অমল হালদার
সারাদেশে অন্নদাতা কৃষকরা মারাত্মক আক্রান্ত। দেশের কৃষক সমাজকে আড়াল করে বাণিজ্য চুক্তি করার ফলে কৃষকদের জীবনে আরও চরম দুর্দশা অপেক্ষা করছে। কোনও শুল্ক ছাড়াই গম, ডাল, তুলা, সয়াবিন, দুধ সহ একাধিক কৃষিপণ্য অবাধে আমদানি হলে ঘোর বিপদে পড়বে সারা দেশের কৃষক। পুঁজিবাদের রাঘববোয়াল দেশগুলোতেই ইতিহাসের অনিবার্য নিয়মেই সঙ্কটের মাত্রা তীব্র হচ্ছে। বিশাল বিশাল কারখানায় ছাঁটাই শুরু হয়েছে, জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় প্রতিদিনই কমানো হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে কোনোমতে রক্ষা করতে বিভিন্ন দেশের উপর শুল্কের মাত্রা কোথায় থামবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর জল্পনা। দেশের বিদেশ নীতি ও অর্থনৈতিক নীতির উপর যেভাবে চাপ বাড়ানো হচ্ছে, তা সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার পক্ষেও ভয়ঙ্কর।
আমদানি নির্ভর আমাদের দেশে ট্রাম্পের গদা ঘোরানো ও মোদীজির নতজানু হওয়া প্রত্যক্ষ করেছি। এর জেরে রাশিয়া থেকে।জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। বাড়বে জিনিসপত্রের দাম। ডিজেল পেট্রলের দাম বাড়লে পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্য হিসাবে সারের দামও বাড়বে। দেশের সার কারখানাগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সারের দাম বাড়বে। কারগিল, সিনজেন্টা, মনসেন্টা কোম্পানিগুলির একচেটিয়া ব্যবসায় কৃষকরা নাজেহাল। দামবৃদ্ধি বা কালোবাজারি শুধু নয়, এখন সারের সাথে নিতে হবে কিছু পণ্য, বাধ্যতামূলক এই ট্যাগিং মারাত্মকভাবে বাড়ছে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে, ট্যাগিংয়ে ন্যানো ইউরিয়া বা ন্যানো পটাশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অবাক হবেন ন্যানো ইউরিয়ার কার্যক্ষমতা মাত্র ৪ শতাংশ, সেখানে দানা ইউরিয়ার কর্মক্ষমতা ৪৬ শতাংশ। এই অবস্থা চলতে থাকলে চাষির কি দুর্দশা-তা সহজেই অনুমেয়।
ইতিমধ্যে আলুচাষিরা খুবই বিপন্ন। আলুর দাম নেই, আলুচাষ অধ্যুষিত এলাকায় হাহাকার পড়ে গেছে। এ রাজ্যে গত ১০আগস্ট ট্রেড ইউনিয়ানের সাথে যৌথভাবে সংযুক্ত কিষান মোর্চার ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি হয়। দেনার দায়ে ১২জন আলুচাষি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। দেনার পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে, সরকার নির্বিকার। এটা সকলেই জানেন, আলু এমন একটি পচনশীল ফসল যা দীর্ঘদিন বাড়িতে রাখা যায় না, মাঠে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পেলে প্রান্তিক চাষিরা বিক্রি করে মহাজনের দেনা পরিশোধ করেন, আর সংসার বাঁচাতে কিছু টাকা সঞ্চয় করেন।
একথা অনস্বীকার্য আলুর ফলন অত্যধিক হলে একটা সমস্যা হয়। আলুচাষ অধ্যুষিত রাজ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত কিংবা রোগ পোকার আক্রমণে ফসলহানি ঘটলে অন্য রাজ্যের সুবিধা হয়, অর্থাৎ কারো সর্বনাশ না হলে সচরাচর পৌষ মাস আসে না। সে ক্ষেত্রে চাষিকে বাঁচাতে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হয়। যেমন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে অধিক উৎপাদন জনিত সমস্যাকে মোকাবিলা করতে সরকার কয়েক শত কোটি টাকা খরচ করে চাষিদের কাছ থেকে আলু কিনে তা হিমঘরে সংরক্ষণ করে, পরে তা আইসিডিএস কেন্দ্রে, মিড ডে মিলে তা ব্যবহার করে। তৃণমূল সরকার আলুর দাম বৃদ্ধি রুখতে সীমান্ত বন্ধ করে এই রাজ্যের চাষি, ব্যবসায়ী সকল অংশের চরম সর্বনাশ করেছে।
মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাজ্যের নতুন সরকার কিছু একটা করবে কিন্তু সে গুড়ে বালি। এখন ভজন কীর্তন নিয়ে মেতে আছে। কোনও প্রতিশ্রুতি এই সরকার পালন করছে না, আলুচাষিদের ক্ষেত্রে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হবে— এটা কৃষকরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই সংযুক্ত কিষান মোর্চার নেতৃত্বে আলুর সহায়ক মূল্যের দাবিতে রাজ্য সড়ক, জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। কৃষক আন্দোলনের বহু নেতা ও কর্মী গ্রেপ্তার বরণ করেছেন অথবা মামলা রুজু করা হয়েছে। কৃষকসভার পক্ষ থেকে রাজ্যজুড়ে অজস্র খোলা চিঠি কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রীকে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু সরকার কৃষক নেতৃত্বের সাথে একটু আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করেনি।
এই সরকার যে কৃষক ও জনবিরোধী তা দিল্লির সরকারকে দেখলেই বোঝা যায়। তিনটি কৃষক মারা আইনকে তুলতে এক বছরের আন্দোলনে ৭২৬জন কৃষকের জীবন উৎসর্গ আমরা ভুলতে পারি না। দাবি মেটানোর আশ্বাস দিয়ে মোদীজি কৃষকদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। সারা দেশের কৃষক সমাজ এটা ভুলে যাননি। ১০ আগস্ট ট্রেড ইউনিয়নের সাথে যৌথভাবে সংযুক্ত কিষান মোর্চার ‘জেল ভরো’ আন্দোলনের প্রভাব পড়ছে সারা দেশে। সারা দেশে কৃষির হাল সম্বল খুবই খারাপ, কোনও ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নেই তখন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই বছর খরিফ মরশুমে ধানের উৎপাদন অনেকটাই কমবে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা-বনাঞ্চল ধ্বংস করে আদানি-আম্বানিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। এই সরকার কোনও আমলই দেয়নি। গবেষকরা সতর্ক করেছেন ২০২৬ সালে এল-নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়বে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে শীতের মাসগুলিতেও অতিরিক্ত গরম মানুষের শরীরে যেমন গুরুতর চাপ সৃষ্টি করতে পারে তেমনি ধান সহ শীতের মরশুমে কৃষি উৎপাদনেও ব্যাপক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা। গবেষকরা অনুমান করেছেন এল-নিনোর প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, শুষ্ক মাটি, এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা— এই কয়েকটি পরিস্থিতি একসঙ্গে যদি তৈরি হয় তাহলে কৃষি, জলের যোগান এবং জনস্বাস্থ্যের উপর বিরাট চাপ পড়তে পারে। এল-নিনোর প্রভাব থেকে বাঁচতে সরকারের কোনও উদ্যোগ নেই বরং এর বিপরীত কাজ এখনো চলছে।
পরিবেশ ও জলবায়ুর কারণে যদি খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি হয় তাহলে আগামী দিনে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকছে। তার উপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা, এর মধ্যে যদি খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয় তাহলে গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা হবে শোচনীয়। ইতিমধ্যেই ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি অ্যাক্টকে সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার পরিবার পিছু ৩৫ কেজি খাদ্যশস্যের আইনি অধিকার আছে। আইনটিতে গ্রামীণ জনসংখ্যার মধ্যে ৭৫ শতাংশ এবং শহরে জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মানুষকে খাদ্যশস্যের আওতায় রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার খাদ্য নিরাপত্তা যে দান নয় এটা অধিকার তা সমূলে উচ্ছেদ করতে চাইছে।
কৃষকসভা মনে করে চালু ব্যবস্থাকেই বজায় রাখা দরকার। কারণ পিডিএস দুর্বল হলে কৃষক সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পিডিএস এর জন্য বিপুল পরিমাণ চাল, গম অন্যান্য খাদ্যশস্যের দরকার হয়। সেই চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় সরকারি সংগ্রহের মাধ্যমে। সরকারি সংগ্রহের সাথে এমএসপি’র একটা সম্পর্ক আছে। যদি সরকারি সংগ্রহ কমে যায় তাহলে কৃষকের কাছে নিশ্চিত বাজারের পরিমাণও কমতে পারে তখন কৃষককে বেশি নির্ভর করতে হবে কর্পোরেট ক্রেতার উপর। স্বাভাবিকভাবে পিডিএস রক্ষা করা মানে শুধু রেশন ব্যবস্থা রক্ষা করা নয়, কৃষকের বাজারও রক্ষা করে, এই প্রসঙ্গেই এফসিআই-কে দুর্বল করার প্রচেষ্টায় উদ্যোগ বাড়ছে। এফসিআই যদি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে ভবিষ্যতে বড় বিপদের আশঙ্কা থাকছে। রাষ্ট্রের হাতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্ভিক্ষ বা মূল্যবৃদ্ধির মতো অবস্থায় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে, কর্পোরেটের হাতে গেলে তারা মুনাফা ছাড়া অন্য কিছু বুঝবে না।
ফসলের দাম নেই, পাটের যা উৎপাদন খরচ-সরকার যা দাম ধার্য করেছে তা হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে। খেতমজুরের ১০০ দিনের কাজ বন্ধ, পুনরায় এমএন রেগাকে ফিরিয়ে আনার স্লোগান জোরদার হচ্ছে। ২০০ দিন কাজ ও ৬০০ টাকা মজুরি না পেলে গ্রামের গরিব বাঁচতে পারবে না।
কাজের অভাবে গ্রামবাংলায় হাহাকার। পরিযায়ী শ্রমিকরা বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বললে আক্রান্ত হচ্ছেন, তবু পেটের দায়ে অন্য রাজ্যে ছুটছেন। দেদার টাকা পয়সা নিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান ও কর্মকর্তাদের ছাড় দিয়ে বিজেপি’র নেতৃত্বে পঞ্চায়েত চলছে। প্রতিদিন পঞ্চায়েত ও সমবায় ব্যবস্থা গুরুত্ব হারাচ্ছে। চারিদিকে হাহাকার। প্রতিশ্রুতি মতো অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে মহিলারা প্রতিদিনই রাস্তায় নামছেন। অপরদিকে বাড়ছে গ্রামে গ্রামে মাইক্রোফিনান্সের দাপাদাপি। এক একটি পরিবার কার্যত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, বিপুল পরিমাণে বাড়ছে মদ ও লটারির নেশা। গ্রামে গ্রামে লেখাপড়ার চর্চা উঠে যাচ্ছে। একশ্রেণির মাদক আসক্ত, অশিক্ষিত যুবককে ধর্মের নামে বেয়াদবি করার লাইসেন্স দিয়েছে এই সরকার। সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ প্রতিদিনই চলছে। ভোটার তালিকায় যাদের নাম বাদ গেল তাদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনারের যা কীর্তি প্রকাশিত হচ্ছে তা জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। যেভাবে হোক বিজেপি-কে ক্ষমতায় রাখতে হবে— এটা যদি দেশের নির্বাচন কমিশন ঠিক করেন তাহলে দেশের মানুষ কি করবে? এই রাজ্যের সরকার এত দ্রুত জনগণের বিরক্তির কারণ হবেন তা অতীতে দেখা যায়নি। সব ক্ষেত্রেই শ্রমজীবী মানুষের পেটে লাথি মারা হচ্ছে। মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, কৃষকের দুর্দশা বাড়ছে।
পুঞ্জিভূত ক্ষোভকে আন্দোলনের ময়দানে টেনে আনার জন্যই এই অবস্থান কর্মসূচি। ২৮ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকে রানি রাসমণি রোডে সকাল ১০টা থেকে ৬টা পর্যন্ত চলবে অবস্থান। দুপুর ২ টায় জনসমাবেশ। ঠিক দুপুর ১টায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কৃষকরা তাদের নায্য দাবি নিয়ে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন থেকে মিছিল করে এই সমাবেশে যোগ দেবেন। ডবল ইঞ্জিন সরকার যেভাবে চলছে তাকে থামাতে হবে।
Post Editorial
মানুষের ক্ষোভ-দুর্দশা থেকেই জেদি লড়াই , ২৮ সেপ্টেম্বর কৃষক অবস্থান-সমাবেশ
×
Comments :0