নতুন ভোটারদের জন্য ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করলো নির্বাচন কমিশন। এসআইআর চলছে না এমন রাজ্যগুলিতে অনলাইন ভোটার রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ফেরানো হয়েছে ফর্ম ৬-এর পুরনো ফরম্যাট। এর ফলে নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে যাওয়া ১৮ বছর বয়সি নাগরিকদের আর বাবা-মা বা দাদু-ঠাকুমার আগের ভোটার তালিকার তথ্য, যেমন বিধানসভা কেন্দ্র, বুথ কিংবা ক্রমিক নম্বর জানানো বাধ্যতামূলক থাকবে না।
নতুন নিয়মে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এসআইআর হীন রাজ্যগুলিতে নতুন ভোটারদের ক্ষেত্রে পরিবারের পূর্ববর্তী ভোটার-তথ্যের সঙ্গে নাম মিলিয়ে দেখার বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া আর থাকছে না।
তবে যেসব রাজ্যে বর্তমানে এসআইআর-এর কাজ চলছে, সেখানে অতিরিক্ত ঘোষণা দেওয়ার নিয়ম আপাতত বহাল থাকবে। অর্থাৎ এসআইআর-এর আওতাধীন রাজ্যগুলির ভোটারদের ক্ষেত্রে আগের মতোই সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত তথ্য বা ঘোষণাপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
ভোটার তালিকায় নাম তোলার এই প্রক্রিয়া নিয়ে গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী ইন্ডিয়া ব্লকের পক্ষ থেকে ভোটার নিবন্ধনের পদ্ধতি এবং অতীতে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত সেই বিতর্কের আবহেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের এই পরিবর্তনের ফলে এসআইআর চলছে না এমন রাজ্যগুলিতে প্রথমবার ভোটার হতে চলা তরুণ-তরুণীদের জন্য ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সরল হবে। অন্যদিকে এসআইআর চলা রাজ্যগুলিতে অতিরিক্ত ঘোষণার নিয়ম চালু থাকায় দুই ধরনের রাজ্যের জন্য ভোটার নিবন্ধনের নিয়মে আপাতত পার্থক্য বজায় থাকছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কোনও নতুন প্রক্রিয়া নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যাপক পরিসর এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া এসআইআর পরবর্তীতে দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে এবং খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী এসআইআর এবং ভোটার-তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার নথিভুক্ত আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়। সিপিআই(এম), সিপিআই এবং সিপিআই(এমএল)-লিবারেশন জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং এসআইআর অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলি মানেনি। ২৩ সেপ্টেম্বর কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসআইআর-সহ কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্ত পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ কোনও একজন কমিশনার একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই অভিযোগকে কমিশন অস্বীকার করেছে। তবে দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি এবং তার বিষয় নিয়ে প্রতিবেদনে যা বলা হয়েচিল তাকে অস্বীকারও করতে পারেনি।
এসআইআর নিয়ে আইনি বিতর্কও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট বিহারের এসআইআর-এর আইনি বৈধতা বহাল রাখলেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালত স্পষ্ট করে যে ভোটার তালিকা থেকে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ পড়ার ভিত্তিতে তাঁকে ভারতীয় নাগরিক নন বলে ঘোষণা করা যায় না।
বিরোধী দলগুলির দাবি, নাম বাদ পড়েছে এমন প্রকৃত ভোটারদের নাম দ্রুত এবং ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে দিতে হবে।
এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের জেরে বিরোধী দলগুলির মধ্যেও সমন্বয় বাড়ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের বৈঠক হওয়ার কথা। সংবিধান, গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য পথে নামার বার্তা দিয়ে ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের দলগুলিকে চিঠি দেন বেবি। তার পর বৈঠকের দিন ঠিক হয়। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, এসআইআর এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
Election Commission
এসআইআর চলছে না এমন রাজ্যে ভোটার তালিকায় নাম তোলার নিয়মে বদল, ফেরানো হল পুরনো ফর্ম ৬
×
Comments :0