প্রবীর দাস: বসিরহাট
বসিরহাট মহকুমার প্রায় দেড়শতাধিক প্রাচীন এবং গর্বের কুটিরশিল্প ‘মুন্সী গামছা’। যতদিন যাচ্ছে তত সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। তবে কী সীমান্তের গ্রামে গর্বের এই কুটিরশিল্প হারিয়ে যাবে?
একসময় পিফা, ভাবলা, কেয়ামারি, মাটিয়া কিংবা পানিতরের পশ্চিম কারিগরপাড়ার মতো বিস্তীর্ণ এলাকার শত শত ঘরে তাঁতের মাকুর যে খটখটানির শব্দে গ্রামবাংলার পথঘাট মুখরিত থাকত, তা আজ আধুনিক সভ্যতায় যান্ত্রিকতার দাপটে স্তব্ধ হওয়ার পথে। একেবারে ১০০ শতাংশ সুতির তৈরি টেকসই বুনন, সূক্ষ্ম কারুকার্য ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য একসময় রাজ্য, আন্তর্জাতিক বাজার এমনকি অবিভক্ত বাংলায় যে গামছার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা এখন টিকে থাকার করুণ লড়াইয়ের ছবি পানিতরের ক্যানভাসে।
উত্তর ২৪পরগনার বসিরহাট মহকুমার একেবারে সীমান্তের কোলে পানিতর গ্রাম। বয়সের ভার থাকলেও হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর পরম নিষ্ঠায় এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে বাস্তব চিত্র অত্যন্ত কঠিন। আধুনিক পাওয়ারলুম বা যান্ত্রিক তাঁতের সস্তা গামছার দামের সাথে প্রতিযোগিতায় টেকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে হস্তচালিত তাঁতিদের পক্ষে। তার ওপর কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম ও শ্রমের তুলনায় নগণ্য উপার্জনের কারণে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়ায় নুর হোসেন মোল্লার মতো অনেক প্রবীণ তাঁতিই বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দিনমজুরি, ইটভাটার কাজ, টোটো চালানো কিংবা ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে যোগ দিচ্ছেন। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখে নতুন প্রজন্মও আর এই শতাব্দী প্রাচীন এই কুটিরশিল্পের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ বস্ত্রশিল্পের সঙ্কট নয়। বরঞ্চ বসিরহাটের লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক বিরাট অধ্যায়ের উপাখ্যান ম্লান হতে বসেছে। কেবলমাত্র বয়সের ভারে ন্যুব্জ গুটিকয়েক কারিগরের অদম্য জেদে ভর করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। সরকারি ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক নকশার প্রশিক্ষণ,জি আই স্বীকৃতি এবং সর্বোপরি সরকারি বিপণন ব্যবস্থা না করা গেলে অচীরেই ইতিহাসের পাতায় পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নেবে মহকুমার গর্বের মুন্সি 'গামছা'।
Comments :0