Mid Day Meal iscon

'ইসকন ইন ডিম আউট‘: বিতর্কে পুষ্টি-খাদ্যাভ্যাস, শঙ্কা কাজেরও

রাজ্য কলকাতা

কলকাতায় মিড ডে মিলের তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে ডিম। কারণ কর্পোরেশন এলাকার স্কুলে এই প্রকল্পের দায়িত্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসকনকে দিয়েছে রাজ্য। শিশুদের পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাসে দখলদারির পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তে ছড়িয়েছে কাজ হারানোর শঙ্কাও। 
বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর তাদের পেশ করা প্রথম রাজ্য বাজেটে, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেন যে প্রাইমারি স্কুলগুলিতে মিড্-ডে- মিলের বরাদ্দ পড়ুয়া প্রতি ৬টাকা ৭৮ পয়সা থেকে  ১০ টাকা করা হয়েছে। সেইসঙ্গে,  একটি পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে ইস্কনকে কলকাতা কর্পোরেশনের অন্তর্গত স্কুলগুলিতে রান্না করা মিড- ডে- মিলের খাবার সরবরাহের জন্য ইস্কন কে দায়িত্ব দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করেন তিনি। 
ইসকন এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে মিড ডে মিল পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়েছে। তা নিয়ে বহু অভিযোগও দেখা গিয়েছে। চাল চুরি থেকে মরা টিকটিকি পাওয়ার মতো মারাত্মক ঘটনাও সামনে এসেছে। 
যে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে  মিড ডে মিল দেওয়া হয় সেই ‘পিএম পোষণ‘ ডিম দেওয়ার কথা বলছে। এই প্রকল্পে রাজ্যের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটেও সপ্তাহে একদিন ডিম দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। 
দেখা যাচ্ছে বিজেপি সরকারে আসীন এমন গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যে ডিম দেওয়া হয় না। আবার কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাডু, হিমাচল প্রদেশে শিশুদের ডিম দেওয়া হয়। 
এর আগে, এই মিড-ডে-মিল রান্নার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির উপর। মূলত, ওই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অন্তর্গত মহিলারাই খাবার প্রস্তুত করতেন। ইস্কনের হাতে এই দায়িত্ব চলে যাওয়ার পর, যাঁরা এতদিন খাবার প্রস্তুত করতেন, তাঁদের কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বামপন্থীরা।
মিড-ডে-মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধিকে সব স্তর থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব ইসকনকে কেন, রয়েছে সে প্রশ্ন। এই সিদ্ধান্তের জেরেই কলকাতায় বাদ পড়ছে ডিম। প্রোটিনের জন্য সহজে যে পদের ওপর ভরসা থাকে। 
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী  বিধানসভায় এই বলেন যে এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের জন্য মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন," কেউ কারও ওপর ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দিচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের ভালো খাবার দেওয়ার ওপরই মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।"
সরকারি তরফে যুক্তি যে পনির, রাজমা, সয়াবিন, ডাল ও দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ নিরামিষ ডিমের বিকল্প পরিবেশন করা হবে। 
এই বিষয়ে স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন বলেন, "বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিরামিষ খাবার খেয়ে সুস্থ জীবনযাপন করেন। পুষ্টির বিচার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে হওয়া উচিত, কোনও খাদ্য তালিকায় ডিম আছে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে নয়।" 
এই বিষয়ে, ইসকন কলকাতার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাধারমণ দাস সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘‘আমরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় ১২ লক্ষ শিক্ষার্থীকে খাবার সরবরাহ করেছি এবং সরকারের নির্ধারিত পুষ্টির মানদণ্ড মেনেই তা করা হয়েছে।’’ তিনি বলেন, "একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে পুষ্টির বিষয়টি কেবল ডিমের ওপরই নির্ভরশীল। ডাল, সয়াবিন, দুগ্ধজাত খাবার এবং শাকসবজির মাধ্যমেও শিশুরা প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও পুষ্টি উপাদান পেতে পারে। মূল মনোযোগ পুষ্টিমানের ওপরই দেওয়া উচিত।" 
এই বিষয়ে বামপন্থী অর্থনীতিবিদ ঈশিতা মুখার্জি বলেন, " মিড-ডে- মিলে বরাদ্দ বাড়ানো হবে এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার বিষয়। তবে এই কাজের জন্য ইস্কনকে লাগবে কেন ? এটা তো সারা দেশজুড়ে প্রচলিত একটা ন্যায্য সরকারি প্রকল্প, এর জন্য ইস্কনের কি প্রয়োজন রয়েছে তা বোঝা গেলো না।’’ 
পুষ্টির মান প্রসঙ্গে ইসকন মুখপাত্রের বক্তব্যে সহমত নন পুষ্টিবিদদের অনেকেই। তাঁরা বলছেন যে সব প্রোটিন সমান নয়। ডিমের বিকল্প ব্যবহারের অর্থ কেবল কয়েক গ্রাম প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করা নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।  কারণ, ডিমে শরীরের প্রয়োজনীয় অনুপাতে নয়টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না, তাই এগুলোকে খাবারে মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো অত্যন্ত সহজে পরিপাক হয়ে যায়, যা সহজেই শরীর শোষণ করে প্রয়োজনীয় কাজে লাগাতে পারে।
তাঁরা বলছেন, রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা এফএও প্রোটিনের গুণমান যাচাইয়ের জন্য ‘ডাইজেস্টিবল ইনডিসপেনসেবল অ্যামিনো অ্যাসিড স্কোর’ (DIAAS) ব্যবহারের সুপারিশ করে। সেখানে ডিম ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ মানের প্রোটিনের উৎসগুলির অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, ‘‘শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের শরীরে দ্রুত পেশি, হাড়, অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং রোগ প্রতিরোধক কোষ গঠিত হচ্ছে। লিউসিন, লাইসিন ও মেথিওনিনের মতো প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের পর্যাপ্ত গ্রহণ শারীরিক বৃদ্ধি, টিস্যু বা কলার পুনর্গঠন এবং মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে।
তাঁদের মত, একটি সম্পূর্ণ প্রোটিন হওয়া সত্ত্বেও পুষ্টির দিক থেকে সয়াবিন ডিমের হুবহু বিকল্প নয়। পাশাপাশি, প্রাণিজ প্রোটিনের তুলনায় উদ্ভিদজাত প্রোটিন সাধারণত কম হজমযোগ্য; এর অর্থ হলো, শরীর অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো ততটা দক্ষতার সঙ্গেশোষণ ও কাজে লাগাতে পারে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিম এমন সব পুষ্টি উপাদানের জোগান দেয় যা কেবল প্রোটিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি ডিম থেকে ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, সেলেনিয়াম, আয়োডিন সহ সহজপাচ্য আয়রন পাওয়া যায়। এছাড়া এটি কোলিনের অন্যতম সেরা খাদ্য-উৎস; কোলিন এমন একটি পুষ্টি উপাদান যা মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য। সয়াবিন ও ডালজাতীয় খাদ্যে এই পুষ্টি উপাদানগুলো হয় অনুপস্থিত, নতুবা অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে থাকে।"

Comments :0

Login to leave a comment