ন ঘটনার অনুক্রম নয় বরং প্রাত্যহিকতার প্রয়োজন মেটাতে মানুষই তাকে সৃষ্টি করেছিল। তিনি লিখলেন, ‘অনেক মানুষের সমাহারেই কোনও সমাজ গঠিত হয় তখন এবং কেবলমাত্র তখনই, যখন মানুষ কোনও না কোনোভাবে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত হয়। এই আবশ্যক সম্পর্কটা জাতি তত্ত্বমূলক নয়, বরং তার চেয়ে আরও ব্যাপক, অর্থাৎ উৎপাদন ও পণ্যের পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে যা গড়ে ওঠে। সেই নির্দিষ্ট সমাজের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা হয় কোনটাকে সে প্রয়োজনীয় মনে করছে তার দ্বারা, জিনিসপত্র কে দখলে রাখে? কারা উৎপাদন করে? কী কী উপকরণ দিয়ে? অন্যের উৎপাদনে কারা বাঁচে? কোন অধিকারে-ঐশ্বরিক না আইনসম্মত?’ তিনি বললেন ঈশ্বরবিশ্বাস ও আইনসমূহ সমাজেরই উপজাত। তিনি প্রশ্ন করতে থাকলেন–‘উৎপাদনের হাতিয়ার, জমি, এবং উৎপাদকের দেহ ও আত্মার মালিক কে? উদ্বৃত্তের বিলি ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে কারা? বা জোগানের পরিমাণ ও ধরনকে? সমাজ একসঙ্গে বাঁধা থাকে উৎপাদনের বাঁধনে।’ সুতরাং যারা মনে করেন, বস্তুবাদ মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে, মানুষ শুধুমাত্র উদরপূর্তিতেই বেঁচে থাকে না, বরং তার নিজের শাশ্বত আত্মায় ব্যক্তিমানুষের নিয়ন্ত্রণের উপরেই ইতিহাস ও সমাজ নির্ভরশীল। তাঁদের প্রতি কোসাম্বির উত্তর-উদর পূর্তি ছাড়াও তো আবার মানুষ বাঁচে না— সেটা তার আত্মাকে (যদি তেমন কিছু থাকে) দেহের মধ্যে ধরে রাখার জন্যেও তো একান্ত প্রয়োজন। বস্তুবাদ মানবিক মূল্যবোধগুলিকে ধ্বংস করাতো দূরের কথা, বরং দেখায় কীভাবে তারা সমকালীন সামাজিক অবস্থাগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি বলছেন, পেশাদার ঐতিহাসিকদের থেকে তিনি যা শিখেছেন তার থেকে বেশি শেখা তার পক্ষে সম্ভব হতো যদি ভারত— ইতিহাস অধ্যয়নের জন্য ক্ষেত্রানুসন্ধানের সর্বোচ্চ গুরুত্বর কথাটা তাঁদের দৃষ্টি এড়িয়ে না যেত। এই ক্ষেত্রানুসন্ধানের কাজ আন্তঃসম্পর্কযুক্ত তিনটি ভাগ-প্রত্নতত্ব, নৃতত্ব ও ভাষাতত্বে বিভক্ত। তিনি গ্রন্থটির পরিমার্জিত সংস্করণের ভূমিকায় লিখছেন, ‘তিনটি বিভাগের প্রত্যেকটির জন্যই প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট স্থানের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক জ্ঞান, স্থানীয় কথ্যরীতিকে আয়ত্ত করার ক্ষমতা এবং উপজাতি মানুষ ও সেইসঙ্গে কৃষকদের আস্থা অর্জন। প্রতিটি ক্ষেত্রানুসন্ধানে প্রয়োজন হলো সন্ধানের সূত্র ধরেই একটা প্রকরণ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতির বিকাশ ঘটানো। পর্যবেক্ষণগুলিকে কোনও অপরিবর্তনীয়, পূর্বধারণাকৃত ছাঁচে ফেলে দেওয়াটা মারাত্মক ক্ষতিকর। ঠিকভাবে ঠিক প্রশ্ন করার কৌশলটা মাটি থেকে আয়ত্ত করা যা শেখানো যায় না। কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে পৌঁছানোর জন্য যে গাড়িই ব্যবহার করা হোক না কেন, প্রকৃত সমীক্ষার কাজটা করা যায় কেবলমাত্র পায়ে হেঁটেই।" উল্লেখিত গ্রন্থ তাঁর এই চিন্তা ও বৌদ্ধিক চর্চার সমষ্টি বলা চলে। 
আন্তর্জাতিকতাবাদে গভীর আস্থাশীল এই বড়মাপের মানুষটি সমাজ ও স্বদেশকে অনেক কিছু দিয়েছেন, আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনাবসান হলো মাত্র ৫৯বছর বয়সে। এরই মধ্যে বিশ্বশান্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সোভিয়েতের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, ভারত ইতিহাস চর্চার গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন কোনো ব্যক্তিকে নয়, উৎসর্গ করেছিলেন ভারত— সোভিয়েত সৌহার্দ্যের প্রতি।
প্রবাদপ্রতিম দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণে আরেক প্রবাদ প্রতিম মার্কসবাদী চিন্তক, কমিউনিস্ট আন্দোলনের বরেণ্য নেতা ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ একটি লেখায় লিখেছিলেন, দার্শনিক দেবীপ্রসাদের বহুমাত্রিক মনীষা ভারতীয় দর্শনের ক্ষেত্রে যেমন অবদান রেখেছে একইভাবে ডিডি কোসাম্বির বহুমাত্রিক মনীষা এদেশে বিজ্ঞান ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে তেমনই অবদান রাখতে পেরেছিল। দেবীপ্রসাদকে তাই, তাঁর মতে, একমাত্র কোসাম্বির সঙ্গেই তুলনা করা চলে।
আজ ভারতে নয়া ফ্যাসিবাদী শাসকের আস্ফালনে ভেঙে পড়ছে ইতিহাসের ক্রমানুসন্ধান ও নির্মাণের কাঠামো। প্রতিরোধের দৃপ্ত সংগ্রামে আমাদের মগজায়ুধ শাণিত করতে পারেন কোসাম্বির মতো দিকপালরা।

Comments :0

Login to leave a comment